ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বড় একটি অংশ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য, বহিষ্কার ও সতর্কতার পরও তাঁরা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়ে গেছেন। এতে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতার রাজনীতি যেমন জটিল হয়ে উঠেছে, তেমনি দলীয় শৃঙ্খলা নিয়েও বিএনপির ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২৯৫টির হিসাব বিশ্লেষণে ৭৯টি আসনে বিএনপির অন্তত ৯২ জন নেতা এখনো বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। কোনো কোনো আসনে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
শুরুতে ১১৭টি আসনে বিএনপির প্রায় ১৯০ জন নেতা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের কয়েকজনের মনোনয়ন বাতিল হয়। গতকাল অনেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে যাননি। এ অবস্থায় দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় অন্তত ১০ জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর একজন বিদ্রোহী প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাঁকে গত ২৯ ডিসেম্বর জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কারের পরও নির্বাচনের মাঠে
বহিষ্কৃত নেতাদের একটি অংশ যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও সমমনাদের ছেড়ে দেওয়া আসন থেকেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকার ঘোষণাও দিয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন দিলেও দলটির সাবেক নেতা সাইফুল আলম (নীরব) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। সেখানে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ঝিনাইদহ-৪ আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কৃত হয়েছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। সিলেট-৫ আসনে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদও মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির দুই বহিষ্কৃত নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। যশোর-৫, কিশোরগঞ্জ-৫, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন আসনেও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ঢাকায় তিন আসনে বিদ্রোহী
রাজধানী ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির নেতা ইসহাক সরকার, ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল আলম নীরব এবং ঢাকা-১৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু)। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাঁদেরও বহিষ্কার করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল গতকাল মঙ্গলবার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ৩০০ আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনে নতুন তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় রয়েছে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও বিএনপির বিপুলসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে থেকে যাওয়ায় দলটির ভেতরে শৃঙ্খলা সংকট যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি যুগপৎ আন্দোলনের আসন সমঝোতার রাজনীতিও নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।