বাজারে ১৫ থেকে ২০ জাতের খেজুর পাওয়া যায়। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে খেজুর আমদানির উৎসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় প্রায় পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর থাকলেও বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খেজুর আমদানি হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সারা বছর খেজুর খাওয়ার প্রবণতা এবং বাজারে বৈচিত্র্য আনার কারণে আমদানির উৎস ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫–০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে খেজুর আমদানি করত। সে সময় মোট আমদানির ৭৩ শতাংশ আসত ইরান থেকে এবং প্রায় ২২ শতাংশ আসত সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। বাকি তিন দেশ থেকে আসত মাত্র ৫ শতাংশ।
তখন খেজুর মূলত রমজান মাসেই বাজারে দেখা যেত এবং বার্ষিক আমদানি ছিল প্রায় ২০–২২ হাজার টন। বর্তমানে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা ও সারা বছর খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির ফলে বছরে খেজুর আমদানি প্রায় ১ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ বিশ্বের ২৩টি দেশ থেকে ৯২ হাজার টন খেজুর আমদানি করেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ—ইরাক, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ—থেকে এসেছে মোট আমদানির ৮৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আফ্রিকার তিউনিসিয়া, মিসর ও আলজেরিয়াসহ চারটি দেশ থেকে এসেছে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাকি প্রায় ২ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, চীন ও জাপানসহ আরও ১৩টি দেশ থেকে। বর্তমানে বাজারে ১৫ থেকে ২০ জাতের খেজুর পাওয়া যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতটুকু আসে
খেজুর আমদানির তুলনামূলক নতুন উৎসগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। যদিও পরিমাণ তুলনামূলক কম, তবু উৎপাদনে দেশটি বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৩৭টি দেশে প্রায় ১ কোটি টন খেজুর উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ১৮তম; দেশটিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার টন।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম খেজুর আমদানি হয় ২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর। ওই দিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৩১৪ কেজির একটি চালান দেশে আসে। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে পাঁচটি চালানে মোট ৮৪৪ কেজি খেজুর আমদানি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে আমদানির পরিমাণ বাড়তে থাকে।
চলতি রোজার আগে গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৪৭ হাজার কেজি খেজুর আমদানি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৯ হাজার ডলার; পরিবহন ও শুল্কসহ মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। প্রতি কেজিতে প্রায় ১৯০ টাকা শুল্ক–কর দিতে হয়েছে আমদানিকারকদের। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মূলত ক্যালিফোর্নিয়ার ‘মেডজুল’ জাতের খেজুর আসে। গত এক দশকে দেশটি থেকে মোট প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার কেজি খেজুর আমদানি হয়েছে।
খাতুনগঞ্জের খেজুর আমদানিকারক মিনহাজ এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার রাইসুল ইসলাম জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে মূলত বড় আকারের মেডজুল খেজুর আসে, যার আলাদা বাজার রয়েছে এবং দাম তুলনামূলক বেশি।
মার্কিন খেজুরের বাজারে বাংলাদেশ
আগে যুক্তরাষ্ট্রের খেজুর রপ্তানির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। তবে আমদানি বাড়তে থাকায় চিত্র বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের খেজুর রপ্তানির গন্তব্য তালিকায় বাংলাদেশ ছিল ২৮তম স্থানে। ২০২৫ সালে তা এগিয়ে ১৯তম স্থানে পৌঁছেছে।
এফএওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে খেজুর রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দশম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র খেজুর রপ্তানি করে আয় করেছে ১২ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এসেছে প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ডলার বা প্রায় ২ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, খেজুরের বাজারে এখনো মধ্যপ্রাচ্যের আধিপত্য থাকলেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বৈশ্বিক উৎসে ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র সেই নতুন উৎসগুলোর একটি, যা ভবিষ্যতে আমদানির পরিমাণ আরও বাড়াতে পারে।