বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন, আর্থিক প্রস্তুতিতে যেসব ভুল এড়াবেন
- প্রকাশঃ ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৫৮
- / 6
ঢাকা, ১৮ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির প্রস্তাব, এমনকি বৃত্তিও পাওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীর মনে হয়, উচ্চশিক্ষার আর্থিক প্রস্তুতির বড় অংশ শেষ। কিন্তু টিউশন ফি ছাড়াও বাসাভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যবিমা, যাতায়াত, ভিসা, বিমানভাড়া ও দৈনন্দিন ব্যয়ের হিসাব না রাখলে বিদেশে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়তে পারেন শিক্ষার্থীরা। তাই বিদেশে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই সম্ভাব্য সব খরচের বাস্তবসম্মত হিসাব তৈরি করা জরুরি।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনায় টিউশন ফি সাধারণত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ শিক্ষার্থীর প্রকৃত ব্যয়ের বড় অংশ জুড়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের জীবনযাত্রার খরচ। কানাডার টরন্টো কিংবা যুক্তরাজ্যের লন্ডনের মতো বড় শহরে বাসাভাড়া, খাবার, গণপরিবহন, বইপত্র ও ইন্টারনেটের পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শীতের পোশাক, চিকিৎসা এবং জরুরি প্রয়োজনের খরচ। অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমা নেওয়াও বাধ্যতামূলক। কোথাও এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা ভিসার শর্তের অংশ হতে পারে।
এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের সময় শুধু বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং বা বৃত্তির পরিমাণ বিবেচনা করলেই হবে না। যে শহরে পড়তে যাবেন, সেখানে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় কত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে কি না, আবাসন পেতে অপেক্ষা করতে হয় কি না এবং ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা নিলে কত খরচ হতে পারে, সেসব বিষয়ও যাচাই করতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার আগেই শুরু হয় খরচ
আর্থিক প্রস্তুতির হিসাব শুরু করতে হবে আবেদন করার সময় থেকেই। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে প্রতিটির আবেদন ফি দিতে হতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয় আইইএলটিএস, টোয়েফল বা জিআরইর মতো পরীক্ষার ফি এবং প্রস্তুতির খরচ। এরপর রয়েছে ভিসা আবেদন, বায়োমেট্রিকস, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং অন্যান্য নথি প্রস্তুতের ব্যয়।
বিমানভাড়াও বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাত্রার সময়, গন্তব্য ও টিকিট কেনার সময়ের ওপর ভিত্তি করে এই খরচে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হতে পারে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে টিউশন ফির একটি অংশ জমা দিতে বলে। আবাসনের ক্ষেত্রে অগ্রিম ভাড়া ও নিরাপত্তা জামানতও লাগতে পারে। ফলে বিদেশে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষার্থীর বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
একই দেশে শহরভেদে বদলে যায় ব্যয়ের হিসাব
বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় নির্ধারণে দেশ নির্বাচনের পাশাপাশি শহর নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানির অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি তুলনামূলক কম বা কিছু ক্ষেত্রে নেই, তবে সেমিস্টার ফি, আবাসন ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি এবং জীবনযাত্রার খরচ প্রতিষ্ঠান ও শহরভেদে ভিন্ন হতে পারে। একই দেশের একটি শহরে বাসাভাড়া বেশি হলেও অন্য শহরে তুলনামূলক কম খরচে থাকা সম্ভব।
তাই একাধিক দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় পাশাপাশি রেখে তুলনা করা ভালো। একটি হিসাবের ছকে টিউশন ফি, বার্ষিক আবাসন ও খাবারের খরচ, ভিসা ও বিমা, যাতায়াত এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ আলাদাভাবে রাখা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি অভিবাসনবিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।
এ বিষয়ে সিএইচএস এডুকেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান রাজু প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের বড় ভুল হলো শুধু টিউশন ফির হিসাব করা। একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেটে টিউশন ফির পাশাপাশি ভিসা, পরীক্ষা, বিমা, বিমানভাড়া, বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। পাশাপাশি সম্ভাব্য অপ্রত্যাশিত ব্যয় সামাল দিতে মোট বাজেটের অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জরুরি তহবিল হিসেবে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
রাজু আরও বলেন, দেশ ও শহরভেদে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, পছন্দের কোর্স এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সুযোগ বিবেচনা করে গন্তব্য নির্বাচন করা প্রয়োজন। বৃত্তি পেলেও এর শর্ত ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বৃত্তি প্রতি বছর নবায়ন করতে হয় কি না, ফলাফলের নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে কি না এবং কোন কোন খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত, তা আগেই জেনে নেওয়া জরুরি।
খণ্ডকালীন চাকরির আয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ
বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনায় অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, সেখানে গিয়ে খণ্ডকালীন চাকরি করে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে। কিন্তু এই হিসাব সব সময় বাস্তবসম্মত হয় না। কাজের সুযোগ, মজুরি, শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমোদিত সময় এবং ভিসার শর্ত দেশভেদে আলাদা। পড়াশোনার চাপের কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করার সময়ও নাও পাওয়া যেতে পারে।
নাজমুল হাসান রাজুর পরামর্শ, খণ্ডকালীন চাকরির আয়কে পড়াশোনার মূল অর্থায়ন হিসেবে না ধরে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। অর্থাৎ সম্ভাব্য চাকরির আয়ের ওপর নির্ভর করে বাসাভাড়া বা টিউশন ফির মতো অপরিহার্য ব্যয়ের পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং বিদেশে যাওয়ার আগেই অন্তত প্রথম বছরের প্রয়োজনীয় ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে, তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে তাই মাসিক ও বার্ষিক বাজেট তৈরি, সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বৃত্তির সুযোগ খোঁজা এবং ভিসার সর্বশেষ নিয়ম যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক ব্যয়ের পাশাপাশি জরুরি তহবিল ও দেশে ফেরার প্রয়োজনে সম্ভাব্য খরচও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে আর্থিক প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। ভর্তির প্রস্তাব পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও, সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত আর্থিক পরিকল্পনা।



























