নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সবাই, উইন রোজারিওর ন্যায়বিচারের দাবিতে নীরবতা কেন?
- প্রকাশঃ ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৫
- / 6
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এখন নির্বাচনী ব্যস্ততা তুঙ্গে। বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ঘিরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ, প্যানেল গঠন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অভিনন্দন, পাল্টা বক্তব্য ও প্রতিবাদের আয়োজন। কে কার পক্ষে, কে কার বিপক্ষে, কে কাকে কী বললেন, কে কোন বক্তব্যের প্রতিবাদ করলেন, এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরগরম। কিন্তু এই কোলাহলের বাইরে এমন একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে, যা কমিউনিটির নেতৃত্বের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা: মানুষের বিপদের সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন কারা?
এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উইন রোজারিওর নাম।
উইনও আমাদের সন্তান। মানসিক সংকটে থাকা এক তরুণ। তাঁকে সহায়তা করার জন্য পুলিশ ডাকা হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেবে, বিপর্যস্ত তরুণকে নিরাপদ রাখবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সেই সহায়তার পরিণতি হয় মর্মান্তিক। মায়ের চোখের সামনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান উইন।
একজন মা নিজের সন্তানকে বাঁচানোর আশায় সাহায্য চেয়েছিলেন। সেই সাহায্য চাওয়ার পরিণতিতে সন্তানকে হারানোর শোক তাঁকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এখন তাঁর লড়াই সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের দাবিকে সামনে রাখার। এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিহাস আর কী হতে পারে?
ঘটনাটি ঘটেছে নিউইয়র্কে, যে শহরে আমাদের অনেকের বসবাস, কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্কের বিস্তার। অথচ বাংলাদেশি কমিউনিটির সাম্প্রতিক কোলাহলে উইন রোজারিওর নাম কতটা জায়গা পাচ্ছে? তাঁকে ঘিরে কোনো নির্বাচনী প্যানেল নেই, প্রচারণার ব্যানার নেই, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ঘটনা এবং পরিবারের বিচারপ্রার্থনা কি আমাদের সামাজিক দায়িত্বের বাইরে?
উইন রোজারিওর মৃত্যুর ঘটনায় নিউইয়র্ক সিটির সিভিলিয়ান কমপ্লেইন্ট রিভিউ বোর্ড (সিসিআরবি) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের অভিযোগ এনেছে। টেজার ব্যবহারকারী কর্মকর্তা সালভাতোর আলংগি বিভাগীয় বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই অবসরে গেছেন। পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ ঘটনাটিকে ‘মানবিক ত্রুটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্য কর্মকর্তা মাথিউ চিয়ানোফ্রোকো এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন। তাঁর বিভাগীয় বিচারের তারিখও নির্ধারিত হয়নি বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। অভিযোগ উত্থাপন এবং চূড়ান্তভাবে দায় নির্ধারণ এক বিষয় নয়। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাঁকে দোষী বলা যায় না। একইভাবে, তদন্ত বা বিভাগীয় প্রক্রিয়া চলমান থাকলে জবাবদিহির প্রশ্নও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না।
বরং এমন ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত, যথাযথ বিভাগীয় প্রক্রিয়া এবং পরিবারের কাছে জবাব দেওয়ার দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন কর্মকর্তা অবসরে গেছেন, আরেকজন চাকরিতে বহাল রয়েছেন। কিন্তু উইনের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের প্রশ্নগুলোর উত্তর কীভাবে মিলবে, জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে, সেই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব কমে যায়নি।
একটি প্রাণহানির ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়। বিশেষ করে যখন সহায়তার জন্য ডাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে, তখন বিষয়টি জনস্বার্থের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। মানসিক সংকটে থাকা মানুষের সঙ্গে পুলিশের আচরণ, বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
একজন শোকার্ত মাকে কেন বারবার সংবাদ সম্মেলন করতে হবে? কেন তাঁকে সিটি হলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাইতে হবে? কেন সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা জনপরিসরে আলোচনায় রাখতে তাঁকেই বারবার উদ্যোগ নিতে হবে?
এই প্রশ্নগুলো শুধু উইন রোজারিওর মাকে ঘিরে নয়। এগুলো এমন সব পরিবারের প্রশ্ন, যারা কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাঁরা পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারেন, জনসচেতনতা তৈরি করতে পারেন এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবিকে সামনে রাখতে পারেন। এসব উদ্যোগের জন্য কাউকে আগেভাগে দোষী ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার।
নির্বাচনের সময় জনদরদি, সংকটে নীরব কেন?
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সংগঠনের অভাব নেই। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, উপদেষ্টা, নির্বাচন পরিচালনাকারী, প্যানেল ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। নির্বাচনের সময় মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণের কথা জোর দিয়ে বলা হয়। কমিউনিটির জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতিও শোনা যায়।
কিন্তু নেতৃত্বের মূল্যায়ন কি শুধু নির্বাচনী প্রচার, বক্তব্য কিংবা পদ-পদবির ভিত্তিতে হওয়া উচিত?
