ইরানে বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু: দায় কার—রাষ্ট্রীয় বাহিনী, নাকি ‘সন্ত্রাসীরা’
- প্রকাশঃ ০১:৪৬:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
- / 39
ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর এই স্বীকারোক্তি দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, অতীতে ইরানে সংঘটিত বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা থেকে তিনি সব সময় বিরত থেকেছেন।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে রাজধানী তেহরানের বাণিজ্যিক এলাকা গ্র্যান্ড বাজারে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। কয়েক দিনের মধ্যে তা ইরানের ছোট-বড় প্রায় সব শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন অভিযান চালায়।
তবে এই বিক্ষোভ চলাকালে ঠিক কী ঘটেছে এবং হাজার হাজার মানুষ কীভাবে প্রাণ হারাল—তা নিয়ে ইরান সরকার, বিদেশে অবস্থানরত বিরোধী গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা যাচ্ছে।
সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাত ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। ইরানের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, নিহত অনেককে খুব কাছ থেকে কিংবা ভবনের ছাদ থেকে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “মারাত্মকভাবে জখম করাই ছিল এসব হামলার উদ্দেশ্য।” গুলির পাশাপাশি ছুরিকাঘাতেও বহু মানুষ নিহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, নিহতদের বড় অংশই ছিলেন তরুণ-তরুণী; অনেকের বয়স বিশের কোঠায়।
বিক্ষোভ চরমে পৌঁছানোর পর গত ৮ জানুয়ারি রাতে ইরান সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট ও মুঠোফোন যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। ফলে জরুরি উদ্ধারসেবা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ইরানের ইতিহাসে এ ধরনের সর্বাত্মক ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট নজিরবিহীন।
প্রায় দুই সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে ইন্টারনেট চালু হলেও এখনো দেশটির বড় অংশের জনগণ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। আন্দোলনের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সহিংসতার ভিডিও বা তথ্য ইরানের বাইরে খুব কমই পৌঁছাতে পেরেছে। অল্পসংখ্যক মানুষ স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে তথ্য আদান–প্রদান করতে সক্ষম হন।
বর্তমানে রাস্তায় বড় ধরনের বিক্ষোভ না থাকলেও তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাজার হাজার সশস্ত্র নিরাপত্তা সদস্য টহল ও চেকপোস্ট বসিয়ে রেখেছেন।
ইরান সরকার দাবি করছে, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী দায়ী নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত ‘সন্ত্রাসীরা’ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে সহিংস পথে নিয়ে যেতে গুলি ও ছুরি ব্যবহার করেছে।
ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, যারা ‘দাঙ্গায়’ জড়িত ছিল, তাদের দ্রুত বিচার করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে বিক্ষোভ–সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিদেশভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ও ইরানের বাইরে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, অধিকাংশ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে এবং আরও ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি মৃত্যুর তথ্য যাচাই করছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, গুরুতর আহত হয়েছেন ২ হাজারের বেশি মানুষ এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৪ হাজারের বেশি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, বিক্ষোভে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন প্রায় ৫০০ জন। অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে।
আল–জাজিরা জানিয়েছে, এসব পরিসংখ্যান তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বিদেশভিত্তিক কয়েকটি ইরানি সংবাদমাধ্যম অভিযোগ করেছে, নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারকে কবর দেওয়ার অনুমতি পেতে ‘বুলেট মানি’ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যথায় নিহতদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হিসেবে উল্লেখ করে নথিতে সই করানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে ইরান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ চলাকালে ইরানের জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেও পরবর্তীতে অবস্থান কিছুটা নরম করেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও দেশটির এক মন্ত্রীর বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সব মিলিয়ে ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু দেশটির রাজনীতি ও সমাজে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী—রাষ্ট্রীয় বাহিনী, না কি সরকারের ভাষায় ‘সন্ত্রাসীরা’—তা নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক চলছে।
একদিকে সরকার কঠোর দমননীতি অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।






























