ঢাকা ০৮:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিচারকদের দিকে জুতা নিক্ষেপ: অরক্ষিত বিচারক, ঝুঁকিতে বিচার ব্যবস্থা

আল মুমিনুল মিয়া । ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
  • প্রকাশঃ ১১:৪৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫
  • / 20

চট্টগ্রামের একটি অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণার পর আসামির বিচারকের দিকে জুতা নিক্ষেপের ঘটনা বিচার বিভাগের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ ঘটনা ঘটে। আসামি মো. রাজু ১৭ বছরের সাজা শুনে উত্তেজিত হয়ে বিচারকের দিকে জুতা ছুড়ে মারেন। মুহূর্তেই এজলাসে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা আদালতের মর্যাদা ও বিচারকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর জেএমবির আত্মঘাতী বোমা হামলায় ঝালকাঠিতে দুই বিচারক নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রায় দুই দশক পরও বিচারকদের নিরাপত্তা ঘাটতি থেকে গেছে। সাম্প্রতিক জুতা নিক্ষেপের ঘটনা বিচারকদের ওপর সহিংসতার নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

যুক্তরাজ্যে আদালত নিরাপত্তা ‘এইচএম কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালস সার্ভিস’ (HMCTS) এর অধীনে বিশেষায়িতভাবে পরিচালিত হয়। সেখানে সশস্ত্র ও নিরস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী, সিসিটিভি, মেটাল ডিটেক্টর এবং কঠোর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। বিচারকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিটও কাজ করে।
ভারতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তা একটি চ্যালেঞ্জ হলেও দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো শহরে বিচারকদের জন্য সশস্ত্র প্রহরী, বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে এখনো বিচারকদের নিরাপত্তা প্রধানত স্থানীয় পুলিশের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ আদালতের বিচারকেরা কিছু নিরাপত্তা প্রটোকল পেলেও জেলা ও দায়রা জজ, কিংবা নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তা প্রায় নামমাত্র। তাদের বাসভবনে স্থায়ী প্রহরী থাকে না, আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই বললেই চলে।

রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের নিরাপত্তা বরাদ্দে বৈষম্য প্রকট। নির্বাহী ও আইন বিভাগের প্রতিনিধিরা বুলেটপ্রুফ গাড়ি, সরকারি নিরাপদ বাসভবন ও সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পান। অথচ বিচার বিভাগের অনেক বিচারক নিজেদের নিরাপত্তার জন্য থানার ওপর নির্ভর করেন। এই বৈষম্য রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে অরক্ষিত করে রেখেছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকার আদালত ও বিচারকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়নে এখনো গাফিলতি চোখে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) একটি পৃথক ‘কোর্ট সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)’ গঠনের জোর দাবি জানায়।

বিচারকের নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়; এটি ন্যায়বিচারের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত। একজন বিচারক যদি হামলার ভয় পান, তবে তিনি কখনোই সাহসী ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এটি ন্যায়বিচার প্রাপ্তির মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে আদালত অনিরাপদ হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়।

বিচারকের দিকে জুতা নিক্ষেপের ঘটনাকে ছোট করে দেখা যাবে না। এটি সমগ্র বিচার ব্যবস্থার মর্যাদার ওপর আঘাত। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এটি আরও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তাই বিচারকদের নিরাপত্তায় পৃথক বিশেষায়িত বাহিনী গঠন সময়োপযোগী ও অপরিহার্য উদ্যোগ।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

বিচারকদের দিকে জুতা নিক্ষেপ: অরক্ষিত বিচারক, ঝুঁকিতে বিচার ব্যবস্থা

প্রকাশঃ ১১:৪৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫

চট্টগ্রামের একটি অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণার পর আসামির বিচারকের দিকে জুতা নিক্ষেপের ঘটনা বিচার বিভাগের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ ঘটনা ঘটে। আসামি মো. রাজু ১৭ বছরের সাজা শুনে উত্তেজিত হয়ে বিচারকের দিকে জুতা ছুড়ে মারেন। মুহূর্তেই এজলাসে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা আদালতের মর্যাদা ও বিচারকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর জেএমবির আত্মঘাতী বোমা হামলায় ঝালকাঠিতে দুই বিচারক নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রায় দুই দশক পরও বিচারকদের নিরাপত্তা ঘাটতি থেকে গেছে। সাম্প্রতিক জুতা নিক্ষেপের ঘটনা বিচারকদের ওপর সহিংসতার নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

যুক্তরাজ্যে আদালত নিরাপত্তা ‘এইচএম কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালস সার্ভিস’ (HMCTS) এর অধীনে বিশেষায়িতভাবে পরিচালিত হয়। সেখানে সশস্ত্র ও নিরস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী, সিসিটিভি, মেটাল ডিটেক্টর এবং কঠোর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। বিচারকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিটও কাজ করে।
ভারতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তা একটি চ্যালেঞ্জ হলেও দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো শহরে বিচারকদের জন্য সশস্ত্র প্রহরী, বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে এখনো বিচারকদের নিরাপত্তা প্রধানত স্থানীয় পুলিশের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ আদালতের বিচারকেরা কিছু নিরাপত্তা প্রটোকল পেলেও জেলা ও দায়রা জজ, কিংবা নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তা প্রায় নামমাত্র। তাদের বাসভবনে স্থায়ী প্রহরী থাকে না, আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই বললেই চলে।

রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের নিরাপত্তা বরাদ্দে বৈষম্য প্রকট। নির্বাহী ও আইন বিভাগের প্রতিনিধিরা বুলেটপ্রুফ গাড়ি, সরকারি নিরাপদ বাসভবন ও সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পান। অথচ বিচার বিভাগের অনেক বিচারক নিজেদের নিরাপত্তার জন্য থানার ওপর নির্ভর করেন। এই বৈষম্য রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে অরক্ষিত করে রেখেছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকার আদালত ও বিচারকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়নে এখনো গাফিলতি চোখে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) একটি পৃথক ‘কোর্ট সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)’ গঠনের জোর দাবি জানায়।

বিচারকের নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়; এটি ন্যায়বিচারের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত। একজন বিচারক যদি হামলার ভয় পান, তবে তিনি কখনোই সাহসী ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। এটি ন্যায়বিচার প্রাপ্তির মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে আদালত অনিরাপদ হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়।

বিচারকের দিকে জুতা নিক্ষেপের ঘটনাকে ছোট করে দেখা যাবে না। এটি সমগ্র বিচার ব্যবস্থার মর্যাদার ওপর আঘাত। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এটি আরও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তাই বিচারকদের নিরাপত্তায় পৃথক বিশেষায়িত বাহিনী গঠন সময়োপযোগী ও অপরিহার্য উদ্যোগ।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”