কানাডার কয়েকটি প্রদেশে ঘড়ির কাঁটা বদলের নিয়ম বন্ধ, স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতা বিশেষজ্ঞদের
- প্রকাশঃ ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:০৭
- / 8
অটোয়া, ১ নভেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – বছরে দুইবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের নিয়ম থেকে বেরিয়ে এসেছে কানাডার কয়েকটি প্রদেশ ও অঞ্চল। ১ নভেম্বর থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অধিকাংশ এলাকা, আলবার্টা, ম্যানিটোবা ও নর্থওয়েস্ট টেরিটরিজে সারা বছর একই সময় বহাল থাকবে। তবে স্থায়ীভাবে গ্রীষ্মকালীন সময় চালু রাখায় শীতের সকালে সূর্যের আলো পেতে দেরি হবে। এতে ঘুম, শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি এবং শিশুদের স্কুলে যাতায়াতের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ঘুম ও জৈবিক ছন্দ নিয়ে গবেষণাকারী বিশেষজ্ঞরা।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা, ম্যানিটোবা ও নর্থওয়েস্ট টেরিটরিজে এ বছর ১ নভেম্বর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়নি। এসব অঞ্চলে মার্চে গ্রীষ্মকালীন সময় শুরু হওয়ার পর যে সময় চালু হয়েছিল, সেটিই সারা বছর বহাল থাকবে। ফলে আগামী বসন্তেও ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
তবে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সব এলাকায় একই পরিবর্তন কার্যকর হয়নি। প্রদেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বের কিছু এলাকায় আগে থেকেই আলাদা সময় অনুসরণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব এলাকার স্থানীয় নিয়ম অপরিবর্তিত রয়েছে।
ইউকন ২০২০ সাল থেকে সারা বছর একই সময় অনুসরণ করছে। সাসকাচুয়ানের অধিকাংশ এলাকাও ১৯৬৬ সাল থেকে বছরে দুইবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করে না। প্রদেশটির নতুন সময় আইন অনুযায়ী, এখন পুরো সাসকাচুয়ান সারা বছর কেন্দ্রীয় মানসম্মত সময় অনুসরণ করছে।
অন্যদিকে অন্টারিও, কুইবেক এবং আটলান্টিক প্রদেশগুলোর অধিকাংশ এলাকায় আগের নিয়ম বহাল রয়েছে। এসব অঞ্চলে ১ নভেম্বর ভোর ২টার সময় ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে রাত ১টা করা হয়েছে। ফলে সেখানে শীতকালীন মানসম্মত সময় শুরু হয়েছে।
স্থায়ী গ্রীষ্মকালীন সময় নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির উদ্বেগ
বছরে দুইবার সময় পরিবর্তনের ফলে ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে যে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে, স্থায়ী সময় চালু করলে তা এড়ানো সম্ভব। তবে সারা বছর গ্রীষ্মকালীন সময় বজায় রাখার স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে ঘড়ির সময় সূর্যের স্বাভাবিক অবস্থানের তুলনায় এক ঘণ্টা এগিয়ে থাকলে সকালে আলো পেতে দেরি হয়। ফলে অনেক মানুষকে অন্ধকারে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ ও কর্মস্থলে যেতে হবে। সকালের আলো দেরিতে পাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন কাজের সময়ের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। এ অবস্থাকে সামাজিক জেটল্যাগ বলা হয়।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম ও স্নায়ুবিজ্ঞানবিষয়ক কয়েকজন গবেষক সতর্ক করেছেন, স্থায়ী গ্রীষ্মকালীন সময় শিশু-কিশোরদের ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। সকালের আলো শরীরের জৈবিক ঘড়ি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শীতকালে অন্ধকার দীর্ঘায়িত হলে ঘুমের ঘাটতি, মনোযোগের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা থাকে।
শীতকালে সূর্য উঠবে আরও দেরিতে
ম্যানিটোবা সরকারের প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্লেষণে উইনিপেগ ও থম্পসন শহরের সূর্যোদয়ের সময়ের একটি তুলনা দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, স্থায়ী গ্রীষ্মকালীন সময় চালু থাকলে ২১ ডিসেম্বর উইনিপেগে সূর্য উঠবে সকাল ৯টা ২৪ মিনিটে। থম্পসনে সূর্যোদয় হবে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে। একই দিনে স্থায়ী মানসম্মত সময় চালু থাকলে শহর দুটিতে সূর্য উঠত যথাক্রমে সকাল ৮টা ২৪ মিনিট ও ৯টা ৫ মিনিটে।
কানাডার অনেক স্কুলে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ক্লাস শুরু হয়। ফলে শীতের সকালে শিক্ষার্থীদের অন্ধকারে স্কুলে যেতে হতে পারে। একইভাবে সকাল ৭টায় দোকানপাট খোলা বা দিনের শুরুতে কাজে যাওয়া কর্মীদেরও সূর্যোদয়ের আগেই বাইরে বের হতে হবে।
গবেষকদের মতে, সকালের আলো দেরিতে পাওয়ার সঙ্গে ঘুমের ঘাটতি, শরীরের জৈবিক ছন্দের অসামঞ্জস্য এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তবে স্থায়ী গ্রীষ্মকালীন সময়ের কারণে স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ সরাসরি বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণায় অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীভেদে পার্থক্যও দেখা যায়।
কুইবেকেও নিয়ম পরিবর্তনের উদ্যোগ
এদিকে কুইবেক প্রদেশেও বছরে দুইবার সময় পরিবর্তনের নিয়ম বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রিমিয়ার পল সাঁ-পিয়ের প্লামন্ড জানিয়েছেন, তাঁর সরকার এ ব্যবস্থা বন্ধ করতে চায়। তবে প্রদেশটি সারা বছর কোন সময় অনুসরণ করবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন সময়ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বিমান চলাচল এবং আন্তপ্রাদেশিক যোগাযোগের সময়সূচি সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেবে। বিশেষ করে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াতকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়ের ব্যবধান সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জানা জরুরি।
বছরে দুইবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের নিয়ম বন্ধ হলেও কোন সময় সারা বছর বহাল রাখা হবে, তা নিয়ে স্বাস্থ্যগত বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, স্থায়ী মানসম্মত সময় শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে স্থায়ী গ্রীষ্মকালীন সময়ের সমর্থকেরা শীতের বিকেলে বাড়তি আলো পাওয়ার সুবিধার কথা তুলে ধরছেন।















