আর্জেন্টাইনরা কেন স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে
- প্রকাশঃ ২৭ জুলাই ২০২৬, ২০:০৬
- / 3
বিশ্ব ফুটবলে স্পেন ও আর্জেন্টিনা দুই দেশই নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত। ভাষা একই হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। কয়েক শতাব্দী আগে স্পেনের উপনিবেশ ছিল আর্জেন্টিনা। সেই উপনিবেশিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেশটির রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় স্প্যানিশ ভাষা।
পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগ ছিল ইউরোপীয় সমুদ্র অভিযানের যুগ। নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানে স্পেন ও পর্তুগালের নাবিকেরা সমুদ্রপথে অভিযান চালাতে থাকেন। ১৪৯৪ সালের টরডেসিলাস চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একটি কাল্পনিক সীমারেখা টেনে দক্ষিণ আমেরিকাকে নিজেদের প্রভাববলয়ে ভাগ করে নেয়। এর ফলে বর্তমান ব্রাজিলের অধিকাংশ অঞ্চল পর্তুগালের অধীনে গেলেও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল স্পেনের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের আর্জেন্টিনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
ষোড়শ শতকের শুরুতে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে পৌঁছাতে শুরু করেন। ১৫১৬ সালে হুয়ান দিয়াস দে সোলিস একটি বিশাল নদীমোহনায় প্রবেশ করলেও স্থানীয় আদিবাসীদের হামলায় নিহত হন। পরে সেবাস্তিয়ান ক্যাবট একই এলাকায় এসে স্থানীয়দের কাছ থেকে রুপার অলংকার ও অভ্যন্তরে বিশাল রুপার খনির গল্প শোনেন। সেই গল্প থেকেই নদীটির নাম রাখা হয় রিও দে লা প্লাতা, যার অর্থ ‘রুপার নদী’।

যদিও সেই কথিত রুপার পাহাড় কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবুও লাতিন শব্দ আর্জেন্টাম, যার অর্থ রুপা, সেখান থেকেই পরবর্তীকালে দেশটির নাম হয় আর্জেন্টিনা।
স্প্যানিশদের বসতি স্থাপনের পথ সহজ ছিল না। ১৫৩৬ সালে প্রথম বুয়েনস এইরেস প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় কুয়েরান্দি জনগোষ্ঠী প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। খাদ্যসংকট ও ধারাবাহিক সংঘর্ষের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই স্প্যানিশদের সেই বসতি পরিত্যাগ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ডায়াগুইটা, মাপুচে এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীও দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র, ঘোড়সওয়ার বাহিনী এবং উন্নত সামরিক কৌশলের মাধ্যমে স্প্যানিশরা অঞ্চলটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
যুদ্ধের পাশাপাশি ইউরোপ থেকে আসা সংক্রামক রোগও আদিবাসী সমাজের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। গুটিবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। এসব রোগের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রাকৃতিক প্রতিরোধক্ষমতা ছিল না। যুদ্ধ, রোগ এবং ভূমি দখলের সম্মিলিত প্রভাবে আদিবাসী সমাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৭৭৬ সালে স্পেন ভাইসরয়্যালটি অব দ্য রিও দে লা প্লাতা প্রতিষ্ঠা করে। এরপর বুয়েনস এইরেস দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত হয়। গবাদিপশু, চামড়া ও কৃষিপণ্য ইউরোপে রপ্তানি শুরু হয়। একই সময়ে গড়ে ওঠে বিশাল খামার বা এস্তানসিয়া, বিস্তার লাভ করে ক্যাথলিক ধর্ম এবং স্প্যানিশ ভাষা। ইউরোপীয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে জন্ম নেয় নতুন সামাজিক পরিচয়, মেস্টিজো সমাজ। পাশাপাশি পাম্পাস অঞ্চলে বিকশিত হয় গাউচো সংস্কৃতি, যা আজও আর্জেন্টিনার জাতীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক।
১৮১০ সালের মে বিপ্লব স্প্যানিশ শাসনের অবসানের সূচনা করে। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ১৮১৬ সালের ৯ জুলাই আর্জেন্টিনা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
স্বাধীনতার পর উনিশ ও বিশ শতকের শুরুতে ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক অভিবাসন দেশটির জনসংখ্যা ও সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। বর্তমানে আর্জেন্টিনার অধিকাংশ মানুষ নিজেদের ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে পরিচয় দিলেও আধুনিক জিনগত গবেষণায় দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে আদিবাসী পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারও বিদ্যমান।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে আধুনিক আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশ ভাষা, ইউরোপীয় অভিবাসনের প্রভাব এবং আদিবাসী ঐতিহ্যের সমন্বয়ে দেশটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করেছে। সেই পরিচয়ের প্রতিফলন দেখা যায় ট্যাঙ্গো সংগীত, গাউচো সংস্কৃতি এবং ফুটবলে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেন ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলে সেটি কেবল দুটি ফুটবল দলের লড়াই নয়, ইতিহাসেরও এক প্রতীকী অধ্যায়। একসময় স্পেনের উপনিবেশ থাকা আর্জেন্টিনা আজ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে সাবেক শাসকের বিপক্ষে মাঠে নামে।





























