পুরান ঢাকার এক টুকরো জুড়ে ছিল টমির রাজত্ব, তার মৃত্যুতে কাঁদল পুরো মহল্লা
- প্রকাশঃ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৪৫
- / 7
ঢাকা, ৬ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – পুরান ঢাকার লালবাগের সরু গলি, দোকান আর ঘরবাড়ির মাঝেই কেটে গেছে টমির প্রায় পুরো জীবন। কারও ঘরের পোষা কুকুর ছিল না সে, তবু এক দশকে এলাকার মানুষের সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল যে তার মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পুরো মহল্লায়।
লালবাগের একটি সরু গলির দেয়ালে টমির ছবি দিয়ে লাগানো হয়েছিল শোকবার্তার পোস্টার। বাদামি-সাদা রঙের কুকুরটির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন রেবেকা। তিনি নিজের বাড়িতে বিড়াল পোষেন, টমি তার কুকুর ছিল না। তবে বছরের পর বছর রাস্তায় চলাচলের সময় টমিকে দেখেছেন তিনি। এই এলাকার অনেক মানুষের মতো তিনিও তাকে চিনতেন।
টমি মারা যায় বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে। একটি টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা দেখা দিলে তাকে নেওয়া হয়েছিল পশু চিকিৎসাকেন্দ্রে। সেখানেই ১০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
টমিকে ছোটবেলা থেকেই দেখাশোনা করতেন স্থানীয় দোকানি নিজাম উদ্দিন। মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনিই তার মরদেহ নিয়ে আসেন। টমিকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার কাপড়ে জড়িয়ে দেন, শরীরে আতর লাগান। পরে একটি ভ্যানে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকি ফিল্ডে। সেখানেই দাফন করা হয় টমিকে।
এরপরই লালবাগের দেয়ালে দেয়ালে উঠতে থাকে তার ছবি ও স্মৃতির পোস্টার।
অন্য কোনো এলাকায় একটি পথকুকুরের মৃত্যু হয়তো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আনত না। লালবাগে ঘটনাটি ছিল ভিন্ন। টমির ছবির সামনে মানুষ থামছিল, তার কথা বলছিল, মনে করছিল তার সঙ্গে কাটানো নানা মুহূর্ত।
পুরান ঢাকার জীবনযাত্রায় ঘর আর রাস্তার মধ্যে দূরত্ব খুব কম। সরু গলির দুই পাশে ঘনবসতিপূর্ণ বাড়ি, নিচে দোকান, ওপরে জানালা ও বারান্দা। কে কখন দোকান খুলছে, কার সন্তান কখন নিচে নামছে, কে কোথায় বসে চা খাচ্ছে, এসবই যেন সবার জানা। টমিও এই জীবনযাত্রারই অংশ হয়ে উঠেছিল।
নিজামের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, এলাকার সব কুকুরের প্রতিই মানুষের মায়া রয়েছে। তবে টমির সঙ্গে সবার সম্পর্ক ছিল আলাদা।
নিজামের ভাষায়, “সে এত বছর ধরে সবার সঙ্গে একটা বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছিল।”
প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে টমি নিজামেরই ছিল। ছোটবেলায় তাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন নিজাম এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেখাশোনা করেছেন। কিন্তু টমি কখনো একটি ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দিনের বড় একটি সময় কাটিয়েছে দোকানপাট আর মানুষের ভিড়ের মধ্যেই। ধীরে ধীরে এলাকার মানুষও তাকে নিজেদের একজন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।
উপরের তলার বারান্দা থেকে শিশুরা রাস্তায় নিজামকে দেখলেই ডাকত। তাদের প্রশ্ন থাকত একটাই, টমি কেমন আছে?
