ফিরে দেখা ১৯৭৯: কেমন ছিল ইরানের সেই ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লব?
- প্রকাশঃ ১২:৪৩:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 44
তেহরানের আলাভি স্কুলের ব্যালকনি থেকে হাত নাড়াচ্ছেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ছবি: রযটার্স ফাইল ছবি
আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। ঠিক ৪৭ বছর আগে আজকের এই দিনে পারস্যের মানচিত্র থেকে আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ইরান। দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রত্যাবর্তন এবং পশ্চিমা সমর্থিত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির পতন—মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। আজ সেই ঐতিহাসিক ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণার ৪৭তম বার্ষিকী।
ইতিহাসের বাঁক বদল: ১৯৪১ থেকে ১৯৭৯
ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতালাভের ইতিহাস ছিল নাটকীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ও সোভিয়েত প্রভাবে তাঁর বাবা রেজা শাহ পদত্যাগ করতে বাধ্য হলে মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন মোহাম্মদ রেজা। শুরুতে তিনি সাংবিধানিক রাজা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, গ্রহণ করেন ‘শাহেনশাহ’ (রাজাদের রাজা) উপাধি।

বিপ্লবের নেপথ্য কারণ: অসন্তোষের দাবানল
বিশ্লেষকদের মতে, শাহের পতন কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না। এর পেছনে ছিল কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ: রাজনৈতিক দমন-পীড়ন: শাহের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’-এর মাধ্যমে বিরোধীদের ওপর নির্মম নির্যাতন। সাংস্কৃতিক সংঘাত: ১৯৬৩ সালের ‘হোয়াইট রেভোল্যুশন’-এর মাধ্যমে অতি-পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচার, যা রক্ষণশীল ইরানি সমাজ ও ধর্মীয় নেতাদের ক্ষুব্ধ করে। বিদেশি প্রভাব: তেল শিল্প ও জাতীয় রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরাসরি হস্তক্ষেপ।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরাক ও ফ্রান্স থেকে শাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় গণবিক্ষোভ ও ধর্মঘট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসার অজুহাতে দেশ ছাড়েন শাহ।
খোমেনির প্রত্যাবর্তন ও নতুন ইরান
শাহ পালিয়ে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পর ১ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন শেষে বীরের বেশে তেহরানে ফেরেন খোমেনি। তাঁর আহ্বানে কয়েক লাখ মানুষের জমায়েত ঐতিহাসিক বিপ্লবকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। ১১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’।

বিপ্লব-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বিপ্লবের পর ইরান দুজন ‘সর্বোচ্চ নেতা’ (সুপ্রিম লিডার) দেখেছে। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর থেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দেশটির দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ৪৭ বছর পার হলেও ইরানের পথচলা মসৃণ হয়নি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেশটিকে বারবার অস্থির করে তুলছে।
২০০৯ সালের নির্বাচনী বিক্ষোভ থেকে শুরু করে ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন—ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভি ফের আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন, যাকে সমর্থন জানাচ্ছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৯৭৯ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো আজও ইরানের রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে ইসলামি শাসনতন্ত্রে রূপান্তরের সেই সাহসী অথচ বিতর্কিত ইতিহাস আজও বিশ্বরাজনীতিতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।













