ঢাকা ১২:০১ , Mon, ০২ Nov ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র
নিউইয়র্ক

জ্যাকসন হাইটস থেকে ব্রঙ্কস, নিউইয়র্কে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন বাংলাদেশি ও মুসলিমরা অভিবাসীরা

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০১
  • / 0
নিউইয়র্কে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ ও স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। ছবি: প্রজন্ম কথা

নিউইয়র্ক, ২ নভেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জাতীয় স্মারক সংরক্ষণে কাজ করছে প্রবাসী সংগঠনগুলো, অন্যদিকে মেয়র জোহরান মামদানির নেতৃত্বে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এই পরিবর্তনের অংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদ সম্মেলন। গত ৩০ অক্টোবর জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন পার্টি সেন্টারে আয়োজিত এ সম্মেলনে সংগঠনটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক শিখা অনির্বাণের নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফনে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিষয় নিয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি জানায়। সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. প্রদীপ রঞ্জন কর লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সাধারণ সম্পাদক মনজুর চৌধুরী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ও সংগঠনের উপদেষ্টা হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন তালুকদার, শওকত আকবর রীতি, খুরশিদ আনোয়ার বাবলুসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।

সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত শিখা অনির্বাণ মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের স্মারক। তাই এর শিখা সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে তারা। প্রয়োজনে রক্ষণাবেক্ষণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তবে সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, জ্বালানি সাশ্রয়ের সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিখাটি আপাতত সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে সংগঠনটির দাবি ও সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফনে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দাফনের আনুষ্ঠানিক নথি কিংবা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের পেছনের কারণ ও ঘটনার সব দিক এখনো স্পষ্ট নয়।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র জ্যাকসন হাইটস। কুইন্সের জ্যামাইকা, উডসাইড, এলমহার্স্ট ও রিচমন্ড হিলের পাশাপাশি ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ও সাউন্ডভিউ এবং ব্রুকলিনের বিভিন্ন এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এসব এলাকায় ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়।

এই সামাজিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অংশগ্রহণ। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া মামদানি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম মেয়র।

মামদানির নির্বাচনী প্রচারে বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিশুদের যত্নের সুযোগ বাড়ানো, অভিবাসীদের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ লাঘবের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। এসব ইস্যু বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসী পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নির্বাচনের সময় দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের অংশগ্রহণও আলোচনায় আসে। প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশি ভোটারদের অংশগ্রহণ প্রায় ৩৮৬ শতাংশ বেড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে ভোটারসংখ্যা, জরিপের পদ্ধতি ও তুলনার ভিত্তি বিবেচনা করা জরুরি।

মামদানি মেয়র হওয়ার পরও বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। গত ২০ অক্টোবর জ্যাকসন হাইটসের ওম শক্তি মন্দিরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আয়োজিত দুর্গাপূজার সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি সমাজে বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের অবদান এবং নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে ২২ অক্টোবর এ খবর প্রকাশিত হয়।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংগঠিত হওয়ার বিষয়টিও নিউইয়র্কে আলোচনায় রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মামদানির নির্বাচনী সাফল্যের পর শহরের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন স্থানীয় নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। ব্রঙ্কসের ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর নেতারাও নাগরিক উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা করছেন। তবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পুলিশি ব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা ও নগর পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন সংগঠনও কাজ করছে। গত ৪ অক্টোবর কুইন্সের উডসাইডে বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাডভোকেসি গ্রুপের আয়োজনে নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করা এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে কমিউনিটির দাবি তুলে ধরার বিষয়ে আলোচনা হয়। সংগঠনটির সভাপতি জয়নাল আবেদিনসহ অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জনসংখ্যা বেশি হলেই রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয় না; নিয়মিত ভোট দেওয়া, সংগঠিত থাকা এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাও জরুরি।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি তাঁদের সামনে রয়েছে আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অভিবাসনসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয়ে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নীতিনির্ধারণে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দাবি তুলে ধরতে কমিউনিটির সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ তুলে ধরতেও সাংস্কৃতিক আয়োজন, আলোচনা সভা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় তাই দুটি বিষয় পাশাপাশি উঠে এসেছে: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয় সংরক্ষণ এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ। জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশনের সংবাদ সম্মেলন প্রথম বিষয়টিকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে মামদানির মেয়র হওয়া এবং দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। এই উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে সংগঠনগুলোর ধারাবাহিকতা, নাগরিক সম্পৃক্ততা এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের অংশগ্রহণের ওপর।

