নবম শ্রেণিতে ফেল করে স্কুলছাড়া, ১৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেকশন-সেই ইমরান আজ নাসায়
- প্রকাশঃ ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২২
- / 3
নরসিংদী, ২ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – নবম শ্রেণিতে পরীক্ষায় ফেল করে স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল আল ইমরানকে। পরে এসএসসি ও এইচএসসিতেও ফলাফল ছিল সাধারণ মানের। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন, সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টাতেও সফল হননি। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য আবেদন করে টানা ১৫টি প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন। সেই ইমরানই এখন নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে মঙ্গলগ্রহের সম্ভাব্য বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করছেন।
নরসিংদীর মনোহরদীর পশ্চিম রামপুরের সন্তান ড. আল ইমরানের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল একাধিক বাধায়। নবম শ্রেণিতে পরীক্ষায় ফেল করার পর তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে চতুর্থ বিষয় বাদে তাঁর জিপিএ ছিল ৩.৫৭ এবং এইচএসসিতে ৪.৪।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি তিনি। বুয়েট, মেডিকেল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পেলেও তাঁর অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে পিছনের দিকে। শেষ পর্যন্ত ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাঁর একাডেমিক ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। অনার্স ও মাস্টার্স দুই পর্যায়েই বিভাগে প্রথম হন তিনি। অনার্সে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩.৬৯ এবং মাস্টার্সে ৩.৯৭।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টাও চালিয়ে যান ইমরান। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে দশবারের বেশি চেষ্টা করেন। আইএসএসবি পরীক্ষায় অংশ নেন দুইবার। দুইবারই তিনি ‘রেড কার্ড’ পান।
পরবর্তী সময়ে মহাকাশ ও গ্রহবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সেখানেও সহজে সুযোগ আসেনি। আইইএলটিএস, জিআরই ও টোফেল পরীক্ষায় দুইবার করে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। টানা ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যাখ্যানের পর অবশেষে অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লানেটারি জিওসায়েন্সে বৃত্তি নিয়ে মাস্টার্স করার সুযোগ পান।

অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একাডেমিক ফলাফল ছিল সর্বোচ্চ। মাস্টার্সে পূর্ণ ৪.০০ সিজিপিএ অর্জন করেন তিনি। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর এই শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরে ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস থেকে ২০২২ সালে স্পেস অ্যান্ড প্লানেটারি সায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পিএইচডির উৎসর্গ অংশে তিনি লেখেন, ‘মাতৃভূমি বাংলাদেশের সম্মানে।’
পিএইচডির শেষ দিকে নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে পোস্টডক্টরাল ফেলোর সুযোগের কথা জানতে পারেন ইমরান। আবেদন করার পর কয়েক ধাপের যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে যোগ দেন।
জেপিএলে ইমরানের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র মঙ্গলগ্রহ। সেখানে প্রাণের সম্ভাব্য বসবাসযোগ্য পরিবেশ অনুসন্ধান নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জেপিএলের গবেষণা বিজ্ঞানী ক্যাথরিন স্ট্যাক মরগান।
শৈশব থেকেই মহাকাশ নিয়ে ইমরানের আগ্রহ ছিল। জোছনাভরা রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদে মানুষ কীভাবে গেল, সেখানে কী রয়েছে এবং মানুষের সেখানে বসবাসের সম্ভাবনা আছে কি না, এসব প্রশ্ন তাঁকে ভাবাত। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহই তাঁর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
নাসায় পৌঁছানোর আগে শিক্ষাজীবনে তাঁকে একাধিকবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্কুল থেকে বহিষ্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থতা, সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টায় প্রত্যাখ্যান, ভাষা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষায় ব্যর্থতা এবং ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যাখ্যানের পরও তিনি উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ধরে রাখেন।
নরসিংদীর মনোহরদীর পশ্চিম রামপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম ও গৃহিণী মাহমুদা খাতুনের সন্তান ইমরান। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হওয়ার জন্য একাধিকবার আবেদন করেছিলেন। তবে সেই চাকরি তাঁর হয়নি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাকে কেন নেওয়া হয়নি, তা জানি না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না হওয়াটা আমার জন্য ভালোই হয়েছে। একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে অনেকগুলো দরজা খুলে যায়।’
ইমরানের গবেষণাকর্মের পাশাপাশি তাঁর লক্ষ্য বাংলাদেশের তরুণদের মহাকাশ গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মহাকাশ ও গ্রহবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এই বিষয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে চান তিনি।
তাঁর শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা দেখায়, প্রাথমিক পর্যায়ের ফলাফল বা কোনো একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথ স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে না। নরসিংদীর একটি স্কুল থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস হয়ে তাঁর যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির গবেষণায়।

















