ঢাকা ০৪:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেন সৌদি এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে না

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই
  • প্রকাশঃ ১০:৫৯:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / 76

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্রছবি: এএফপি


চলতি মাসে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতিথি ছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিও করেন।

কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান এমন এক ঘোষণা দিতে অস্বীকৃতি জানান; যা ট্রাম্পসহ আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও সব সময় চেয়ে এসেছেন। সেটি হলো, সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে পূর্ণ ও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক।

ট্রাম্পের মেয়াদকালে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন (সেপ্টেম্বর ২০২০), মরক্কো (ডিসেম্বর ২০২০) এবং সুদানের (জানুয়ারি ২০২১) সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করে। এটি ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে দূতাবাস খোলার সুযোগ দেয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করে।

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দখলদারত্ব, গাজা-পশ্চিম তীর-জেরুজালেমে বর্বর দমননীতি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন ইসরায়েলকে বহুদিন ধরে একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে। তাই এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কিন্তু এর পর থেকে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা শুরু করে, লেবাননে হামলা চালায়। ইয়েমেন, ইরান, সিরিয়া ও কাতারেও হামলা চালায়। এতে পুরো অঞ্চলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যেসব আরব দেশ ইতিমধ্যে চুক্তি করেছে তারা বিপাকে পড়ে, আর যারা নতুন চুক্তি করার কথা ভাবছিল, তারা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে থাকে।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককালে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সৌদি যুবরাজ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বাঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকাটা ইতিবাচক। আমরাও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হতে চাই। কিন্তু দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের (ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংকটে) সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত হওয়াও দেখতে চাই।’

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উপস্থিতিতে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে হাত মেলাচ্ছেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উপস্থিতিতে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে হাত মেলাচ্ছেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ছবি: এএফপি


ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক করা’ মানে কী

১৯৪৮ সালে একতরফা ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই আরব প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বহু মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ তাকে বয়কট করে আসছে।

‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ বলতে বোঝায়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও গোয়েন্দা সহযোগিতা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন।

তবে অনেকের কাছে ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ শব্দটা সমস্যার। কারণ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দখলদারত্ব, গাজা–পশ্চিম তীর–জেরুজালেমে বর্বর দমননীতি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন ইসরায়েলকে বহুদিন ধরে একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে। তাই এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বাঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকাটা ইতিবাচক। আমরাও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হতে চাই। কিন্তু দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের (ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটে) সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত হওয়াও দেখতে চাই।

মোহাম্মদ বিন সালমান, সৌদি আরবের যুবরাজ

এ ছাড়া এ শব্দটি শুনলে মনে হয় যেন ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের আগে কোনো যোগাযোগই ছিল না; যদিও বাস্তবে বহু দেশ গোপনে বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে লেনদেন করত।

ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের আগেই আরব ও মুসলিম–অধ্যুষিত দেশগুলো ফিলিস্তিনের ইহুদি বসতিগুলো বয়কট করেছিল।

১৯৪৮ সালের নাকবার সময় জায়নবাদী মিলিশিয়াদের হাতে প্রায় ১৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হন। এরপর আরব লিগের প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো (সৌদি আরব, মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও উত্তর ইয়েমেন) ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

১৯৫৪ সালে আরব লিগ ‘প্রস্তাব ৮৪৯’ পাস করে আরও আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিবেশী নয় এমন দেশগুলোর মধ্যেও ইসরায়েলবিরোধিতা ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান এর উদাহরণ। রেজা শাহ পাহলভির আমলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলা ইরানও ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তা চুকিয়ে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুললতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুললতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ছবি: এএফপি


ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি মিসর–জর্ডানের

১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের আমলে যুক্তরাষ্ট্র কিছু আইন করে। তাতে দেশটির কোম্পানিগুলোকে আরব বয়কটে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। কার্টারের ভাষায়, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রক্ষায় এ আইন করা হয়েছে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে ও এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।

১৯৭৭ সালের নভেম্বরে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত জেরুজালেমে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্টার ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দেশটির পার্লামেন্টে ভাষণ দেন। এরপর ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি হয় এবং মিসর ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে।

