ঢাকা ০২:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ লক্ষাধিক নথিবিহীন অভিবাসীকে বৈধতা দিচ্ছে স্পেন, তালিকায় বাংলাদেশিরাও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০১:২৬:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 43


স্পেনে অনিয়মিত বা বৈধ নথিবিহীন অবস্থায় থাকা পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসীকে নিয়মিতকরণের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা বহু অভিবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। আগামী এপ্রিল থেকে এই রয়্যাল ডিক্রির আওতায় আবেদন গ্রহণ শুরু হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গত ২৭ জানুয়ারি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট জোট সরকার মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি যুগান্তকারী রয়্যাল ডিক্রি অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি বড় অংশকে বৈধতার আওতায় আনার পথ খুলে যায়। ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের নিয়মিতকরণ বিরল। এর আগে ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস ও সর্বশেষ পর্তুগালে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে ইউরোপজুড়ে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া কঠোর শর্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, স্পেন মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের পথেই এগোচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া কবে থেকে চরমপন্থা হয়ে গেল? আর সহানুভূতি কবে থেকে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো?

সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই ডিক্রির মাধ্যমে যেসব মানুষ ইতোমধ্যে স্পেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য বসবাসের একটি সুশৃঙ্খল ও আইনি পথ তৈরি হবে। সানচেজ বলেন, তারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাজারে, গণপরিবহণে ও স্কুলে তাদের উপস্থিতি রয়েছে। তারা আমাদের বাবা-মায়ের দেখভাল করেন, মাঠে কাজ করেন এবং দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখেন।

এই নিয়মিতকরণের প্রস্তাবের পেছনে ছিল একটি নাগরিক উদ্যোগ, যেখানে সাত লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেন। ক্যাথলিক চার্চের বড় একটি অংশ এবং প্রায় ৯০০ সামাজিক সংগঠন এতে সমর্থন জানায়। ২০২৪ সালে সংসদে উত্থাপনের পর বিষয়টি ঝুলে থাকলেও সম্প্রতি পোদেমোস দলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অনুমোদনের পথ তৈরি হয়।

স্পেনের এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেখা গেছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে। পর্তুগালে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক অনিয়মিত অভিবাসী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। ফলে স্পেনের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে।

ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের নিজ নিজ কনস্যুলেটের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। তারা পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মাদ্রিদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিস্থিতি বিবেচনায় বার্সেলোনা ও অন্যান্য শহরে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা চালু করেছে, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দ্রুত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। একই ধরনের তৎপরতা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

সরকারি ডিক্রি অনুযায়ী, নিয়মিতকরণের আওতায় আসতে হলে আবেদনকারীদের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে এবং আবেদনের সময় অন্তত টানা পাঁচ মাস স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে। স্পেন বা অন্য কোনো দেশে ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকলে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করে বর্তমানে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীরাও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবেন। পাশাপাশি বৈধতা পাওয়া ব্যক্তিদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা সরাসরি পাঁচ বছরের বৈধ রেসিডেন্স পারমিট পাবেন।

নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশভিত্তিক কমিউনিটি গ্রুপে তথ্য বিনিময় বাড়ছে। তবে ভাষাগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান আইনি সহায়তা ও ভাষা প্রশিক্ষণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

কমিউনিটি সাংবাদিক নুরুল ওয়াহিদ বলেন, বৈধতা বিষয়ক ডিক্রি জারির পর কিছু অসাধু ব্যক্তি অল্প কাজের জন্য কয়েক গুণ বেশি অর্থ নিচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিজে আবেদন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে এর জন্য ২৫০ ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু যারা গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের আগে স্পেনে ছিলেন তাদের জন্য প্রযোজ্য। নতুন করে স্পেনে গেলে বৈধতার কোনো সুযোগ নেই। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রীয় সেবার সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত এনজিও সহায়তার অভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। এ কারণে আবেদনকারীদের সরকারি সূত্র ও দূতাবাসের তথ্যের ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

