ঢাকা ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেমপ্লেট সংস্কৃতির ‘মন্ত্রীর’ উত্থান: নিজের বংশ ও দুই ছেলের নামে তিন ইউনিয়নের নামকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০৩:৪১:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
  • / 3

গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা


বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন গঠিত ইউনিয়নগুলোর নামকরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি খাত এবং সরকারি প্রকল্পে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শায়েহ আলমের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের নামকে কেন্দ্র করে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফিলিং স্টেশন এবং অবকাঠামো প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে। এসব নামকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে সমালোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। এগুলোর নাম রাখা হয় “মিরবাড়ি”, “সীমান্ত”, “দিগন্ত” এবং “স্বরনগ্রাম”। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, “সীমান্ত” ও “দিগন্ত” নাম দুটি প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিল থাকায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

তবে প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

“সীমান্ত” নামটি এলাকার ভৌগোলিক সীমান্ত অবস্থানকে বোঝায় এবং “দিগন্ত” শব্দটি দূরবর্তী এলাকা বা বিস্তৃত ভৌগোলিক ধারণা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। 

প্রতিমন্ত্রী মীর শায়েহ আলম

স্থানীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সাধারণত জনমত যাচাই ও একাধিক ধাপের অনুমোদন থাকলেও এখানে ডিও (ডেমি অফিসিয়াল) চিঠির প্রভাব ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রস্তাব যখন আসে, তখন প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একটিই নাম দেওয়া ছিল, বিকল্প কোনো নাম ছিল না।”

২০০১ সাল থেকে প্রতিমন্ত্রী মীর শায়েহ আলম বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে বেতগাড়ি মীর শায়েহ আলম গার্লস হাই স্কুল, মীর শায়েহ আলম টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু তাঁর নাম নয়, তাঁর স্ত্রী লাবনী আক্তারের নামেও ভবনের নামকরণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া একই এলাকায় মীরবাড়ি নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও এতিমখানারও নামকরণ রয়েছে, যেখানে পরিবারের সদস্যদের নাম যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু ক্ষেত্রে সরকারি এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার) সুবিধা পাওয়া গেলেও কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি সংকটে রয়েছে। এক ক্ষেত্রে ২০২২ সালে এমপিও পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে তা বাতিল হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফিলিং স্টেশন পরিচালনার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁর ছেলের নামে মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন এবং স্ত্রী ও মেয়ের নামে মীর লাবনী-নুসরাত ফিলিং স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা খাতের পর এবার জ্বালানি খাতেও পরিবারের নাম ব্যবহারের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রভাব প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত। কিছু সূত্রের ভাষ্যমতে, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ, বদলি এবং প্রকল্প পরিচালনায় তাঁর প্রভাব রয়েছে। একটি সূত্র দাবি করে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বাইরেও তাঁর প্রভাব কাজ করে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বাধীন যাচাই বা সরকারি প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিমন্ত্রীর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সিমান্ত বিদেশে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তাঁর নাম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একটি পদে নিয়োগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে পদত্যাগ করার বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনে তাঁর অবস্থান এবং স্থানীয় একটি ঠিকাদারি প্রকল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে, যা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

বিভিন্ন সময় সংসদে এবং প্রশাসনিক বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা এবং অন্যান্য সমস্যাকে অস্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে সমস্যা “ভুয়া ও ভিত্তিহীন” বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ঘটনার বিষয়ে তিনি তা “পুরোনো ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য” বলে দাবি করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

শেয়ার করুন

নেমপ্লেট সংস্কৃতির ‘মন্ত্রীর’ উত্থান: নিজের বংশ ও দুই ছেলের নামে তিন ইউনিয়নের নামকরণ

প্রকাশঃ ০৩:৪১:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা


বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন গঠিত ইউনিয়নগুলোর নামকরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি খাত এবং সরকারি প্রকল্পে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শায়েহ আলমের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের নামকে কেন্দ্র করে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফিলিং স্টেশন এবং অবকাঠামো প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে। এসব নামকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে সমালোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। এগুলোর নাম রাখা হয় “মিরবাড়ি”, “সীমান্ত”, “দিগন্ত” এবং “স্বরনগ্রাম”। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, “সীমান্ত” ও “দিগন্ত” নাম দুটি প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিল থাকায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

তবে প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

“সীমান্ত” নামটি এলাকার ভৌগোলিক সীমান্ত অবস্থানকে বোঝায় এবং “দিগন্ত” শব্দটি দূরবর্তী এলাকা বা বিস্তৃত ভৌগোলিক ধারণা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। 

প্রতিমন্ত্রী মীর শায়েহ আলম

স্থানীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সাধারণত জনমত যাচাই ও একাধিক ধাপের অনুমোদন থাকলেও এখানে ডিও (ডেমি অফিসিয়াল) চিঠির প্রভাব ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রস্তাব যখন আসে, তখন প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একটিই নাম দেওয়া ছিল, বিকল্প কোনো নাম ছিল না।”

২০০১ সাল থেকে প্রতিমন্ত্রী মীর শায়েহ আলম বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে বেতগাড়ি মীর শায়েহ আলম গার্লস হাই স্কুল, মীর শায়েহ আলম টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু তাঁর নাম নয়, তাঁর স্ত্রী লাবনী আক্তারের নামেও ভবনের নামকরণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া একই এলাকায় মীরবাড়ি নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও এতিমখানারও নামকরণ রয়েছে, যেখানে পরিবারের সদস্যদের নাম যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু ক্ষেত্রে সরকারি এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার) সুবিধা পাওয়া গেলেও কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি সংকটে রয়েছে। এক ক্ষেত্রে ২০২২ সালে এমপিও পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে তা বাতিল হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফিলিং স্টেশন পরিচালনার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁর ছেলের নামে মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন এবং স্ত্রী ও মেয়ের নামে মীর লাবনী-নুসরাত ফিলিং স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা খাতের পর এবার জ্বালানি খাতেও পরিবারের নাম ব্যবহারের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রভাব প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত। কিছু সূত্রের ভাষ্যমতে, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ, বদলি এবং প্রকল্প পরিচালনায় তাঁর প্রভাব রয়েছে। একটি সূত্র দাবি করে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বাইরেও তাঁর প্রভাব কাজ করে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বাধীন যাচাই বা সরকারি প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিমন্ত্রীর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সিমান্ত বিদেশে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তাঁর নাম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একটি পদে নিয়োগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে পদত্যাগ করার বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনে তাঁর অবস্থান এবং স্থানীয় একটি ঠিকাদারি প্রকল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে, যা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

বিভিন্ন সময় সংসদে এবং প্রশাসনিক বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা এবং অন্যান্য সমস্যাকে অস্বীকার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে সমস্যা “ভুয়া ও ভিত্তিহীন” বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ঘটনার বিষয়ে তিনি তা “পুরোনো ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য” বলে দাবি করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।