নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলস: দেড় শতাব্দীতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের পথচলার গল্প
- প্রকাশঃ ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯:০৯
- / 7
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের ব্যস্ত সড়ক, রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, মসজিদ, মন্দির, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সময়ের সঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে বাংলাদেশি আমেরিকানদের উপস্থিতি। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন নাগরিকদের বাংলাদেশি আমেরিকান বলা হয়। ১৯৭০ সালের আগ থেকেই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। পরে নিউইয়র্ক, প্যাটারসন, নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলস, ওয়াশিংটন ডিসি, বোস্টন, আটলান্টা, সান ফ্রান্সিসকো, ডেট্রয়েট, শিকাগো, ফ্লোরিডা, ডালাস, হিউস্টন, নর্থ ক্যারোলাইনা এবং হ্যামট্র্যামক, মিশিগানসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশি আমেরিকানদের সংখ্যা ভবিষ্যৎ বছরগুলোতে আরও দ্রুত বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ার বিষয়টি সম্পর্কিত। তবে এই অভিবাসনের ইতিহাস সাম্প্রতিক নয়। ১৮৮০ সাল থেকেই বাঙালিদের অভিবাসী হিসেবে আমেরিকায় যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সদ্য স্বাধীন দেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের যাত্রা অব্যাহত থাকে।
১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর শহরগুলোতে ১৫৪ জন অভিবাসী পাড়ি জমান। তাদের বেশিরভাগই কর্মী হিসেবে কলকাতা শহর থেকে বিভিন্ন জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে যান।
১৯৭০ থেকে ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের সংখ্যা ধীরে হলেও পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে। বার্ষিকভাবে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হন। বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিবাসী নিউইয়র্ক, প্যাটারসন, ওয়াশিংটন ডিসি, লস অ্যাঞ্জেলস, বোস্টন, শিকাগো ও ডেট্রয়েটের মতো শহরাঞ্চলে স্থায়ী হন। ১৯৮০ সালের আগে আনুমানিক ১৫ হাজার বাংলাদেশি নিউইয়র্কে বসবাস করতেন।

১৯৭০ সালের পর কিছু বাংলাদেশি আমেরিকান অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে বসবাস এবং সাশ্রয়ী জীবনযাপনের সুযোগের জন্য নিউইয়র্ক থেকে ডেট্রয়েটে চলে যান। তবে তাদের বেশিরভাগই পরে ডেট্রয়েট থেকে নিউইয়র্ক ও প্যাটারসনে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে ৫০০ সদস্য নিয়ে ‘লস অ্যাঞ্জেলস বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে ৫০০ সদস্য নিয়ে ‘টেক্সাস বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হয়।

ডালাসে ১৯৯৭ সালে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি ছিলেন। এই সংখ্যা বৈশাখী মেলার আয়োজনের জন্য যথেষ্ট ছিল এবং তারা সফলভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান শহর, যেমন নিউইয়র্ক, নিউ জার্সির প্যাটারসন, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলসে বাংলাদেশিদের উদ্যোগে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে বেশিরভাগ বাংলাদেশি সেখানে ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করতেন এবং বাকিরা বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তার
বেশিরভাগ বৈধ বাঙালি অভিবাসী নিউইয়র্কেই বসবাস করেন। নিউইয়র্কের কুইন্স বরোর জ্যাকসন হাইটস এলাকায় বাংলাদেশি কমিউনিটির সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্যাকসন হাইটসের ৭৪ নম্বর সড়কে বাংলাদেশিদের অনেক মুদি ও কাপড়ের দোকান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্যাকসন হাইটসের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনের মুক্ত চত্বর হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। শাহবাগ যেমন বিভিন্ন আন্দোলনের অন্যতম ক্ষেত্র, তেমনি জ্যাকসন হাইটসের ওই এলাকাতেও বিভিন্ন আন্দোলন হয়েছে।
জ্যাকসন হাইটসের পাশের উডসাইড ও এলমহার্স্ট এলাকাও বর্তমানে বাংলাদেশি আমেরিকানদের বসবাসের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
১৯৭০ সাল থেকে হাজারো বাংলাদেশি বৈধভাবে ভিসা বা লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন। তাদের অনেকেই জ্যামাইকায় চলে যান। জ্যামাইকা ও জ্যাকসন হাইটসে স্থানান্তরের হার বাংলাদেশিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ১৬৯ নম্বর সড়ক ও হিলসাইড অ্যাভিনিউর কেন্দ্রস্থল বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট ও মুদি দোকানের জন্য জনপ্রিয়। এখানকার সাগর রেস্টুরেন্ট, দেশি স্বাদ, ঘরোয়া ও কবির বেকারি পুরো নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটিতে জনপ্রিয়।
বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি আমেরিকান জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, হলিস ও ব্রিয়ারউডে বসবাস করেন। নিউইয়র্কের কুইন্স ও ব্রুকলিনেও বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়ছে। ধনবান বাংলাদেশিদের অনেকেই উন্নত জীবনযাপনের জন্য নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে চলে যান। সেখানে অনেক বাংলাদেশি ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানির মালিক। তারা নিজেদের কোম্পানিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের নিয়োগ দেন।
নিউইয়র্কের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান
১৯৭০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের মোট জনসংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯৫৫ জন। পুরো আমেরিকায় এই সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৩৮ জন। নিউইয়র্কে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বসবাস করতেন কুইন্সে, যেখানে তাদের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৬৭ জন। ব্রুকলিনে ছিলেন ১ হাজার ৩১৩ জন।
ম্যানহাটনে বাংলাদেশিরা ৬ নম্বর স্ট্রিটে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করতেন। এখানকার বেশিরভাগ বাংলাদেশি অ্যাস্টোরিয়ায় বসবাস করতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই তথ্যের ক্ষেত্রে যাচাই প্রয়োজন বলে সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
২০০০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২৮ হাজার ২৬৯ জন। এর মধ্যে কুইন্সে বসবাস করতেন ১৮ হাজার ৩১০ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ। ব্রুকলিনে ছিলেন ৬ হাজার ২৪৩ জন বা ২২ শতাংশ, ব্রঙ্কসে ২ হাজার ৪৪২ জন বা ৯ শতাংশ, ম্যানহাটনে ১ হাজার ২০৪ জন বা ৪ শতাংশ এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ৭০ জন বা ০ দশমিক ২ শতাংশ।
১৯৭০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশি জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ৪৭১ শতাংশ। বিদেশে জন্মগ্রহণকারী জনসংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১৫৭ জন, যা ৮৫ শতাংশ। ইংরেজিতে কম দক্ষ মানুষের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮৪০ জন বা ৬০ শতাংশ। মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় ছিল ৩১ হাজার ৫৩৭ ডলার। দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করতেন ৮ হাজার ৩৩৪ জন। দারিদ্র্যসীমার হার ছিল ৩১ শতাংশ।
২০১০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের মোট জনসংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ৬৭৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বসবাস করতেন কুইন্সে, যা মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ। ব্রুকলিনে ছিলেন ১৯ শতাংশ, ব্রঙ্কসে ১৭ শতাংশ, ম্যানহাটনে ৪ শতাংশ এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ০ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী বিদেশে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশিদের হার ছিল ৭৪ শতাংশ। ইংরেজিতে কম দক্ষতার হার ছিল ৫৩ শতাংশ। মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় ছিল ৩৬ হাজার ৭৪১ ডলার এবং দারিদ্র্যসীমার হার ছিল ৩২ শতাংশ।
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারও ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর নতুন আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এর বাইরে ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, ডেট্রয়েট ও লস অ্যাঞ্জেলসেও ছোট বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে।

প্যাটারসনে ‘লিটল বাংলাদেশ’
নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন এলাকার নিউ জার্সির প্যাটারসন বাংলাদেশি আমেরিকানদের অন্যতম বৃহৎ আবাসস্থল। এখানে বাংলাদেশি আমেরিকানদের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার বলে অনুমান করা হয়।
প্যাটারসনের ইউনিয়ন অ্যাভিনিউতে ‘লিটল বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত এলাকায় অনেক বাংলাদেশি মুদি ও কাপড়ের দোকান রয়েছে। প্যাটারসনে সোনালী ব্যাংকের অর্থ হস্তান্তরের একটি সম্পূরক শাখাও রয়েছে। সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
![]()
ইউনিয়ন অ্যাভিনিউতেই রয়েছে ‘মসজিদ আল-ফেরদৌস’ নামের একটি মসজিদ। প্যাটারসনে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধির একটি চিত্র এই মসজিদের উপস্থিতির মধ্যেও দেখা যায়।
মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান ২০১২ সালে প্যাটারসন সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে ২য় ওয়ার্ড থেকে বিজয়ী হন। ২০১৪ সালের ১১ অক্টোবর ওয়েস্ট সাইড পার্কে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ মিনারের একটি প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনে নিহত ছাত্রদের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের অধিকাংশের বয়স ১০ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে, যার ৬৫ শতাংশই পুরুষ। গড়পড়তায় পুরুষদের ৫০ শতাংশ এবং নারীদের ৬০ শতাংশের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা দেখা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশি আমেরিকানরা ডেমোক্রেটিক দলকে ভোট দিতে বেশি আগ্রহী।
আয়, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়
২০১৪ সালের গণশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশি আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় ছিল ১৮ হাজার ২০৭ ডলার। অন্যদিকে আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় ছিল ২৫ হাজার ৮২৫ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় আমেরিকানদের মাথাপিছু আয়ের তুলনায় কম ছিল।
আদমশুমারি ব্যুরো পরিচালিত ২০০০ সালের গণশুমারি অনুযায়ী ৫৭ হাজার ৪১২ জন মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যার মোট ৪০ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের অন্তত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। তুলনামূলকভাবে আমেরিকার জনগণের ক্ষেত্রে এই হার ২৫ শতাংশের কম।
বাংলাদেশি আমেরিকানরা তাদের পূর্বপুরুষদের জাতিগত সংস্কৃতি ধারণ করেন। একই সময়ে তারা আমেরিকান সংস্কৃতিও অনুসরণ করেন। পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতি বিস্মৃত না হয়ে উভয় সংস্কৃতিকে পাশাপাশি ধারণ করার চেষ্টা তাদের জীবনযাত্রায় দেখা যায়।

বাংলাদেশি আমেরিকানরা নিজেদের রন্ধনপ্রণালিও যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছেন। বড় বড় শহরের বাঙালি রেস্টুরেন্টগুলোতে নিয়মিত এসব খাবার রান্না করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এসব রান্না জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি মার্কেট ও স্টেশনারি দোকান রয়েছে। নিউইয়র্ক শহর, প্যাটারসন, নিউ জার্সি এবং লস অ্যাঞ্জেলসের কিছু দোকান বেশ বড়।
পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি আমেরিকানরা তাদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম বাংলায় পরিচালনার চেষ্টা করেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন
বেশিরভাগ বাংলাদেশি আমেরিকান মুসলিম। ধর্মীয় বিধিবিধান ও আচার-আচরণ বাংলাদেশি আমেরিকান পরিবারগুলোর মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। জীবনে চলার পথে অনেকেই কোরআন ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের আদর্শকে নির্দেশিকা হিসেবে অনুসরণ করেন।
ইসলাম ধর্মের একটি শাখা সুন্নি সম্প্রদায়। বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই এই শাখার অন্তর্ভুক্ত। ছোট শহরগুলোতে যেখানে মসজিদ নেই, সেখানকার বাংলাদেশি আমেরিকানরা ইসলাম ধর্মের বড় উৎসবগুলো পালনের জন্য কাছাকাছি মসজিদে যান। অনেক বাংলাদেশি অধ্যুষিত শহর এলাকায় এমন মসজিদও রয়েছে, যেখানে আজান দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
বাংলাদেশি আমেরিকানরা আরব আমেরিকান, ইরানি আমেরিকান, তুর্কি আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান, ইন্দোনেশীয় আমেরিকান, মালয়েশীয় আমেরিকান ও দক্ষিণ এশীয় আমেরিকানসহ অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। বাংলাদেশি আমেরিকানরা ‘মুসলিম স্টুডেন্টস অব আমেরিকা’ নামের সংগঠন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সংগঠনটি আমেরিকার মুসলিম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাজ করে।

যদিও বাংলাদেশি আমেরিকানদের বেশিরভাগ মুসলিম, এই কমিউনিটিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও রয়েছেন। তারা নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উদযাপন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি মুসলিম ও বাংলাদেশি হিন্দুদের মধ্যে শক্ত বন্ধনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সৌহার্দ্যবোধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি হিন্দুদের পরিচালিত বেশ কিছু মন্দির ও ধর্মসভাও রয়েছে। বাংলাদেশি হিন্দুদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং তারা ভারতবর্ষ বিভাজনের পর ভারতে চলে যাওয়া বৃহৎ বাঙালি হিন্দু গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। বাংলাদেশি হিন্দুদের সংখ্যা কম হলেও পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্যান্য অংশের বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের সামাজিক গ্রুপ একটি বড় সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে।
অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়ের মতো যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি আমেরিকানদের মধ্যেও ধর্মহীনতা, নাস্তিক্যবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবতাবাদ এবং বিভিন্ন দর্শনের প্রভাব বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি আমেরিকানদের অবদান
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি আমেরিকানদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, রাজনীতি, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। ফজলে হুসাইন যন্ত্রকৌশলের অধ্যাপক, পদার্থবিদ এবং হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগবেষক। আবুল হুসাম সনো আর্সেনিক ফিল্টারের আবিষ্কারক। আব্দুস সাত্তার খান রসায়নবিদ এবং জেট জ্বালানির উদ্ভাবক। ফজলুর রহমান খান আধুনিক কাঠামোগত প্রকৌশলের পথপ্রদর্শক।
সালমান খান খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা। এটি অলাভজনক শিক্ষা নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। জাওয়েদ করিম ইউটিউবের সহপ্রতিষ্ঠাতা। মোহাম্মদ আতাউল করিম তড়িৎ প্রকৌশলী। সুমাইয়া কাজি সুমাজির প্রতিষ্ঠাতা। বিজনেসউইকের পরিচিতিতে এটি আমেরিকার তরুণ উদ্যোক্তাদের সেরা উঠে আসার ক্ষেত্রে সেরা কর্মস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দিপা মা যোগব্যায়ামের শিক্ষিকা। সেজান মাহমুদ পদকজয়ী ঔপন্যাসিক। শমি পাটোয়ারী ডিজাইনার ও সংগীত ভিডিও পরিচালক। ইকবাল কাদির গ্রামীণফোনের প্রতিষ্ঠাতা।
কামাল কাদির উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশি অনলাইন বিপণন ও অর্থ হস্তান্তরের অনলাইন মাধ্যম সেলবাজার ও বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা। আনিকা রহমান নারী বিষয়ক সংগঠন এমএস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বাদল রয় তবলা বাদক, পারকাশনিস্ট এবং রেকর্ডিং শিল্পী।
রেইহান সালমান আমেরিকান রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলের ভাষ্যকার, ‘দ্য আমেরিকান সিন’ ব্লগের লেখক এবং ‘দ্য আটলান্টিক মান্থলি’র সহযোগী সম্পাদক। শিখে গায়ক। আসিফ আযম সিদ্দিক মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তা এবং ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। মি. ওসমান সিদ্দিক সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।

পলবাসা সিদ্দিক গায়ক। নরসিংহ শীল ওয়েস্টার্ন অরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। সুপ্রিম আন্ডারস্ট্যান্ডিং লেখক, প্রকাশক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং নেশন অব গডস অ্যান্ড আর্থসের স্পষ্টবাদী বক্তা ও সদস্য। মণিকা ইউনুস বাংলাদেশি-রুশ-আমেরিকান অপেরা শিল্পী।
বাংলাদেশি আমেরিকানদের তালিকায় আরও রয়েছেন ড. মুহম্মদ আলি ভুইয়া। তিনি জর্জিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস প্রার্থী, তুসকিজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং উদ্যোক্তা শিল্পের বিশিষ্ট অধ্যাপক ছিলেন। সফি আহমেদ ওয়ার্ল্ড সিরিজ অব পোকারের বিজয়ী।
মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান নিউ জার্সির প্যাটারসনের নগর মন্ত্রী ছিলেন। মাকসুদুল আলম বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক।
জালাল আলমগীর রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক। কালি এস. ব্যানার্জী পরিসংখ্যানবিদ ও অধ্যাপক। রাইস ভুইয়ান তীরন্দাজ। সুবির চৌধুরী লেখক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মি. মাসুম আলি বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের বিশিষ্ট অধ্যাপক। হেনসেন ক্লার্ক যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ছিলেন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালি অভিবাসনের যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা সময়ের সঙ্গে একটি বিস্তৃত বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটিতে রূপ নিয়েছে। নিউইয়র্ক থেকে প্যাটারসন, ডালাস থেকে লস অ্যাঞ্জেলস, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ডেট্রয়েট, বিভিন্ন শহরে গড়ে ওঠা এই কমিউনিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিবাসন, পেশা, শিক্ষা, ব্যবসা, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন পেশায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের অংশগ্রহণও যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও পেশাগত পরিসরে তাদের উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করেছে।




