❤️
👏
🙂
😞

জ্যাকসন হাইটস থেকে ব্রঙ্কস, নিউইয়র্কে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হচ্ছেন বাংলাদেশি ও মুসলিমরা অভিবাসীরা

প্রকাশঃ ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০১

নিউইয়র্ক, ২ নভেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জাতীয় স্মারক সংরক্ষণে কাজ করছে প্রবাসী সংগঠনগুলো, অন্যদিকে মেয়র জোহরান মামদানির নেতৃত্বে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এই পরিবর্তনের অংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদ সম্মেলন। গত ৩০ অক্টোবর জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন পার্টি সেন্টারে আয়োজিত এ সম্মেলনে সংগঠনটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক শিখা অনির্বাণের নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফনে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিষয় নিয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি জানায়। সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. প্রদীপ রঞ্জন কর লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সাধারণ সম্পাদক মনজুর চৌধুরী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক ও সংগঠনের উপদেষ্টা হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন তালুকদার, শওকত আকবর রীতি, খুরশিদ আনোয়ার বাবলুসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।

সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত শিখা অনির্বাণ মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের স্মারক। তাই এর শিখা সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে তারা। প্রয়োজনে রক্ষণাবেক্ষণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তবে সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, জ্বালানি সাশ্রয়ের সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিখাটি আপাতত সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে সংগঠনটির দাবি ও সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফনে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দাফনের আনুষ্ঠানিক নথি কিংবা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের পেছনের কারণ ও ঘটনার সব দিক এখনো স্পষ্ট নয়।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র জ্যাকসন হাইটস। কুইন্সের জ্যামাইকা, উডসাইড, এলমহার্স্ট ও রিচমন্ড হিলের পাশাপাশি ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ও সাউন্ডভিউ এবং ব্রুকলিনের বিভিন্ন এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এসব এলাকায় ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়।

এই সামাজিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অংশগ্রহণ। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া মামদানি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম মেয়র।

মামদানির নির্বাচনী প্রচারে বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিশুদের যত্নের সুযোগ বাড়ানো, অভিবাসীদের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ লাঘবের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। এসব ইস্যু বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসী পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নির্বাচনের সময় দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের অংশগ্রহণও আলোচনায় আসে। প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশি ভোটারদের অংশগ্রহণ প্রায় ৩৮৬ শতাংশ বেড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে ভোটারসংখ্যা, জরিপের পদ্ধতি ও তুলনার ভিত্তি বিবেচনা করা জরুরি।

মামদানি মেয়র হওয়ার পরও বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। গত ২০ অক্টোবর জ্যাকসন হাইটসের ওম শক্তি মন্দিরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আয়োজিত দুর্গাপূজার সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি সমাজে বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের অবদান এবং নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে ২২ অক্টোবর এ খবর প্রকাশিত হয়।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংগঠিত হওয়ার বিষয়টিও নিউইয়র্কে আলোচনায় রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মামদানির নির্বাচনী সাফল্যের পর শহরের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন স্থানীয় নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। ব্রঙ্কসের ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর নেতারাও নাগরিক উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা করছেন। তবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পুলিশি ব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা ও নগর পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন সংগঠনও কাজ করছে। গত ৪ অক্টোবর কুইন্সের উডসাইডে বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাডভোকেসি গ্রুপের আয়োজনে নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করা এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে কমিউনিটির দাবি তুলে ধরার বিষয়ে আলোচনা হয়। সংগঠনটির সভাপতি জয়নাল আবেদিনসহ অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জনসংখ্যা বেশি হলেই রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয় না; নিয়মিত ভোট দেওয়া, সংগঠিত থাকা এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাও জরুরি।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি তাঁদের সামনে রয়েছে আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অভিবাসনসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয়ে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নীতিনির্ধারণে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দাবি তুলে ধরতে কমিউনিটির সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ তুলে ধরতেও সাংস্কৃতিক আয়োজন, আলোচনা সভা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় তাই দুটি বিষয় পাশাপাশি উঠে এসেছে: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয় সংরক্ষণ এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ। জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশনের সংবাদ সম্মেলন প্রথম বিষয়টিকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে মামদানির মেয়র হওয়া এবং দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। এই উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে সংগঠনগুলোর ধারাবাহিকতা, নাগরিক সম্পৃক্ততা এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের অংশগ্রহণের ওপর।