এলাকার মানুষ টমির চলাফেরার অভ্যাসও জানত। কোন দোকানের সামনে সে বসতে পছন্দ করে, কোথায় যায়, কোন গলিতে ঘোরে, এসব ছিল অনেকেরই পরিচিত। কয়েকজন চা খেতে বা গল্প করতে এক জায়গায় জড়ো হলেই টমি প্রায়ই সেখানে এসে বসত। কারও কাছ থেকে কিছু চাইত না। চুপচাপ মানুষের পাশে থাকত।
স্থানীয় নাপিত শাহজাদা তার দোকানে টমির নিয়মিত আসার কথা মনে করেন। কাজ চলার সময়ও টমি দোকানের ভেতরে ঢুকে কোনো এক কোণে বসে থাকত। নাপিত, ক্রেতা, কর্মচারীদের সঙ্গে তার উপস্থিতিও যেন স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিছুক্ষণ পর নিজের মতো করে উঠে চলে যেত।
এলাকার বাসিন্দারা টমির চলাফেরার মধ্যেও এক ধরনের আত্মবিশ্বাস দেখতেন। স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী মজা করে তার হাঁটাকে রাজকীয় চলাফেরার সঙ্গে তুলনা করতেন। ধীর, স্থির ভঙ্গিতে এমনভাবে হাঁটত, যেন পুরো গলিটাই তার পরিচিত এলাকা।
অন্য কুকুরের ক্ষেত্রে অবশ্য টমির স্বভাব ছিল আলাদা। নিজের এলাকায় অপরিচিত কুকুর ঢুকলে সে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠত। নিজামের স্মৃতিতে, ধৈর্যশীল হলেও প্রয়োজন হলে বেশ হিংস্র হয়ে উঠতে পারত টমি। দুই-তিনটি কুকুর একসঙ্গে ঘিরে ধরলেও সহজে পিছিয়ে আসত না।
মানুষের সঙ্গে তার আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
লালবাগের পরিচিত মানুষদের কাছে টমি ছিল শান্ত ও নির্ভরযোগ্য। বছরের পর বছর সে শিখে নিয়েছিল গলির নিজস্ব ছন্দ। সকালে দোকান খোলা, শিশুদের যাতায়াত, নাপিতের দোকানে ক্রেতাদের আসা, রাস্তার মোড়ে মানুষের আড্ডা, সবকিছুর সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। আর এলাকার মানুষও জানত টমির নিজস্ব সময়সূচি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টমির চলাফেরার পরিসরও ছোট হয়ে আসে। নিজামের বাড়িতে যেতে চারতলা সিঁড়ি উঠতে হতো। একসময় সেটি তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। নিজাম চাইলে তাকে নিচে আটকে রাখতে পারতেন। তা করেননি।
নিজাম বলেন, “তার স্বাধীনতার কথা ভেবে আমি তাকে কখনো আটকে রাখিনি। আমি চেয়েছি, সে সবার মধ্যে থেকেই জীবন কাটাক।”
তাই টমির শেষ জীবনও কেটেছে সেই জায়গাতেই, যেখানে সে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। দোকানপাট, গলি আর পরিচিত মানুষদের মাঝখানে।
টমির খোঁজ নেওয়াও তখন এলাকার মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। অসুস্থ হওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজামের কাছে মানুষ থামত, টমির শারীরিক অবস্থার খবর জানতে চাইত। ওপরের বারান্দা থেকে শিশুরা নিচে তাকিয়ে ডাকত, জানতে চাইত টমি কেমন আছে।
খাবার খাওয়া কমিয়ে দিলে এলাকার মানুষ তাকে আদর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করত। শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় পরিবারগুলো যে আদুরে বাংলা শব্দ ব্যবহার করে, টমির ক্ষেত্রেও সেভাবেই তাকে ডাকত তারা, ‘বাবা’, ‘সোনা’।
টমিকে ঘিরে এই মমত্ববোধ পৌঁছে যায় স্থানীয় মসজিদেও। কাছের মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, প্রাণীর প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা ইসলামের শিক্ষার অংশ। পথপ্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ দেখানোকে তিনি ধর্মীয় দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত করেন।
ততদিনে টমির শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে উঠেছিল। টিউমার অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর সে বেঁচে ফিরলেও পরে জটিলতা দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে পশু চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে নিজামকে জানানো হয়, টমি আর নেই।
তারপর যা হয়েছে, সেটিও লালবাগের জন্য অস্বাভাবিক এক দৃশ্য।
দাফনের পর টমির ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপানো হয়। গলির দেয়ালে সেগুলো লাগানো হয়। এরপর দিনের পর দিন মানুষ সেই পোস্টারের সামনে থামতে থাকে।
কেউ মনে করিয়ে দেয় টমির কোনো পুরোনো কাণ্ডের কথা। অন্য কেউ যোগ করে আরেকটি স্মৃতি। কোনো গল্পে হাসি আসে, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই কথোপকথন ফিরে যায় টমির মৃত্যুর প্রসঙ্গে।
লালবাগের জীবন অবশ্য থেমে থাকেনি। দোকান খুলেছে, নাপিতের দোকানে কাজ চলেছে, ওপরের তলা থেকে শিশুরা নিচে তাকিয়েছে, রাস্তার মোড়ে মানুষ চা খেতে ও গল্প করতে জড়ো হয়েছে।
তবে পরিচিত সেই দৃশ্যের মধ্যে একজন আর নেই।
টমি।




























