এক প্রজন্ম পর কোটি কোটি মানুষ দেখল সূর্যগ্রহণ, আবার কবে দেখা যাবে এমন মহাজাগতিক দৃশ্য?
- প্রকাশঃ ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০৬
- / 12
লন্ডন, ১৩ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – প্রায় ৩০ বছর পর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিরল এক সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা গেলেও গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু অংশ থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। স্পেনের নির্দিষ্ট অঞ্চলে কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো অনেকটা নিভে গিয়ে তৈরি হয় রাতের মতো অন্ধকার পরিবেশ।
যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উত্তর স্কটল্যান্ড থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা শুরু হয়। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে তা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের কিছু আগে। সন্ধ্যা ৭টার পর গ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে দেশটির অধিকাংশ এলাকা থেকে সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ চাঁদের আড়ালে চলে যেতে দেখা যায়। কর্নওয়ালে সূর্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ ঢাকা পড়ে।
মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বেশিরভাগ এলাকায় আকাশ পরিষ্কার থাকায় মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের ওপর দিয়ে চাঁদের ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার দৃশ্য দেখেন। উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিছু এলাকায় মেঘ থাকলেও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে সূর্যগ্রহণ দেখতে মানুষের ভিড় ছিল।
তবে স্পেনের কিছু অঞ্চলে দৃশ্যটি ছিল আরও নাটকীয়। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় চলে এলে সেখানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। চাঁদের আড়ালে সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যাওয়ার পর আকাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং সূর্যের করোনা বা বাইরের বায়ুমণ্ডলীয় স্তর দৃশ্যমান হয়।
চিলির বিজ্ঞানী ইয়াসমিন কাত্রিচিও হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের আ করুনা শহরে এই দৃশ্য দেখতে যান। পূর্ণগ্রাসের মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেখানে উপস্থিত সবাই উল্লাস করছিলেন এবং সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

সূর্যগ্রহণ দেখতে যুক্তরাজ্যজুড়ে বিশেষ চশমার চাহিদাও বেড়ে যায়। গ্রহণের আগে বিভিন্ন দোকানে এসব চশমার সংকট দেখা দেয়। অনেকে নিরাপদভাবে গ্রহণ দেখার জন্য রান্নাঘরের ঝাঁঝরি, কর্নফ্লেক্সের খালি বাক্স ও বিশেষ কাগজ ব্যবহার করেন।
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে এসে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি আটকে দেয়। যুক্তরাজ্য থেকে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি একই সরলরেখায় না থাকায় সেখানে আংশিক গ্রহণ দেখা গেছে। অন্যদিকে পূর্ণগ্রাসের পথে থাকা স্পেনের কিছু অঞ্চলে চাঁদ পুরোপুরি সূর্যকে ঢেকে দেয়।
পূর্ণগ্রাসের সময় সূর্যের করোনা দৃশ্যমান হয়। সূর্যের এই বাইরের স্তরে অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাস মহাশূন্যে ছড়িয়ে থাকে। কিছু পর্যবেক্ষক সূর্যের প্রমিনেন্স বা সৌরশিখার গোলাপি আভাও দেখতে পেয়ে থাকতে পারেন।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে গড়ে প্রায় ১৮ মাস পরপর ঘটলেও একই নির্দিষ্ট স্থান থেকে এমন দৃশ্য দেখা অত্যন্ত বিরল। সাধারণ হিসাবে, কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রায় ৪০০ বছর পরপর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যেতে পারে।
এই বিরলতার পেছনে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের আপাত আকারের একটি বিশেষ সম্পর্কও কাজ করে। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে, যা পৃথিবী ও চাঁদের গড় দূরত্বের প্রায় ৪০০ গুণ। একইভাবে সূর্যের ব্যাস চাঁদের ব্যাসের প্রায় ৪০০ গুণ। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে দুটিকে আকাশে প্রায় একই আকারের মনে হয় এবং পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সম্ভব হয়।
আগামী কয়েক বছরেও পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার একাধিক সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এমন তিনটি গ্রহণ দেখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব গ্রহণ যুক্তরাজ্য থেকে পূর্ণগ্রাস হিসেবে দেখা যাবে না।
২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের কিছু অঞ্চল থেকে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যেতে পারে, যেখানে সূর্যের সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢেকে যেতে পারে। দেশটি থেকে আরও বড় ধরনের গ্রহণ দেখতে অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়। হিসাব অনুযায়ী, ২০৮১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে সূর্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ ঢাকা পড়ার মতো একটি গ্রহণ দেখা যেতে পারে। আর দেশটিতে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে।
























