ঢাকা ০৮:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিলেটে বালু লুটের মহোৎসব: রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিপন্ন নদী ও পর্যটন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ১২:৪৯:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫
  • / 20

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার বড়গাং নদের ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলন চলছে। সেই বালু রাখা হয়েছে ফেরিঘাট এলাকায়। সেখান থেকে ট্রাকে করে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। সোমবার দুপুরে | ছবি: আনিস মাহমুদ


সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার বড়গাং নদ, শ্রীপুর, রাংপানি, জাফলংসহ বিভিন্ন নদী ও পর্যটনকেন্দ্রে চলছে নির্বিচার বালু উত্তোলন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা চক্র প্রকাশ্যে এ লুটপাট চালাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

শ্রীপুর ও রাংপানি একসময় পর্যটকদের জন্য সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল। তবে ১৯৯২ সালে শ্রীপুরকে পাথর কোয়ারি হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হলে ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে থাকে এর প্রাকৃতিক রূপ। ২০১৩ সালে গেজেটভুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়। যদিও ২০২০ সাল থেকে ইজারা বন্ধ আছে, তবুও অবৈধভাবে বালু-পাথর লুট চলতেই থাকে।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই লুটপাট নতুন মাত্রা পায়। আগে আড়ালে চলা কার্যক্রম এখন প্রকাশ্যে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি, জামায়াত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সব দলের নেতারাই এখন বালু লুটে সম্পৃক্ত। শ্রীপুর–রাংপানি: নদীর বালু ও পাথর খনন করে একসময়ের টিলাসদৃশ স্তূপ এখন উজাড়। জায়গাগুলো ধীরে ধীরে বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। জাফলং: পিয়াইন নদ ও আশপাশের এলাকায় নৌকা ও ট্রাকে বালু পরিবহন হচ্ছে। স্থানীয়দের ধারণা, গত এক বছরে শুধু এখানেই ১০–১৫ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। বড়গাং নদ: ইজারাবহির্ভূত অংশ থেকে শ্রমিকরা বেলচা-কোদাল দিয়ে বালু তুলছেন। ইজারাদারের দাবি, ভুলবশত এই ঘটনা ঘটছে। তবে স্থানীয়দের মতে, চলমান অভিযান শেষ হলেই ফের লুট শুরু হবে। অন্য নদীগুলো: বাওন হাওর, খাসি নদ, নলজুরি নদ থেকেও ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।

গোয়াইনঘাটের ইউএনও রতন কুমার অধিকারী বলেন, আগে হাজারো নৌকায় বালু পাথর লুট হতো। এখন অভিযান অব্যাহত থাকায় তা অনেকটাই কমে গেছে। কোথাও অবৈধভাবে বালু তোলার সুযোগ দেওয়া হবে না।
জৈন্তাপুরের ইউএনও জর্জ মিত্র চাকমা জানান, নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে। কিছু বালুমহাল নিয়ে আদালতে মামলা আছে। যেখানে অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব মহালের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। পরে স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত ও যুবদল নেতারা নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে অভিযোগ। তবে অভিযুক্ত নেতারা নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।

পরিবেশ সংগঠন “ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)”–এর সদস্যসচিব আবদুল করিম চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নামকাওয়াস্তে অভিযান চালানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে নির্বিচার লুটপাট বেড়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ এলাকা থেকে পাথরের মতো বালুও শেষ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট রক্ষায় আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা জরুরি।

স্থানীয় সূত্র বলছে, গত এক বছরে প্রায় ৬০–৭০ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট বালু পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকায়।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

সিলেটে বালু লুটের মহোৎসব: রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিপন্ন নদী ও পর্যটন

প্রকাশঃ ১২:৪৯:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার বড়গাং নদের ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলন চলছে। সেই বালু রাখা হয়েছে ফেরিঘাট এলাকায়। সেখান থেকে ট্রাকে করে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। সোমবার দুপুরে | ছবি: আনিস মাহমুদ


সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার বড়গাং নদ, শ্রীপুর, রাংপানি, জাফলংসহ বিভিন্ন নদী ও পর্যটনকেন্দ্রে চলছে নির্বিচার বালু উত্তোলন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা চক্র প্রকাশ্যে এ লুটপাট চালাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

শ্রীপুর ও রাংপানি একসময় পর্যটকদের জন্য সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল। তবে ১৯৯২ সালে শ্রীপুরকে পাথর কোয়ারি হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হলে ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে থাকে এর প্রাকৃতিক রূপ। ২০১৩ সালে গেজেটভুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়। যদিও ২০২০ সাল থেকে ইজারা বন্ধ আছে, তবুও অবৈধভাবে বালু-পাথর লুট চলতেই থাকে।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই লুটপাট নতুন মাত্রা পায়। আগে আড়ালে চলা কার্যক্রম এখন প্রকাশ্যে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি, জামায়াত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সব দলের নেতারাই এখন বালু লুটে সম্পৃক্ত। শ্রীপুর–রাংপানি: নদীর বালু ও পাথর খনন করে একসময়ের টিলাসদৃশ স্তূপ এখন উজাড়। জায়গাগুলো ধীরে ধীরে বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। জাফলং: পিয়াইন নদ ও আশপাশের এলাকায় নৌকা ও ট্রাকে বালু পরিবহন হচ্ছে। স্থানীয়দের ধারণা, গত এক বছরে শুধু এখানেই ১০–১৫ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। বড়গাং নদ: ইজারাবহির্ভূত অংশ থেকে শ্রমিকরা বেলচা-কোদাল দিয়ে বালু তুলছেন। ইজারাদারের দাবি, ভুলবশত এই ঘটনা ঘটছে। তবে স্থানীয়দের মতে, চলমান অভিযান শেষ হলেই ফের লুট শুরু হবে। অন্য নদীগুলো: বাওন হাওর, খাসি নদ, নলজুরি নদ থেকেও ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।

গোয়াইনঘাটের ইউএনও রতন কুমার অধিকারী বলেন, আগে হাজারো নৌকায় বালু পাথর লুট হতো। এখন অভিযান অব্যাহত থাকায় তা অনেকটাই কমে গেছে। কোথাও অবৈধভাবে বালু তোলার সুযোগ দেওয়া হবে না।
জৈন্তাপুরের ইউএনও জর্জ মিত্র চাকমা জানান, নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে। কিছু বালুমহাল নিয়ে আদালতে মামলা আছে। যেখানে অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব মহালের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। পরে স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত ও যুবদল নেতারা নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে অভিযোগ। তবে অভিযুক্ত নেতারা নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।

পরিবেশ সংগঠন “ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)”–এর সদস্যসচিব আবদুল করিম চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নামকাওয়াস্তে অভিযান চালানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে নির্বিচার লুটপাট বেড়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ এলাকা থেকে পাথরের মতো বালুও শেষ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট রক্ষায় আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা জরুরি।

স্থানীয় সূত্র বলছে, গত এক বছরে প্রায় ৬০–৭০ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট বালু পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকায়।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”