ইরানে আহত বিক্ষোভকারীরা কেন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে চান না
- প্রকাশঃ ০৩:০৪:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / 15
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে আহত অনেক বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চাইছেন না। নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি ও হাসপাতাল থেকে রোগীদের আটক করার অভিযোগের কারণে তাঁরা গোপনে চিকিৎসকদের মাধ্যমে বাড়িতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ইস্পাহান শহরের এক বিক্ষোভকারী তারা (ছদ্মনাম) জানান, বিক্ষোভ চলাকালে মোটরসাইকেলে আসা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তিনি ও তাঁর বন্ধু গুলিবিদ্ধ হন। পরে স্থানীয়রা তাঁদের একটি গাড়িতে তুলে দিলেও তিনি বারবার অনুরোধ করেন, যেন তাঁদের হাসপাতালে না নেওয়া হয়। কারণ, সেখানে গেলে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
তারা বলেন, “সব অলিগলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যে ভরা ছিল। এক দম্পতির বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আমরা রাত কাটাই। ভোরে পরিচিত এক চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি গোপনে আমাদের চিকিৎসা করেন।”
তাঁদের শরীর থেকে গুলির ক্ষুদ্র অংশ বের করতে এক সার্জন বাড়িতে গিয়ে অস্ত্রোপচার করেন। তবে সব বুলেট বের করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি সতর্ক করেন।
বিক্ষোভের সময় ইরান সরকার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপর সংবাদ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার ৩০১ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু এবং ৫০ জন পথচারী। এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর ২১৪ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি আরও ১৭ হাজারের বেশি মৃত্যুর খবর যাচাই করছে।
তবে ইরান সরকার জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা তিন হাজারের কিছু বেশি এবং নিহতদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
এইচআরএএনএর তথ্যমতে, অন্তত ১১ হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে না গিয়ে গোপনে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
তেহরানের এক সার্জন নিমা (ছদ্মনাম) বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি এড়াতে তিনি এক আহত তরুণকে গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি বলেন, “আমরা প্রায় চার দিন না ঘুমিয়ে অস্ত্রোপচার করেছি। পুরো হাসপাতাল রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।”
আরেক বিক্ষোভকারী সিনা (ছদ্মনাম) জানান, ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতি ছিল। স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা নিতে পরিচয়পত্র দিতে বাধ্য হওয়ায় তিনি আতঙ্কে আছেন যে, যেকোনো সময় তাঁদের বাড়িতে অভিযান চালানো হতে পারে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি রয়েছে এবং রোগীদের নথিপত্র নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে। অনেক চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে রোগীর আঘাতের তথ্য রেকর্ডে উল্লেখ করছেন না, যাতে রোগীদের শনাক্ত করা না যায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ায় চিকিৎসকদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক ও একজন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সম্প্রতি কাজভিন শহরের সার্জন ড. আলিরেজা গোলচিনিকে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ‘খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগ আনা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেন শোকরি দাবি করেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরপেক্ষভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং মানুষ সেখানে আস্থার সঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
তবে আহত বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ও নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কাই ইরানের আহত বিক্ষোভকারীদের হাসপাতালে যেতে নিরুৎসাহিত করছে।

