একটি সংগঠন মানুষের অধিকার ও কল্যাণের কথা বললে তার কাছে প্রত্যাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা এই নয় যে প্রতিটি সংগঠনকে প্রতিটি আইনি ঘটনায় সরাসরি পক্ষ নিতে হবে। প্রত্যাশা হলো, কমিউনিটির কোনো সদস্যের জীবন, নিরাপত্তা বা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সামনে এলে তারা অন্তত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
উইন রোজারিও কি আমাদের কমিউনিটির সন্তান নন? তাঁর মায়ের শোক কি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ নয়? একটি পরিবারের বিচারপ্রার্থনা কি কমিউনিটির সম্মিলিত উদ্যোগের বিষয় হতে পারে না?
এসব প্রশ্ন তোলা মানে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়াই অভিযুক্ত করা নয়। বরং নেতৃত্বের কাছে তাদের ঘোষিত দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ প্রত্যাশা করা।
কেউ বলতে পারেন, বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন আর নিউইয়র্ক পুলিশের জবাবদিহি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কথাটি ঠিক। কিন্তু একটি সামাজিক সংগঠনের কাজ কি কেবল সদস্যদের নির্বাচন, অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা কমিউনিটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামলানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ? সংগঠন যদি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণের কথা বলে, তাহলে বৃহত্তর জনস্বার্থের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় সংহতি প্রকাশ, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও তার কাজের অংশ হতে পারে।
একটি বিবৃতি, সংহতি সমাবেশ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তোলা হয়তো পুরো বিচারপ্রক্রিয়া বদলে দেবে না। কিন্তু এতে পরিবারটি বুঝতে পারে, তাদের লড়াই একান্ত ব্যক্তিগত নয়; কমিউনিটির মানুষও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিমানবন্দরে কে কাকে প্রশ্ন করলেন, কে সেই প্রশ্নের জবাবে কী বললেন, কে কাকে অপমান করলেন কিংবা কার বক্তব্যের প্রতিবাদে কে বিবৃতি দিলেন, এসব নিয়ে আমরা দীর্ঘ সময় আলোচনা করতে পারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলে, সমর্থক ও বিরোধীরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে আগ্রহও থাকে ব্যাপক।
এসব আলোচনা নিজে থেকে অপ্রয়োজনীয় নয়। কমিউনিটির নির্বাচন, নেতৃত্বের জবাবদিহি ও সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের মনোযোগের ভারসাম্য কোথায়?
একটি ব্যক্তিগত বিরোধ বা নির্বাচনী বিতর্ক যদি দিনের পর দিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, অথচ একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের বিচারপ্রার্থনা যথেষ্ট মনোযোগ না পায়, তাহলে আমাদের অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবতে হবে।
ড্রামসহ কিছু মানবাধিকার সংগঠন উইন রোজারিওর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণের প্রশ্নও থেকে যায়। পরিচিত মুখ, নির্বাচনী প্যানেল এবং সামাজিক সংগঠনগুলো কীভাবে পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবিকে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
এখানে কোনো পক্ষকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রশ্ন নেই। প্রশ্নটি একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি সমর্থনের।
সোসাইটির সভাপতি কে হবেন, কোন প্যানেল জয়ী হবে, নির্বাচনের পর সংগঠন কীভাবে চলবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু নেতৃত্বের সাফল্য পরিমাপের একমাত্র মানদণ্ড এগুলো হতে পারে না। নেতৃত্বের আরেকটি পরীক্ষা হলো, যখন কোনো মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন, যখন কোনো পরিবার দীর্ঘ লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়, তখন সেই নেতৃত্ব কতটা দায়িত্ব নিয়ে পাশে দাঁড়ায়।
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মানুষের সেবা করার ঘোষণা দেওয়া সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা ব্যবহার করাও সহজ। কঠিন হলো, আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও কোনো ন্যায্য দাবির পাশে দাঁড়ানো; প্রচারণার সুবিধা না থাকলেও দায়িত্ব পালন করা; এবং দীর্ঘ সময় ধরে একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা।
উইন রোজারিওর মৃত্যুর ঘটনায় চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার। কিন্তু পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, স্বচ্ছতা দাবি করা এবং জনসচেতনতা তৈরি করা কমিউনিটির পক্ষেও সম্ভব। এ জন্য বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প তৈরি করতে হবে না; বরং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবিকে সমর্থন করতে হবে।
আমাদের নিজেদের কাছেই তাই প্রশ্ন রাখা দরকার: আমরা কেমন কমিউনিটি গড়তে চাই? আমাদের নেতৃত্ব কাদের জন্য কাজ করবে? নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়ার যে আগ্রহ দেখা যায়, সংকটের সময়ও কি তার কিছুটা প্রতিফলন ঘটবে?
উইন রোজারিওর নাম যেন নির্বাচনী কোলাহলের আড়ালে হারিয়ে না যায়। তাঁর পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি যেন কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত লড়াই হয়ে না থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি তোলা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ঘটনাটি নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
একজন সন্তানহারা মায়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য পদ-পদবি লাগে না। লাগে সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার। কমিউনিটির নেতৃত্বের কাছে এই প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। উইন রোজারিওর জন্য ন্যায়বিচার চাই। তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব।





























