ঢাকা ০৬:৫৩ , Sun, ২৭ Sep ২০২৬

হাসপাতালের বেড থেকে তিন বই লিখেছেন ওয়াজিহা, অসুস্থতাকে পেছনে ফেলে স্বপ্ন জয়ের গল্প এবার প্রকাশ পেল সিঙ্গাপুরে

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০০
  • / 3
অসুস্থতার চিকিৎসার মধ্যেই লেখালেখি শুরু করে তিনটি বই লিখেছে ওয়াজিহা। ছবি: প্রজন্ম কথা

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ওষুধের গন্ধ আর চিকিৎসার নানা যন্ত্রের শব্দের মধ্যেই কেটেছে ওয়াজিহার শৈশবের কঠিন সময়। প্যানক্রিয়াটাইটিস ও লিউকেমিয়ার মতো গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু চিকিৎসার দীর্ঘ সময়ও তার কল্পনা ও লেখার আগ্রহকে থামাতে পারেনি।

বই পড়তে ভালোবাসত ওয়াজিহা। হাসপাতালে থাকাকালে তার এই আগ্রহের কথা জানতেন চিকিৎসকরা। তাঁরা তাকে বিভিন্ন সময় বই উপহার দিতেন। সেই বইগুলো চিকিৎসার ব্যস্ততা ও কঠিন সময়ের মধ্যে ওয়াজিহাকে কিছুটা স্বস্তির জগৎ তৈরি করে দিত। এক পর্যায়ে তার থেরাপিস্ট তাকে নিজের গল্প লেখার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ থেকেই ওয়াজিহার লেখালেখির শুরু।

ওয়াজিহার প্রথম গল্পের নাম ‘দ্য ব্রেভ গার্ল টিনা’। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র টিনা, যে গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও ভয়কে জয় করার চেষ্টা করে। টিনার একটি ডায়েরি আছে। সেখানে সে প্রতিদিন পাহাড়ের ছবি আঁকে। ধীরে ধীরে সেই পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। টিনার বিশ্বাস, একদিন সে ঠিকই পাহাড়ের ওপরে পৌঁছাবে।

গল্পের এই পাহাড়, টিনার স্বপ্ন এবং তার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আসলে ওয়াজিহার নিজের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেও সে নিজের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।

হাসপাতালে থাকার সময় ওয়াজিহার পছন্দের একটি কার্টুন ছিল ‘অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস’। সেই পছন্দ থেকেই পরে সে লিখে ফেলে ‘দ্য ফ্রেন্ডলি ক্যাট অগি’। এই গল্পে একাকী একটি বিড়াল নতুন বন্ধুর সন্ধানে বের হয়। পথ চলতে গিয়ে সে বুঝতে শেখে, বন্ধুত্ব মানে কেবল একসঙ্গে থাকা নয়। বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহায্য করাও বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এবার ওয়াজিহার গল্পের জগতে অসুস্থতা থেকে বেরিয়ে আসে সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের বিষয়।

চিকিৎসার মাঝেও যখন একটু ভালো লাগত, তখন ওয়াজিহার কল্পনায় আসত নতুন নতুন অভিযানের গল্প। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় তার তৃতীয় বই ‘দ্য বুক অব ফ্রেন্ডলি অ্যানিম্যালস’। বইটিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর গল্প। তারা একে অন্যকে বিপদে সাহায্য করে, পাশে দাঁড়ায় এবং একসঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে ওয়াজিহা ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও সাহসের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেছে।

এভাবে হাসপাতালের সময় কাটানোর জন্য শুরু হওয়া লেখালেখি ধীরে ধীরে তিনটি বইয়ে রূপ নেয়।

ওয়াজিহার বইগুলোকে প্রকাশযোগ্য করে তুলতে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক, নার্স ও থেরাপিস্টরা তাকে সহায়তা করেন। বইগুলো রঙিন ও আকর্ষণীয় করে তুলতেও তাঁরা সহযোগিতা করেন। পরে এসব বই নিয়ে সিঙ্গাপুরে একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেখানে ওয়াজিহার লেখা তিনটি বই আলাদা তিনটি বার্তা সামনে আনে।

