ঢাকা ১১:৪৯ , Mon, ০৭ Sep ২০২৬

আমেরিকা বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐতিহাসিক উৎসব ফোবানা, জৌলুস হারিয়ে এখন চার ‘টুকরো’

আনিসুর বুলবুল
  • প্রকাশঃ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৪
  • / 4
একই সময়ে চার শহরে পৃথক ফোবানা সম্মেলন নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও হতাশা ছবি: প্রজন্ম কথা

ফ্লোরিডা, ৬ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – সময় গড়িয়েছে, উত্তর আমেরিকায় বেড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা। কমিউনিটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা আঞ্চলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। লক্ষ্য ও কার্যক্রমে ভিন্নতা থাকলেও এসব সংগঠনের মূল আকাঙ্ক্ষা এক জায়গায় এসে মেলে, ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া।

চার দশক আগে সেই ঐক্যের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা, ফোবানা। বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করা, প্রবাসীদের সামাজিক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটিকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসাই ছিল সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু চার দশকের দ্বারপ্রান্তে এসে সেই ঐক্যের দর্শনই প্রশ্নের মুখে। লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চার শহরে একই সময়ে চারটি পৃথক ফোবানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো ও টরন্টোয় আয়োজিত এসব সম্মেলনের প্রায় প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের আয়োজনকে ‘৪০তম ফোবানা সম্মেলন’ হিসেবে প্রচার করেছে।

একই নাম, একই সময়, চারটি আয়োজন। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিস্ময়ের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। প্রশ্ন উঠেছে, চারটির মধ্যে কোনটি ফোবানার মূল আয়োজন?

চার শহরে চার আয়োজন

৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর লেবার ডে উইকেন্ডে চার শহরে একযোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানার ৪০তম আয়োজনকে ঘিরে পৃথক সম্মেলন। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সাল সিটির হিলটন হোটেলে আয়োজিত একটি সম্মেলনের আয়োজক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া। আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ড. জয়নুল আবেদিন ছিলেন সম্মেলনের আহ্বায়ক।

নিউইয়র্কের অ্যাস্টোরিয়ায় ইভানজেলিক্যাল ক্রিশ্চিয়ান চার্চ মিলনায়তনে আয়োজিত আরেক সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘চেতনায় ৭১ হৃদয়ে বাংলাদেশ’। এনআরবি অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে এতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা, অভিবাসনবিষয়ক সেমিনার, নারী ক্ষমতায়ন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ফ্লোরিডার কিসিমি এলাকার হলিডে ইন রিসোর্টে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে আরেকটি সম্মেলন। আয়োজকদের প্রকাশিত কর্মসূচিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত এবং সামাজিক ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনের কথা ছিল।

কানাডার টরন্টোর ডন ভ্যালি হোটেল অ্যান্ড সুইটসে অনুষ্ঠিত হয়েছে চতুর্থ আয়োজন। গিয়াস আহমেদ, শাহ নেওয়াজ, আবু যুবায়ের দারা ও ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছিল।

অর্থাৎ, চার দশকের মাইলফলক উদ্‌যাপনের সময় ফোবানা একক কোনো সম্মেলনের পরিবর্তে চারটি পৃথক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। এই বিভক্তিই এখন সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিভক্তির পেছনে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব?

সচেতন প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেন, ফোবানা ধীরে ধীরে সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব প্রদর্শনের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। কার আয়োজন বড়, কার মঞ্চে বেশি তারকা, কে বেশি স্পনসর পেলেন কিংবা কোন আয়োজনে কত মানুষ হলো, এমন প্রতিযোগিতা বিভক্তিকে আরও গভীর করছে বলে তাদের মত।

তাদের মতে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার সঙ্গে ব্যক্তিগত অহমিকা ও প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত হয়েছে। এর ফলে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য যে সম্মিলিত শক্তি কাজে লাগার কথা ছিল, তা একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে।

তবে ফোবানার বিভক্তিকে কেবল নেতৃত্বের ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখছেন না কেউ কেউ। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক মতপার্থক্য, নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের নিজস্ব কমিটি ও আয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্বও জড়িত বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন।

ফোবানা সম্মেলনকে ঘিরে আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো বাংলাদেশ থেকে অতিথি আনা এবং ভিসা-সংক্রান্ত সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ।

কিছু প্রবাসীর অভিযোগ, সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে কারও কারও কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়। আমন্ত্রণপত্র, ভিসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগের বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তারা এই প্রবণতাকে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ফোবানার আমন্ত্রণপত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদনে সহায়ক নথি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এ সুযোগকে কেন্দ্র করে একটি আর্থিক লেনদেনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার নামেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অনিয়মের তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট আয়োজকেরা নিজেদের স্বচ্ছ থাকার কথা জানিয়েছেন। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

