কাজী নজরুল ইসলামের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র কেন এখনো নির্মিত হয়নি? — সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের পথ
- প্রকাশঃ ০৭:৩১:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 47
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর কবিতা, গান ও দ্রোহ বাঙালির প্রতিটি সংগ্রামে শক্তি জুগিয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান যেমন তিনি দিয়েছেন, তেমনি প্রেম ও মানবতার বাণীতে হয়েছেন সর্বজনীন। সৈনিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, অভিনেতা ও সুরকার—এত বহুমাত্রিক জীবন খুব কম মানুষেরই ছিল। নজরুলের জীবন নিজেই যেন এক মহাকাব্য। অথচ এত বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় জীবন থাকার পরও আজ পর্যন্ত তাঁর ওপর পূর্ণাঙ্গ কোনো জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র (বায়োপিক) নির্মিত হয়নি—যা বিস্ময়কর।
চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম, যা সহজেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বই বা গবেষণার পরিসর সীমিত হলেও চলচ্চিত্র নজরুলকে পৌঁছে দিতে পারে গণমানুষের ঘরে ঘরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা মহাত্মা গান্ধীর জীবনী নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আমাদের দেশেও নবাব সিরাজউদ্দৌলা বা তিতুমীরকে নিয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু নজরুলের মতো বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী একজন মানুষের ওপর এখনো বড় পর্দায় পূর্ণাঙ্গ কোনো কাজ না হওয়া আমাদের সাংস্কৃতিক দীনতারই প্রতিফলন।
নজরুলকে নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তব রূপ পায়নি। পাকিস্তান আমলে সচ্চিদানন্দ সেন মজুমদার নজরুলের জীবনী নিয়ে তথ্যসংগ্রহ শুরু করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকে চিত্রগ্রাহক আবদুস সামাদ ও সাংবাদিক রাহাত খান নজরুলের যৌবনভিত্তিক কাহিনীচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি নজরুলের শৈশব নিয়ে ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এমনকি এক সময় কানাডা-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা তৈরির কথাও ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিক অসহযোগিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় সব উদ্যোগই মাঝপথে থেমে যায়।
নজরুলের জীবনীচিত্র নির্মাণে বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি। লেটো দলের জীবন, সৈনিক পরিচয়, কারাবরণ, সাহিত্য-সংগ্রাম, প্রেম, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং শেষ জীবনের দীর্ঘ নীরবতা—সবকিছু দুই-তিন ঘণ্টার সিনেমায় ধারণ করা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন বড় বাজেট ও উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতা। দ্বিতীয়ত, নজরুলের জীবন নিয়ে নানা মতভেদ ও বিতর্ক রয়েছে, যা নির্মাতাদের ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করে। তৃতীয়ত, নজরুলের চরিত্রে অভিনয় করার মতো উপযুক্ত শিল্পীর সংকটও একটি বড় বাধা।
তবে এই সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উত্তরণের পথ রয়েছে। প্রথমত, প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক শক্তিশালী চিত্রনাট্য। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নজরুলের জীবনীচিত্রকে একটি সাংস্কৃতিক দায় হিসেবে দেখতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ নির্মাতাকে যুক্ত করা যেতে পারে। আধুনিক ভিএফএক্স ও গ্রাফিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৎকালীন কলকাতা ও ঢাকার দৃশ্য পুনর্নির্মাণ সম্ভব। একক চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সিরিজ আকারেও নজরুলের জীবনের বিভিন্ন পর্ব তুলে ধরা যেতে পারে।
নজরুল কেবল একজন কবি নন, তিনি আমাদের চেতনার প্রতীক। তাঁর জীবনীচিত্র নির্মাণ কেবল বিনোদনের প্রয়াস নয়, এটি ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্ব। বড় পর্দায় নজরুলকে তুলে ধরতে পারলে তা হবে বাংলা সংস্কৃতির জন্য এক অমূল্য দলিল। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে আমরা রুপালি পর্দায় সেই তেজস্বী নজরুলকে দেখতে পাব, যাঁর কণ্ঠ আমাদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আবারও দাঁড়াতে শেখাবে।


