প্রথম বইটি অসুস্থতার মধ্যেও সাহস ধরে রাখার গল্প। দ্বিতীয়টি বন্ধুত্বের মূল্য বোঝায়। তৃতীয় বইয়ে গুরুত্ব পেয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মমতা। প্রায় এক বছর পর সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসেছে ওয়াজিহা। তবে তার এই যাত্রা কেবল দীর্ঘ চিকিৎসার সময় পার করে দেশে ফেরার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের বেডে বসে যে কল্পনার জগৎ তৈরি হয়েছিল, সেটিই একসময় তিনটি বইয়ের রূপ পেয়েছে।

ওয়াজিহার গল্পের আরেকটি দিক হলো, একটি শিশুর স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে আশপাশের মানুষের ছোট ছোট সহযোগিতাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার থেরাপিস্টের একটি পরামর্শই লেখালেখির দরজা খুলে দিয়েছিল। চিকিৎসক, নার্স ও থেরাপিস্টদের সহযোগিতা সেই লেখাকে বইয়ের রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছে।

অসুস্থতার দীর্ঘ সময় পার করা অনেক শিশুর কাছেই স্বাভাবিক জীবন, খেলাধুলা, পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন অনেক দূরের বিষয় হয়ে যেতে পারে। ওয়াজিহার গল্প সেখানে একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা সামনে আনে। কঠিন সময়ের মধ্যেও একটি শিশু তার কল্পনাকে আঁকড়ে ধরে নিজের জন্য একটি নতুন জগৎ তৈরি করতে পারে।

ওয়াজিহার তিনটি বইয়ের চরিত্রগুলো তাই কেবল গল্পের চরিত্র নয়। তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা সাহস, বন্ধুত্ব ও একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার ভাবনাগুলোও সেখানে জায়গা পেয়েছে।

হাসপাতালের বেড থেকে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট লেখার যাত্রা শেষ পর্যন্ত বইয়ের পাতায় পৌঁছেছে। আর সেই পাতাগুলোতে ওয়াজিহা রেখে গেছে একটি সহজ বার্তা, কঠিন সময়ের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নকে ধরে রাখার চেষ্টা থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

❤️
👏
🙂
😞

হাসপাতালের বেড থেকে তিন বই লিখেছেন ওয়াজিহা, অসুস্থতাকে পেছনে ফেলে স্বপ্ন জয়ের গল্প এবার প্রকাশ পেল সিঙ্গাপুরে

প্রকাশঃ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০০

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ওষুধের গন্ধ আর চিকিৎসার নানা যন্ত্রের শব্দের মধ্যেই কেটেছে ওয়াজিহার শৈশবের কঠিন সময়। প্যানক্রিয়াটাইটিস ও লিউকেমিয়ার মতো গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু চিকিৎসার দীর্ঘ সময়ও তার কল্পনা ও লেখার আগ্রহকে থামাতে পারেনি।

বই পড়তে ভালোবাসত ওয়াজিহা। হাসপাতালে থাকাকালে তার এই আগ্রহের কথা জানতেন চিকিৎসকরা। তাঁরা তাকে বিভিন্ন সময় বই উপহার দিতেন। সেই বইগুলো চিকিৎসার ব্যস্ততা ও কঠিন সময়ের মধ্যে ওয়াজিহাকে কিছুটা স্বস্তির জগৎ তৈরি করে দিত। এক পর্যায়ে তার থেরাপিস্ট তাকে নিজের গল্প লেখার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ থেকেই ওয়াজিহার লেখালেখির শুরু।

ওয়াজিহার প্রথম গল্পের নাম ‘দ্য ব্রেভ গার্ল টিনা’। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র টিনা, যে গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও ভয়কে জয় করার চেষ্টা করে। টিনার একটি ডায়েরি আছে। সেখানে সে প্রতিদিন পাহাড়ের ছবি আঁকে। ধীরে ধীরে সেই পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। টিনার বিশ্বাস, একদিন সে ঠিকই পাহাড়ের ওপরে পৌঁছাবে।