ফোবানার বিভক্তি নিয়ে প্রবাসীদের একটি অংশের উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটিতে তৈরি হয়েছে বিপুল মেধা, পেশাগত দক্ষতা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক শক্তি। এসব শক্তিকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কাজে লাগানোর সুযোগ ফোবানার মাধ্যমে তৈরি হতে পারত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু নেতৃত্বের কোন্দল ও সাংগঠনিক বিভাজনের কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিতর্কের পাশাপাশি ফোবানার সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চার শহরের আয়োজনেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিবার, বন্ধু, শিল্পী ও কমিউনিটি সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল। কোথাও জনপ্রিয় শিল্পীদের গান, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোথাও ব্যবসা ও সামাজিক আলোচনা, আবার কোথাও ছিল পরিবার নিয়ে মিলিত হওয়ার সুযোগ।

শাড়ি-পাঞ্জাবি, দেশি খাবার, বাংলাদেশের গান, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা এবং সন্তানদের বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখনো ফোবানাকে প্রবাসীদের কাছে আকর্ষণীয় করে রেখেছে। এই সাংস্কৃতিক আবেগের কারণেই বিভক্তির বিষয়টি অনেকের কাছে আরও হতাশাজনক।

ফোবানা কি আবার এক হতে পারবে?

ফোবানার ৪০তম বছরে এসে প্রশ্নটি তাই কোন শহরের সম্মেলনে বেশি দর্শক হলো, কে বেশি তারকা আনল কিংবা কে বেশি স্পনসর পেল, তা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রধান প্রশ্ন, যে সংগঠনের জন্ম হয়েছিল উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের এক ছাতার নিচে আনার প্রত্যয় নিয়ে, সেই সংগঠন কি আবার নেতৃত্বের বিভক্তি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি কার্যকর ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারবে?

১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ফোবানার যাত্রা শুরু হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি, বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা এবং এর প্রচার ও প্রসার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেতুবন্ধ তৈরি করা।

চার দশক পর সেই লক্ষ্যগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন প্রশ্ন। ফোবানা কি তার মূল দর্শনে ফিরবে, নাকি বিভক্ত আয়োজন ও পৃথক নেতৃত্বের পথেই এগিয়ে যাবে? উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এই প্রশ্নের গুরুত্ব চারটি সম্মেলনের দর্শকসংখ্যা কিংবা মঞ্চের জৌলুসের চেয়েও অনেক বেশি।

❤️
👏
🙂
😞

আমেরিকা বাংলাদেশি কমিউনিটির ঐতিহাসিক উৎসব ফোবানা, জৌলুস হারিয়ে এখন চার ‘টুকরো’

প্রকাশঃ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৪

ফ্লোরিডা, ৬ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – সময় গড়িয়েছে, উত্তর আমেরিকায় বেড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা। কমিউনিটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা আঞ্চলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। লক্ষ্য ও কার্যক্রমে ভিন্নতা থাকলেও এসব সংগঠনের মূল আকাঙ্ক্ষা এক জায়গায় এসে মেলে, ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া।

চার দশক আগে সেই ঐক্যের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা, ফোবানা। বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করা, প্রবাসীদের সামাজিক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটিকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসাই ছিল সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু চার দশকের দ্বারপ্রান্তে এসে সেই ঐক্যের দর্শনই প্রশ্নের মুখে। লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চার শহরে একই সময়ে চারটি পৃথক ফোবানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো ও টরন্টোয় আয়োজিত এসব সম্মেলনের প্রায় প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের আয়োজনকে ‘৪০তম ফোবানা সম্মেলন’ হিসেবে প্রচার করেছে।

একই নাম, একই সময়, চারটি আয়োজন। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিস্ময়ের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। প্রশ্ন উঠেছে, চারটির মধ্যে কোনটি ফোবানার মূল আয়োজন?

চার শহরে চার আয়োজন

৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর লেবার ডে উইকেন্ডে চার শহরে একযোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফোবানার ৪০তম আয়োজনকে ঘিরে পৃথক সম্মেলন। লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সাল সিটির হিলটন হোটেলে আয়োজিত একটি সম্মেলনের আয়োজক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া। আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ড. জয়নুল আবেদিন ছিলেন সম্মেলনের আহ্বায়ক।

নিউইয়র্কের অ্যাস্টোরিয়ায় ইভানজেলিক্যাল ক্রিশ্চিয়ান চার্চ মিলনায়তনে আয়োজিত আরেক সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘চেতনায় ৭১ হৃদয়ে বাংলাদেশ’। এনআরবি অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে এতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা, অভিবাসনবিষয়ক সেমিনার, নারী ক্ষমতায়ন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ফ্লোরিডার কিসিমি এলাকার হলিডে ইন রিসোর্টে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে আরেকটি সম্মেলন। আয়োজকদের প্রকাশিত কর্মসূচিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত এবং সামাজিক ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনের কথা ছিল।

