বঙ্গোপসাগরে চীনের কৌশলগত আগ্রহ, কোয়াডের প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

- প্রকাশঃ ১০:৪৮:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫
- / 28
ছবি: মো: আলী আজগর ইসতিয়া
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই জলসীমা শুধু বাণিজ্যের জন্যই নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রেও এক অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বিশেষ করে চীনের দৃষ্টি এখন ক্রমশ এই অঞ্চলের দিকে ঝুঁকছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো চীনের ওপর মালাক্কা প্রণালীর বিপুল নির্ভরশীলতা। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য মালাক্কা প্রণালী চীনের প্রধান রুট। কিন্তু এই রুট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌবাহিনী সহজেই এখানে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এবং প্রয়োজনে চীনের তেল ও পণ্যের জাহাজ আটকাতে সক্ষম। আবার ভারতও একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে এই রুটে চীনের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে চীন বিকল্প রুটের খোঁজ করছে, যার মধ্যে বঙ্গোপসাগর সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। চীনের কৌশলগত চিন্তায় বঙ্গোপসাগরের অবস্থান তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে পা রাখলে চীনকে একসাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত দুই শক্তির মোকাবিলা করতে হবে না। বরং তাদের সামনে দাঁড়াতে হবে কেবল ভারতের সঙ্গে। সেই তুলনায় এটাই চীনের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক পরিস্থিতি।
এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)। এই প্রকল্পের আওতায় চীন তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশকে সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনান থেকে স্থলপথে মিয়ানমারের কাচিন ও রাখাইন রাজ্য হয়ে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত কিয়াউকফিউ বন্দরে পৌঁছানো ইতিমধ্যেই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশকেও তারা এই বৃহৎ নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে চায়। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের প্রতি চীনের আগ্রহের অন্যতম কারণ এটাই। এসব বন্দরকে তারা কেবল বাণিজ্যের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগ রুটের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এর মাধ্যমে চীন শুধু বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তানের গ্বাদার বন্দর এবং ভারত মহাসাগরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর সঙ্গেও সরাসরি সংযুক্ত হতে পারবে। ফলে তাদের সমুদ্রপথের ঝুঁকি কমবে এবং মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প রুট তৈরি হবে।
চীনের এই অগ্রযাত্রা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র একা এগোচ্ছে না। তারা ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে কোয়াড (Quadrilateral Security Dialogue)। যদিও শুরুতে এটিকে কেবল নিরাপত্তা জোট বলা হতো, বর্তমানে কোয়াড অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সাপ্লাই চেইন নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই সক্রিয়। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র কোয়াডকে ব্যবহার করে এ অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
কোয়াডের সামুদ্রিক মহড়া, নৌ টহল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রকল্পগুলো সরাসরি চীনের কার্যক্রমের পাল্টা উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র চায়—ঢাকা যেন চীনের বন্দর-নির্ভর অবকাঠামো সহযোগিতার পরিবর্তে বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বে অংশ নেয়। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশকে কোয়াডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না করলেও কমপক্ষে সহযোগী বা পর্যবেক্ষক ভূমিকায় দেখতে চায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে এক জটিল অবস্থায় রয়েছে। ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হয়েও চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি প্রবল। ভারত চেষ্টা করছে এই প্রভাব সীমিত করতে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তারা সরাসরি এই প্রক্রিয়া আটকাতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রও এই বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে পারছে না। তাই কোয়াডের মাধ্যমে তারা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে শক্তিশালী করছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও ঢাকা এখনো কোয়াডে যোগ দেয়নি, তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া এই ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যতের ভারসাম্য নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি কেবল একটি বিকল্প বাণিজ্যিক রুট নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় এনে চীন তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সরাসরি ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কোয়াডকে কাজে লাগিয়ে একই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। ফলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর কেবল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং নতুন এক “শক্তির প্রতিযোগিতার হটস্পট” হিসেবেও আবির্ভূত হবে যার কেন্দ্রে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।