চুক্তির বিনিময়ে মিসর যুক্তরাষ্ট্রের আনুকূল্য লাভ করে। এর মধ্যে ছিল আর্থিক সহায়তা ও সিনাই উপদ্বীপ ফেরত পাওয়া। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে উপদ্বীপটি দখল করেছিল ইসরায়েল। আবার, মিসরও তার অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করে, সুয়েজ খালসহ নিজের জলভাগ দিয়ে ইসরায়েলের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়।

তবে আরব বিশ্ব এ চুক্তিকে প্রতারণা হিসেবে দেখে। আরব লিগ মিসরের সদস্যপদ স্থগিত করে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। চুক্তির বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত সাদাত খুন হওয়া পর্যন্ত গড়ায়। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে কায়রোয় সামরিক কুচকাওয়াজে হত্যা করা হয় তাঁকে।

১৯৪৮ সালের নাকবার সময় জায়নবাদী মিলিশিয়াদের হাতে প্রায় ১৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হন। এরপর আরব লিগের প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো (সৌদি আরব, মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও উত্তর ইয়েমেন) ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

এরপর দীর্ঘ বিরতি। ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন–মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি করে। এর আগে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে ইসরায়েল ও পিএলও (ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা) পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয় এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০০২ সালে আরব লিগ সৌদি আরবের নেতৃত্বে ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’ (আরব শান্তি উদ্যোগ) গ্রহণ করে। এর মূল কথা ছিল, ইসরায়েল যদি দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমি ও গোলান মালভূমি পুরোপুরি ছাড়ে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে রাজি হয়, তবে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। কিন্তু ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে।

এ উদ্যোগকে পরবর্তী সময়ে আরব লিগের ২০০৭ ও ২০১৭ সালের সম্মেলনেও সমর্থন জানানো হয় এবং ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর উত্তরাধিকারী মাহমুদ আব্বাসের মতো ফিলিস্তিনি নেতারাও এর সমর্থনে ছিলেন। তবে ইসরায়েল এবারও তা প্রত্যাখ্যান করে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

কেন সৌদি এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে না

প্রকাশঃ ১০:৫৯:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্রছবি: এএফপি


চলতি মাসে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতিথি ছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিও করেন।

কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান এমন এক ঘোষণা দিতে অস্বীকৃতি জানান; যা ট্রাম্পসহ আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও সব সময় চেয়ে এসেছেন। সেটি হলো, সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে পূর্ণ ও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক।

ট্রাম্পের মেয়াদকালে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন (সেপ্টেম্বর ২০২০), মরক্কো (ডিসেম্বর ২০২০) এবং সুদানের (জানুয়ারি ২০২১) সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করে। এটি ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে দূতাবাস খোলার সুযোগ দেয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করে।

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দখলদারত্ব, গাজা-পশ্চিম তীর-জেরুজালেমে বর্বর দমননীতি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন ইসরায়েলকে বহুদিন ধরে একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে। তাই এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কিন্তু এর পর থেকে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা শুরু করে, লেবাননে হামলা চালায়। ইয়েমেন, ইরান, সিরিয়া ও কাতারেও হামলা চালায়। এতে পুরো অঞ্চলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যেসব আরব দেশ ইতিমধ্যে চুক্তি করেছে তারা বিপাকে পড়ে, আর যারা নতুন চুক্তি করার কথা ভাবছিল, তারা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে থাকে।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককালে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সৌদি যুবরাজ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বাঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকাটা ইতিবাচক। আমরাও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হতে চাই। কিন্তু দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের (ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংকটে) সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত হওয়াও দেখতে চাই।’

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উপস্থিতিতে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে হাত মেলাচ্ছেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উপস্থিতিতে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে হাত মেলাচ্ছেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন। ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ছবি: এএফপি


ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক করা’ মানে কী

১৯৪৮ সালে একতরফা ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই আরব প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বহু মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ তাকে বয়কট করে আসছে।

‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ বলতে বোঝায়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও গোয়েন্দা সহযোগিতা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন।