কানাডার টরন্টোর ডন ভ্যালি হোটেল অ্যান্ড সুইটসে অনুষ্ঠিত হয়েছে চতুর্থ আয়োজন। গিয়াস আহমেদ, শাহ নেওয়াজ, আবু যুবায়ের দারা ও ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছিল।

অর্থাৎ, চার দশকের মাইলফলক উদ্‌যাপনের সময় ফোবানা একক কোনো সম্মেলনের পরিবর্তে চারটি পৃথক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। এই বিভক্তিই এখন সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিভক্তির পেছনে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব?

সচেতন প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেন, ফোবানা ধীরে ধীরে সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব প্রদর্শনের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। কার আয়োজন বড়, কার মঞ্চে বেশি তারকা, কে বেশি স্পনসর পেলেন কিংবা কোন আয়োজনে কত মানুষ হলো, এমন প্রতিযোগিতা বিভক্তিকে আরও গভীর করছে বলে তাদের মত।

তাদের মতে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার সঙ্গে ব্যক্তিগত অহমিকা ও প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত হয়েছে। এর ফলে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য যে সম্মিলিত শক্তি কাজে লাগার কথা ছিল, তা একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে।

তবে ফোবানার বিভক্তিকে কেবল নেতৃত্বের ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখছেন না কেউ কেউ। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক মতপার্থক্য, নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের নিজস্ব কমিটি ও আয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্বও জড়িত বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন।

ফোবানা সম্মেলনকে ঘিরে আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো বাংলাদেশ থেকে অতিথি আনা এবং ভিসা-সংক্রান্ত সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ।

কিছু প্রবাসীর অভিযোগ, সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে কারও কারও কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়। আমন্ত্রণপত্র, ভিসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগের বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তারা এই প্রবণতাকে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ফোবানার আমন্ত্রণপত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদনে সহায়ক নথি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এ সুযোগকে কেন্দ্র করে একটি আর্থিক লেনদেনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার নামেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অনিয়মের তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট আয়োজকেরা নিজেদের স্বচ্ছ থাকার কথা জানিয়েছেন। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

ফোবানার বিভক্তি নিয়ে প্রবাসীদের একটি অংশের উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটিতে তৈরি হয়েছে বিপুল মেধা, পেশাগত দক্ষতা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক শক্তি। এসব শক্তিকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কাজে লাগানোর সুযোগ ফোবানার মাধ্যমে তৈরি হতে পারত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু নেতৃত্বের কোন্দল ও সাংগঠনিক বিভাজনের কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিতর্কের পাশাপাশি ফোবানার সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চার শহরের আয়োজনেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিবার, বন্ধু, শিল্পী ও কমিউনিটি সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল। কোথাও জনপ্রিয় শিল্পীদের গান, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোথাও ব্যবসা ও সামাজিক আলোচনা, আবার কোথাও ছিল পরিবার নিয়ে মিলিত হওয়ার সুযোগ।

শাড়ি-পাঞ্জাবি, দেশি খাবার, বাংলাদেশের গান, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা এবং সন্তানদের বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখনো ফোবানাকে প্রবাসীদের কাছে আকর্ষণীয় করে রেখেছে। এই সাংস্কৃতিক আবেগের কারণেই বিভক্তির বিষয়টি অনেকের কাছে আরও হতাশাজনক।

ফোবানা কি আবার এক হতে পারবে?

ফোবানার ৪০তম বছরে এসে প্রশ্নটি তাই কোন শহরের সম্মেলনে বেশি দর্শক হলো, কে বেশি তারকা আনল কিংবা কে বেশি স্পনসর পেল, তা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রধান প্রশ্ন, যে সংগঠনের জন্ম হয়েছিল উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের এক ছাতার নিচে আনার প্রত্যয় নিয়ে, সেই সংগঠন কি আবার নেতৃত্বের বিভক্তি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি কার্যকর ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারবে?

১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ফোবানার যাত্রা শুরু হয়। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি, বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা এবং এর প্রচার ও প্রসার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেতুবন্ধ তৈরি করা।

চার দশক পর সেই লক্ষ্যগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন প্রশ্ন। ফোবানা কি তার মূল দর্শনে ফিরবে, নাকি বিভক্ত আয়োজন ও পৃথক নেতৃত্বের পথেই এগিয়ে যাবে? উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এই প্রশ্নের গুরুত্ব চারটি সম্মেলনের দর্শকসংখ্যা কিংবা মঞ্চের জৌলুসের চেয়েও অনেক বেশি।