ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে পান্নুন হত্যা ষড়যন্ত্রে দোষ স্বীকার ভারতীয় নাগরিকের

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০২:০৪:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 50

গুরপতবন্ত সিং পান্নুন। ফাইল ছবি: এএনআই


যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা ও মার্কিন নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন ভারতের নাগরিক নিখিল গুপ্ত। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে একটি ফেডারেল আদালতে তিনি এই অপরাধের দায় স্বীকার করেন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্যমতে, ৫৪ বছর বয়সী নিখিল গুপ্ত ভাড়াটে খুনি নিয়োগ, হত্যা-সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র এবং অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বীকার করেছেন। আদালত আগামী ২৯ মে তাঁর সাজা ঘোষণা করতে পারেন। এসব অভিযোগে তাঁর সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

ষড়যন্ত্রের পটভূমি

মার্কিন কৌঁসুলিদের দাবি, নিখিল গুপ্ত ভারত সরকারের এক কর্মকর্তার নির্দেশে নিউইয়র্কভিত্তিক ওই শিখ রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। আদালতের নথিতে লক্ষ্যবস্তুর নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, সেটি যে গুরপতবন্ত সিং পান্নুন ছিলেন—তা স্পষ্ট।

ভারত সরকার পান্নুনকে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএর আওতায় ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং তাঁর সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করেছে। ভারতের অভিযোগ, পান্নুন খালিস্তান রাষ্ট্র গঠনের নামে সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দিচ্ছেন।

যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়

মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০২৩ সালে নিখিল গুপ্তকে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করেন বিকাশ যাদব নামে এক ব্যক্তি, যিনি ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। যাদবের নির্দেশে নিখিল গুপ্ত যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি খুঁজছিলেন।

তবে যাঁদের সঙ্গে নিখিল গুপ্ত যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁরা আসলে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন—এ তথ্য তিনি জানতেন না।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ হাজার ডলার অগ্রিম দেওয়া হয়। নিখিল গুপ্ত পান্নুনের বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) ও এফবিআই যৌথভাবে এই ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করে দেয়।

মোদির সফর ও কানাডা প্রসঙ্গ

মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, নিখিল গুপ্ত এক ছদ্মবেশী কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন—২০২৩ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় যেন এই হত্যাকাণ্ড না ঘটে। তবে ওই মাসেই কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি মন্তব্য করেন, ‘এখন আর অপেক্ষা করার দরকার নেই।’

২০২৩ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে নিখিল গুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৪ সালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কূটনৈতিক প্রভাব

এই মামলাটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ উত্থাপনের পর ভারত সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ভারত সরকার তখন জানায়, তারা অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দাবি অস্বীকার করে।

নিখিল গুপ্তের দোষ স্বীকারের পর এখন ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া কী হয়, সে দিকেই আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।

শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে পান্নুন হত্যা ষড়যন্ত্রে দোষ স্বীকার ভারতীয় নাগরিকের

প্রকাশঃ ০২:০৪:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গুরপতবন্ত সিং পান্নুন। ফাইল ছবি: এএনআই


যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা ও মার্কিন নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন ভারতের নাগরিক নিখিল গুপ্ত। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে একটি ফেডারেল আদালতে তিনি এই অপরাধের দায় স্বীকার করেন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্যমতে, ৫৪ বছর বয়সী নিখিল গুপ্ত ভাড়াটে খুনি নিয়োগ, হত্যা-সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র এবং অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বীকার করেছেন। আদালত আগামী ২৯ মে তাঁর সাজা ঘোষণা করতে পারেন। এসব অভিযোগে তাঁর সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

ষড়যন্ত্রের পটভূমি

মার্কিন কৌঁসুলিদের দাবি, নিখিল গুপ্ত ভারত সরকারের এক কর্মকর্তার নির্দেশে নিউইয়র্কভিত্তিক ওই শিখ রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। আদালতের নথিতে লক্ষ্যবস্তুর নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, সেটি যে গুরপতবন্ত সিং পান্নুন ছিলেন—তা স্পষ্ট।

ভারত সরকার পান্নুনকে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএর আওতায় ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং তাঁর সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করেছে। ভারতের অভিযোগ, পান্নুন খালিস্তান রাষ্ট্র গঠনের নামে সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দিচ্ছেন।

যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়

মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০২৩ সালে নিখিল গুপ্তকে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করেন বিকাশ যাদব নামে এক ব্যক্তি, যিনি ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। যাদবের নির্দেশে নিখিল গুপ্ত যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি খুঁজছিলেন।

তবে যাঁদের সঙ্গে নিখিল গুপ্ত যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁরা আসলে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন—এ তথ্য তিনি জানতেন না।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ হাজার ডলার অগ্রিম দেওয়া হয়। নিখিল গুপ্ত পান্নুনের বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) ও এফবিআই যৌথভাবে এই ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করে দেয়।

মোদির সফর ও কানাডা প্রসঙ্গ

মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, নিখিল গুপ্ত এক ছদ্মবেশী কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন—২০২৩ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় যেন এই হত্যাকাণ্ড না ঘটে। তবে ওই মাসেই কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি মন্তব্য করেন, ‘এখন আর অপেক্ষা করার দরকার নেই।’

২০২৩ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে নিখিল গুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৪ সালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কূটনৈতিক প্রভাব

এই মামলাটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ উত্থাপনের পর ভারত সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ভারত সরকার তখন জানায়, তারা অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দাবি অস্বীকার করে।

নিখিল গুপ্তের দোষ স্বীকারের পর এখন ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া কী হয়, সে দিকেই আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”