৫ লক্ষাধিক নথিবিহীন অভিবাসীকে বৈধতা দিচ্ছে স্পেন, তালিকায় বাংলাদেশিরাও

প্রকাশঃ ০১:২৬:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


স্পেনে অনিয়মিত বা বৈধ নথিবিহীন অবস্থায় থাকা পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসীকে নিয়মিতকরণের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা বহু অভিবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। আগামী এপ্রিল থেকে এই রয়্যাল ডিক্রির আওতায় আবেদন গ্রহণ শুরু হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গত ২৭ জানুয়ারি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট জোট সরকার মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি যুগান্তকারী রয়্যাল ডিক্রি অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি বড় অংশকে বৈধতার আওতায় আনার পথ খুলে যায়। ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের নিয়মিতকরণ বিরল। এর আগে ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস ও সর্বশেষ পর্তুগালে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে ইউরোপজুড়ে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া কঠোর শর্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, স্পেন মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের পথেই এগোচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া কবে থেকে চরমপন্থা হয়ে গেল? আর সহানুভূতি কবে থেকে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো?

সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই ডিক্রির মাধ্যমে যেসব মানুষ ইতোমধ্যে স্পেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য বসবাসের একটি সুশৃঙ্খল ও আইনি পথ তৈরি হবে। সানচেজ বলেন, তারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাজারে, গণপরিবহণে ও স্কুলে তাদের উপস্থিতি রয়েছে। তারা আমাদের বাবা-মায়ের দেখভাল করেন, মাঠে কাজ করেন এবং দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখেন।

এই নিয়মিতকরণের প্রস্তাবের পেছনে ছিল একটি নাগরিক উদ্যোগ, যেখানে সাত লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেন। ক্যাথলিক চার্চের বড় একটি অংশ এবং প্রায় ৯০০ সামাজিক সংগঠন এতে সমর্থন জানায়। ২০২৪ সালে সংসদে উত্থাপনের পর বিষয়টি ঝুলে থাকলেও সম্প্রতি পোদেমোস দলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অনুমোদনের পথ তৈরি হয়।

স্পেনের এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেখা গেছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে। পর্তুগালে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক অনিয়মিত অভিবাসী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। ফলে স্পেনের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে।

ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের নিজ নিজ কনস্যুলেটের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। তারা পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মাদ্রিদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিস্থিতি বিবেচনায় বার্সেলোনা ও অন্যান্য শহরে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা চালু করেছে, যাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দ্রুত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। একই ধরনের তৎপরতা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

সরকারি ডিক্রি অনুযায়ী, নিয়মিতকরণের আওতায় আসতে হলে আবেদনকারীদের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে এবং আবেদনের সময় অন্তত টানা পাঁচ মাস স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে। স্পেন বা অন্য কোনো দেশে ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকলে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করে বর্তমানে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীরাও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবেন। পাশাপাশি বৈধতা পাওয়া ব্যক্তিদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা সরাসরি পাঁচ বছরের বৈধ রেসিডেন্স পারমিট পাবেন।

নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশভিত্তিক কমিউনিটি গ্রুপে তথ্য বিনিময় বাড়ছে। তবে ভাষাগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান আইনি সহায়তা ও ভাষা প্রশিক্ষণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

কমিউনিটি সাংবাদিক নুরুল ওয়াহিদ বলেন, বৈধতা বিষয়ক ডিক্রি জারির পর কিছু অসাধু ব্যক্তি অল্প কাজের জন্য কয়েক গুণ বেশি অর্থ নিচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিজে আবেদন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে এর জন্য ২৫০ ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু যারা গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের আগে স্পেনে ছিলেন তাদের জন্য প্রযোজ্য। নতুন করে স্পেনে গেলে বৈধতার কোনো সুযোগ নেই। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রীয় সেবার সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত এনজিও সহায়তার অভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। এ কারণে আবেদনকারীদের সরকারি সূত্র ও দূতাবাসের তথ্যের ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”