তবে অনেকের কাছে ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ শব্দটা সমস্যার। কারণ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দখলদারত্ব, গাজা–পশ্চিম তীর–জেরুজালেমে বর্বর দমননীতি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন ইসরায়েলকে বহুদিন ধরে একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে। তাই এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমরা বিশ্বাস করি, পূর্বাঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকাটা ইতিবাচক। আমরাও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হতে চাই। কিন্তু দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের (ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটে) সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত হওয়াও দেখতে চাই।

মোহাম্মদ বিন সালমান, সৌদি আরবের যুবরাজ

এ ছাড়া এ শব্দটি শুনলে মনে হয় যেন ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের আগে কোনো যোগাযোগই ছিল না; যদিও বাস্তবে বহু দেশ গোপনে বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে লেনদেন করত।

ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের আগেই আরব ও মুসলিম–অধ্যুষিত দেশগুলো ফিলিস্তিনের ইহুদি বসতিগুলো বয়কট করেছিল।

১৯৪৮ সালের নাকবার সময় জায়নবাদী মিলিশিয়াদের হাতে প্রায় ১৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হন। এরপর আরব লিগের প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো (সৌদি আরব, মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও উত্তর ইয়েমেন) ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

১৯৫৪ সালে আরব লিগ ‘প্রস্তাব ৮৪৯’ পাস করে আরও আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিবেশী নয় এমন দেশগুলোর মধ্যেও ইসরায়েলবিরোধিতা ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান এর উদাহরণ। রেজা শাহ পাহলভির আমলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলা ইরানও ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তা চুকিয়ে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুললতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুললতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ছবি: এএফপি


ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি মিসর–জর্ডানের

১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের আমলে যুক্তরাষ্ট্র কিছু আইন করে। তাতে দেশটির কোম্পানিগুলোকে আরব বয়কটে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। কার্টারের ভাষায়, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রক্ষায় এ আইন করা হয়েছে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে ও এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।

১৯৭৭ সালের নভেম্বরে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত জেরুজালেমে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্টার ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দেশটির পার্লামেন্টে ভাষণ দেন। এরপর ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি হয় এবং মিসর ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে।

চুক্তির বিনিময়ে মিসর যুক্তরাষ্ট্রের আনুকূল্য লাভ করে। এর মধ্যে ছিল আর্থিক সহায়তা ও সিনাই উপদ্বীপ ফেরত পাওয়া। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে উপদ্বীপটি দখল করেছিল ইসরায়েল। আবার, মিসরও তার অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করে, সুয়েজ খালসহ নিজের জলভাগ দিয়ে ইসরায়েলের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়।

তবে আরব বিশ্ব এ চুক্তিকে প্রতারণা হিসেবে দেখে। আরব লিগ মিসরের সদস্যপদ স্থগিত করে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। চুক্তির বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত সাদাত খুন হওয়া পর্যন্ত গড়ায়। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে কায়রোয় সামরিক কুচকাওয়াজে হত্যা করা হয় তাঁকে।

১৯৪৮ সালের নাকবার সময় জায়নবাদী মিলিশিয়াদের হাতে প্রায় ১৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হন। এরপর আরব লিগের প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো (সৌদি আরব, মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও উত্তর ইয়েমেন) ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

এরপর দীর্ঘ বিরতি। ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন–মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি করে। এর আগে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে ইসরায়েল ও পিএলও (ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা) পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয় এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০০২ সালে আরব লিগ সৌদি আরবের নেতৃত্বে ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’ (আরব শান্তি উদ্যোগ) গ্রহণ করে। এর মূল কথা ছিল, ইসরায়েল যদি দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমি ও গোলান মালভূমি পুরোপুরি ছাড়ে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে রাজি হয়, তবে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। কিন্তু ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে।

এ উদ্যোগকে পরবর্তী সময়ে আরব লিগের ২০০৭ ও ২০১৭ সালের সম্মেলনেও সমর্থন জানানো হয় এবং ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর উত্তরাধিকারী মাহমুদ আব্বাসের মতো ফিলিস্তিনি নেতারাও এর সমর্থনে ছিলেন। তবে ইসরায়েল এবারও তা প্রত্যাখ্যান করে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”