গল্পের এই পাহাড়, টিনার স্বপ্ন এবং তার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আসলে ওয়াজিহার নিজের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেও সে নিজের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।

হাসপাতালে থাকার সময় ওয়াজিহার পছন্দের একটি কার্টুন ছিল ‘অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস’। সেই পছন্দ থেকেই পরে সে লিখে ফেলে ‘দ্য ফ্রেন্ডলি ক্যাট অগি’। এই গল্পে একাকী একটি বিড়াল নতুন বন্ধুর সন্ধানে বের হয়। পথ চলতে গিয়ে সে বুঝতে শেখে, বন্ধুত্ব মানে কেবল একসঙ্গে থাকা নয়। বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহায্য করাও বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এবার ওয়াজিহার গল্পের জগতে অসুস্থতা থেকে বেরিয়ে আসে সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের বিষয়।

চিকিৎসার মাঝেও যখন একটু ভালো লাগত, তখন ওয়াজিহার কল্পনায় আসত নতুন নতুন অভিযানের গল্প। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় তার তৃতীয় বই ‘দ্য বুক অব ফ্রেন্ডলি অ্যানিম্যালস’। বইটিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর গল্প। তারা একে অন্যকে বিপদে সাহায্য করে, পাশে দাঁড়ায় এবং একসঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে ওয়াজিহা ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও সাহসের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেছে।

এভাবে হাসপাতালের সময় কাটানোর জন্য শুরু হওয়া লেখালেখি ধীরে ধীরে তিনটি বইয়ে রূপ নেয়।

ওয়াজিহার বইগুলোকে প্রকাশযোগ্য করে তুলতে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক, নার্স ও থেরাপিস্টরা তাকে সহায়তা করেন। বইগুলো রঙিন ও আকর্ষণীয় করে তুলতেও তাঁরা সহযোগিতা করেন। পরে এসব বই নিয়ে সিঙ্গাপুরে একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেখানে ওয়াজিহার লেখা তিনটি বই আলাদা তিনটি বার্তা সামনে আনে।

প্রথম বইটি অসুস্থতার মধ্যেও সাহস ধরে রাখার গল্প। দ্বিতীয়টি বন্ধুত্বের মূল্য বোঝায়। তৃতীয় বইয়ে গুরুত্ব পেয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মমতা। প্রায় এক বছর পর সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসেছে ওয়াজিহা। তবে তার এই যাত্রা কেবল দীর্ঘ চিকিৎসার সময় পার করে দেশে ফেরার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের বেডে বসে যে কল্পনার জগৎ তৈরি হয়েছিল, সেটিই একসময় তিনটি বইয়ের রূপ পেয়েছে।

ওয়াজিহার গল্পের আরেকটি দিক হলো, একটি শিশুর স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে আশপাশের মানুষের ছোট ছোট সহযোগিতাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার থেরাপিস্টের একটি পরামর্শই লেখালেখির দরজা খুলে দিয়েছিল। চিকিৎসক, নার্স ও থেরাপিস্টদের সহযোগিতা সেই লেখাকে বইয়ের রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছে।

অসুস্থতার দীর্ঘ সময় পার করা অনেক শিশুর কাছেই স্বাভাবিক জীবন, খেলাধুলা, পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন অনেক দূরের বিষয় হয়ে যেতে পারে। ওয়াজিহার গল্প সেখানে একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা সামনে আনে। কঠিন সময়ের মধ্যেও একটি শিশু তার কল্পনাকে আঁকড়ে ধরে নিজের জন্য একটি নতুন জগৎ তৈরি করতে পারে।

ওয়াজিহার তিনটি বইয়ের চরিত্রগুলো তাই কেবল গল্পের চরিত্র নয়। তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা সাহস, বন্ধুত্ব ও একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার ভাবনাগুলোও সেখানে জায়গা পেয়েছে।

হাসপাতালের বেড থেকে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট লেখার যাত্রা শেষ পর্যন্ত বইয়ের পাতায় পৌঁছেছে। আর সেই পাতাগুলোতে ওয়াজিহা রেখে গেছে একটি সহজ বার্তা, কঠিন সময়ের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নকে ধরে রাখার চেষ্টা থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়।