ঢাকা ১১:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০৪:২৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 27

‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে। ছবি: সংগৃহীত   


সরকার যদি মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

সোমবার (আজ) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন–পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায় রয়েছে। শুরু থেকেই সরকার মব সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।

মব সহিংসতার উৎপত্তি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মব সহিংসতার সূচনা হয়েছে সরকারের ভেতর থেকেই। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের সৃষ্টি হয়। এরপর সরকারের বাইরের শক্তিগুলো ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে এবং মব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর কোনো হত্যাকাণ্ড না হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা যেন আর না হয়। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, নির্বাচন-পরবর্তী কয়েক দিনও ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। সরকার এই ঝুঁকির বিষয়টি অবগত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

তবে অতীতের নির্বাচনী ইতিহাসের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, আগের নির্বাচনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হবে।

জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী জবাবদিহি প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢালাওভাবে মামলায় জড়িয়ে সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে। পেশাগত অবস্থান অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া এসব পদক্ষেপ বিচার নাকি প্রতিশোধ—সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত অপরাধী ও কর্তৃত্ববাদের দোসরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধের প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থার জন্য যেসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপত্তি জানানো হয়েছে।

নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক ধারণা গ্রহণ করলে আপত্তি থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা কার্যকর হবে কি না, সেটি দেখার বিষয় বলে মন্তব্য করেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট এলে সংস্কার বাস্তবায়ন পরবর্তী সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে সরকার উপেক্ষা করেছে এবং নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের ও বাইরের শক্তি ভূমিকা রেখেছে। বাইরের শক্তিকে সরকার অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান করে তুলেছে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে, পেশাদারত্বের সঙ্গে ও নিরাপদে কাজ করতে পারবে—এমন চিন্তাভাবনা অন্তর্বর্তী সরকার ধারণ করেছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। দুটি মিডিয়া কমিশন লোকদেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারক নিয়োগ কমিটি ও স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়ের মতো কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তার জবাব পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। বিচারব্যবস্থায় দলীয়করণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

শেয়ার করুন

মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে: টিআইবি

প্রকাশঃ ০৪:২৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে। ছবি: সংগৃহীত   


সরকার যদি মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

সোমবার (আজ) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন–পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায় রয়েছে। শুরু থেকেই সরকার মব সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।

মব সহিংসতার উৎপত্তি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মব সহিংসতার সূচনা হয়েছে সরকারের ভেতর থেকেই। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের সৃষ্টি হয়। এরপর সরকারের বাইরের শক্তিগুলো ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে এবং মব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর কোনো হত্যাকাণ্ড না হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা যেন আর না হয়। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, নির্বাচন-পরবর্তী কয়েক দিনও ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। সরকার এই ঝুঁকির বিষয়টি অবগত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

তবে অতীতের নির্বাচনী ইতিহাসের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, আগের নির্বাচনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হবে।

জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী জবাবদিহি প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢালাওভাবে মামলায় জড়িয়ে সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে। পেশাগত অবস্থান অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া এসব পদক্ষেপ বিচার নাকি প্রতিশোধ—সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত অপরাধী ও কর্তৃত্ববাদের দোসরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধের প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থার জন্য যেসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপত্তি জানানো হয়েছে।

নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক ধারণা গ্রহণ করলে আপত্তি থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা কার্যকর হবে কি না, সেটি দেখার বিষয় বলে মন্তব্য করেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট এলে সংস্কার বাস্তবায়ন পরবর্তী সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে সরকার উপেক্ষা করেছে এবং নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের ও বাইরের শক্তি ভূমিকা রেখেছে। বাইরের শক্তিকে সরকার অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান করে তুলেছে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে, পেশাদারত্বের সঙ্গে ও নিরাপদে কাজ করতে পারবে—এমন চিন্তাভাবনা অন্তর্বর্তী সরকার ধারণ করেছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। দুটি মিডিয়া কমিশন লোকদেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারক নিয়োগ কমিটি ও স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়ের মতো কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তার জবাব পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। বিচারব্যবস্থায় দলীয়করণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।