মা প্রথম মুসলিম নারী পিএইচডিধারী, কেমব্রিজপড়ুয়া দুই মেয়ের একজন ব্যারিস্টার, অন্যজন রাজপরিবারে
- প্রকাশঃ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫
- / 0
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম মুসলিম নারী শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ। তবে তাঁর জীবনের গল্প একটি ঐতিহাসিক ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি ও কূটনীতিতে নিজের সময়ের প্রচলিত সীমা অতিক্রম করা এই নারীর শিক্ষার উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও বহন করেছেন তাঁর দুই মেয়ে। একজন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ে ব্যারিস্টার হয়েছেন, অন্যজন কেমব্রিজের শিক্ষা নিয়ে যুক্ত হয়েছেন জর্ডানের রাজপরিবার ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে।
১৯১৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ পড়াশোনা করেন লরেটো কলেজে। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। সেখানে উর্দু উপন্যাস ও ছোটগল্পের বিকাশ নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘ডেভেলপমেন্ট অব দ্য উর্দু নভেল অ্যান্ড শর্ট স্টোরি’।
শিক্ষাজীবনের এই অর্জনের পরও তাঁর পথ থেমে থাকেনি। সাহিত্যচর্চা, রাজনীতি ও কূটনীতিতেও তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশটির প্রথম গণপরিষদের দুই নারী প্রতিনিধির একজন হন শায়েস্তা। পরে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশ নেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত মরক্কোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
যে সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষা এবং জনজীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত, সেই সময়েই শায়েস্তা নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন একাধিক পরিচয়। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, লেখক, রাজনীতিক ও কূটনীতিক।
শায়েস্তার সেই শিক্ষার উত্তরাধিকার পরবর্তী সময়ে অন্য এক পথে এগিয়ে নেন তাঁর মেয়ে সালমা সোবহান। ইংল্যান্ডে পড়াশোনার পর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্টন কলেজে আইন পড়েন। ১৯৫৯ সালে লিংকনস ইন থেকে বার-এ ডাক পান এবং পাকিস্তানের প্রথম নারী ব্যারিস্টার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
পরে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষকতা করেন সালমা। আইন পেশার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করেন তিনি।
সালমার নিজের কথাতেও মায়ের প্রভাবের গভীরতা পাওয়া যায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি শায়েস্তাকে তাঁর আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। মায়ের কাছ থেকেই মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
শায়েস্তার আরেক মেয়ে প্রিন্সেস সারওয়াত এল হাসানের পথ ছিল ভিন্ন। তিনিও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিন তালালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি জর্ডানের রাজপরিবারের সদস্য হন।
রাজপরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষা, নারী ও পরিবার, সামাজিক কল্যাণ এবং স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন প্রিন্সেস সারওয়াত। ফলে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার উত্তরাধিকার তাঁর জীবনেও ভিন্ন এক পরিসরে বিস্তৃত হয়।
একজন মা, যিনি নিজের সময়ে উচ্চশিক্ষা ও জনজীবনে নারীর জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর এক মেয়ে কেমব্রিজে আইন পড়ে ব্যারিস্টার হয়ে বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অন্য মেয়ে কেমব্রিজের শিক্ষা নিয়ে জর্ডানের রাজপরিবারে গিয়ে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের কাজে যুক্ত হন।
তিনজনের পথ আলাদা। শায়েস্তার পথ বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি ও কূটনীতিতে। সালমা সোবহানের পথ গিয়েছে আইন ও মানবাধিকারের দিকে। আর প্রিন্সেস সারওয়াত এল হাসানের জীবন যুক্ত হয়েছে রাজপরিবারের দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে।
তাই শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহর গল্পকে তাঁর পিএইচডি অর্জনের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আড়ালে থেকে যায়। তাঁর উত্তরাধিকার ছড়িয়ে আছে তাঁর দুই মেয়ের জীবনেও। একজনের হাতে আইন ও মানবাধিকার, অন্যজনের জীবনে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন।
তিন নারী, তিনটি আলাদা পথ। তাঁদের গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একই শক্তি, শিক্ষা। এক প্রজন্মে যে শিক্ষা একজন নারীকে নিজের সময়ের সীমা অতিক্রম করার শক্তি দিয়েছিল, পরবর্তী প্রজন্মে সেই শিক্ষাই দুই মেয়ের জীবনকে নিয়ে গেছে দুই ভিন্ন জগতে।
























