ঢাকা ১০:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রমজান সামনে, কিন্তু সংকট কাটছে না এলপিজির

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ১০:০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 18

এলপিজি। প্রতীকী ছবি


রান্নার জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)–এর সংকট শিগগিরই কাটছে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এলপিজি আমদানি নিশ্চিত করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। উল্টো এক মাসের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ২১ হাজার টন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার টন। জানুয়ারিতে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন। কিন্তু বাস্তবে আমদানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করা হলেও আমদানিকারকেরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আমদানি বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা সহজ করাসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। বাড়তি জাহাজভাড়া বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি মূল্য সমন্বয় করলেও অনেক কোম্পানি এলসি খুলতে পারেনি। আবার বড় কোম্পানি উচ্চমূল্যে আমদানি করতে চাইলেও বৈশ্বিক খোলাবাজারে পর্যাপ্ত এলপিজি পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করায় বিকল্প বাজারের সন্ধান করা হচ্ছে।

দেশের শীর্ষ এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজেআই) ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলেও তারা এলপিজি আমদানি অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর আশা, মার্চের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।

অন্যদিকে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত মাসে জ্বালানি বিভাগ হঠাৎ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) এলপিজি আমদানির অনুমতি দেয়। বিপিসি আমদানি করে বেসরকারি কোম্পানিকে সরবরাহ করবে—এমন ঘোষণার কারণে অনেক ব্যবসায়ী আমদানিতে আগ্রহ কমিয়ে দেন। তবে বিপিসি এখনো আমদানি শুরু করতে পারেনি, তাদের সক্ষমতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

বিপিসি সূত্র জানায়, সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর তারা ১১টি দেশে চিঠি পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আগ্রহ ও সক্ষমতা বিবেচনায় তালিকা তৈরি করে দরদাম চূড়ান্ত করা হবে। এতে আমদানিতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিইআরসি ও লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির। তবে গত বছর আমদানি করেছে মাত্র ১৭টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি বছরের শেষ দিকে আমদানি বন্ধ করে দেয়। মোট আমদানির বড় অংশ করেছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানি। তারা সময়মতো আমদানির অনুমতি না পাওয়ায় গত নভেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এলপিজি আমদানি কমে যায় ৪৪ শতাংশ। ফলে বাজারে ব্যাপক ঘাটতি সৃষ্টি হয় এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তীব্র সংকট দেখা দেয়।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক ও লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, বিশ্বজুড়েই এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে অনেক দেশ পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। তাঁর মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।

চলমান সংকটের মধ্যেই ফেব্রুয়ারির জন্য নতুন দাম ঘোষণা করেছে বিইআরসি। কমিশনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ প্রতি কেজি ১১৩ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। তবে বাস্তবে এই দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী কমিশন নিয়মিত দাম ঘোষণা করছে, যাতে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না তা বোঝা যায়। নির্ধারিত পরিমাণে আমদানি না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বর্তমানে দেশে এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। বাজারে সংকটের সুযোগে বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন।

রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার বাসিন্দা সাহানা সাত্তার বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সোমবার তিনি একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আমদানি বাড়ানো এবং বাজার তদারকি জোরদার না করলে এলপিজি সংকট আরও গভীর হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

শেয়ার করুন

রমজান সামনে, কিন্তু সংকট কাটছে না এলপিজির

প্রকাশঃ ১০:০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এলপিজি। প্রতীকী ছবি


রান্নার জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)–এর সংকট শিগগিরই কাটছে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এলপিজি আমদানি নিশ্চিত করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। উল্টো এক মাসের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ২১ হাজার টন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার টন। জানুয়ারিতে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন। কিন্তু বাস্তবে আমদানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করা হলেও আমদানিকারকেরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আমদানি বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা সহজ করাসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। বাড়তি জাহাজভাড়া বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি মূল্য সমন্বয় করলেও অনেক কোম্পানি এলসি খুলতে পারেনি। আবার বড় কোম্পানি উচ্চমূল্যে আমদানি করতে চাইলেও বৈশ্বিক খোলাবাজারে পর্যাপ্ত এলপিজি পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করায় বিকল্প বাজারের সন্ধান করা হচ্ছে।

দেশের শীর্ষ এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজেআই) ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলেও তারা এলপিজি আমদানি অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর আশা, মার্চের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।

অন্যদিকে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত মাসে জ্বালানি বিভাগ হঠাৎ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) এলপিজি আমদানির অনুমতি দেয়। বিপিসি আমদানি করে বেসরকারি কোম্পানিকে সরবরাহ করবে—এমন ঘোষণার কারণে অনেক ব্যবসায়ী আমদানিতে আগ্রহ কমিয়ে দেন। তবে বিপিসি এখনো আমদানি শুরু করতে পারেনি, তাদের সক্ষমতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

বিপিসি সূত্র জানায়, সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর তারা ১১টি দেশে চিঠি পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আগ্রহ ও সক্ষমতা বিবেচনায় তালিকা তৈরি করে দরদাম চূড়ান্ত করা হবে। এতে আমদানিতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিইআরসি ও লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির। তবে গত বছর আমদানি করেছে মাত্র ১৭টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি বছরের শেষ দিকে আমদানি বন্ধ করে দেয়। মোট আমদানির বড় অংশ করেছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানি। তারা সময়মতো আমদানির অনুমতি না পাওয়ায় গত নভেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এলপিজি আমদানি কমে যায় ৪৪ শতাংশ। ফলে বাজারে ব্যাপক ঘাটতি সৃষ্টি হয় এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তীব্র সংকট দেখা দেয়।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক ও লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, বিশ্বজুড়েই এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে অনেক দেশ পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। তাঁর মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।

চলমান সংকটের মধ্যেই ফেব্রুয়ারির জন্য নতুন দাম ঘোষণা করেছে বিইআরসি। কমিশনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ প্রতি কেজি ১১৩ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। তবে বাস্তবে এই দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী কমিশন নিয়মিত দাম ঘোষণা করছে, যাতে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না তা বোঝা যায়। নির্ধারিত পরিমাণে আমদানি না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বর্তমানে দেশে এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। বাজারে সংকটের সুযোগে বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন।

রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার বাসিন্দা সাহানা সাত্তার বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সোমবার তিনি একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আমদানি বাড়ানো এবং বাজার তদারকি জোরদার না করলে এলপিজি সংকট আরও গভীর হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।