ঢাকা ১২:৫৬ , Mon, ২৭ Jul ২০২৬
বিশ্বসমাচার
আমেরিকা

টিপিএস বাতিলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী সংকটের আশঙ্কা, লাখো অভিবাসীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

নূজহাত নাছিম
  • প্রকাশঃ ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪
  • / 3
যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস কর্মসূচির আওতায় কাজ করা অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ায় বিভিন্ন শিল্প খাতে কর্মী সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস ও কাজের অনুমতি পাওয়া ১০ লাখের বেশি অভিবাসীর আইনি মর্যাদা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) কর্মসূচি বাতিলের উদ্যোগের পর দেশটির নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় কর্মী সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন নিয়োগকর্তারা।

ওয়াশিংটন ডিসি ও আশপাশের এলাকায় এল সালভাদরের বংশোদ্ভূত টিপিএস সুবিধাভোগী কর্মীরা মার্কিন ক্যাপিটল হিল, পেন্টাগন এবং আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্র সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন। একইভাবে ফ্লোরিডা, ম্যাসাচুসেটস ও নিউইয়র্কের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে হাইতিয়ান সেবাকর্মীরা প্রবীণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করে আসছেন।

এই কর্মীদের অনেকেই এখন নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে মানবিক সহায়তার এই কর্মসূচি বন্ধ করার অনুমতি দেয়। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন খাত তাদের অভিজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় কর্মীদের হারানোর আশঙ্কায় পড়েছে।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টিপিএস সুবিধাভোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রথম ধাপে হাইতি এবং আরও কয়েকটি দেশের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টিপিএস সুবিধাভোগী তাদের কাজের অনুমতি হারাতে পারেন। এরপর আগামী সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হলে এল সালভাদরের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সুবিধাভোগীও তাদের আইনি মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা পেন ওয়ার্টন বাজেট মডেলের নীতি বিশ্লেষণ পরিচালক আলেকজান্ডার আরনন বলেন, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ও শিল্প খাতে আইনগতভাবে কাজের অনুমতি হারানো হাজারো কর্মীর অভাব বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টিপিএস সুবিধাভোগীদের চলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটতে পারে। কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় বা অন্যান্য আইনি সুরক্ষার চেষ্টা করতে পারেন, আবার কেউ কেউ কাগজপত্র ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

টিপিএস কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এটি বহাল রাখার জন্য কংগ্রেসের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ইউএস চেম্বার অব কমার্সের নেতৃত্বে এই প্রচেষ্টায় বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও যুক্ত হয়েছেন।

সিনেটের নেতৃত্বের কাছে ১০ জুলাই পাঠানো এক চিঠিতে চেম্বার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীবাহিনীতে বড় ধরনের সমস্যা এড়াতে এবং একটি মানবিক সংকট মোকাবিলায় কংগ্রেসের অভিবাসন নীতিতে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। ওহাইওর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন হাইতিয়ানদের জন্য টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে তাঁর রাজ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

দক্ষিণ ফ্লোরিডায়, যেখানে বিপুলসংখ্যক হাইতিয়ান বসবাস করেন, মিয়ামি-ডেড কাউন্টির মেয়র ড্যানিয়েলা লেভন কাভা ও কমিশনার মার্লিন বাস্তিন ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বাস্তিন বলেন, টিপিএস বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয় হবে না, বরং এর ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ক্ষতি হতে পারে।

তবে মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট হাইতিয়ানদের টিপিএস বাড়ানোর উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন। তিনি এই কর্মসূচিকে স্থায়ী অভিবাসনের পথ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এর সমালোচনা করেন।

১৯৯০ সালে কংগ্রেসের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের স্বাক্ষরের মাধ্যমে টিপিএস কর্মসূচি চালু হয়। সশস্ত্র সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে না পারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের সাময়িক সুরক্ষা দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।

তবে কয়েকটি দেশে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে অনেক টিপিএস সুবিধা বছরের পর বছর ধরে বহাল রয়েছে। এর ফলে সমালোচকদের অভিযোগ, এই কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের একটি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদ থেকেই টিপিএস বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রশাসন এই কর্মসূচি বন্ধের উদ্যোগ নেয়। এক বছরের বেশি সময় ধরে আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট কার্যনির্বাহী শাখাকে টিপিএস বাতিলের অনুমতি দেয়।

যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে টিপিএস সুবিধাভোগীদের নিয়োগ দিয়ে আসছিল, তারা এসব কর্মীর দক্ষতা ও অবদানের প্রশংসা করেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগের পর অনেক কোম্পানি সরাসরি মন্তব্য না করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।

নির্মাণ শিল্পের সংগঠন বিল্ডার্স অ্যান্ড কন্ট্রাক্টরস অ্যাসোসিয়েশন স্বরাষ্ট্র দপ্তরে চিঠি দিয়ে টিপিএস বাতিলের ফলে সম্ভাব্য সমস্যার কথা জানিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার বলেন, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি আইনের শাসন বজায় রেখে সাধারণ নিয়মে ফিরে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অনুমতি ছাড়া কর্মীদের নিয়োগ দিলে নিয়োগকর্তারা জরিমানা ও আইনি সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। টিপিএস সুবিধাভোগীদের এখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা, অন্য আইনি সুরক্ষা খোঁজা অথবা দেশ ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সেন্ট্রাল আমেরিকার নাগরিকদের নিয়ে কাজ করা ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠন ক্যারেসেনের নির্বাহী পরিচালক আবেল নুনিয়েজ বলেন, অনেক টিপিএস সুবিধাভোগীর যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাংক হিসাব রয়েছে। তিনি বলেন, “আপনি তো আর পকেটে করে আপনার বাড়ি বা গাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন না।”

এল সালভাদর থেকে ২৩ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কনসেপসিয়ন মোরালেস টিপিএসের আওতায় ২২ বছর ধরে নেভাল একাডেমি ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। ৫০ বছর বয়সী মোরালেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সরকারি ভবনে গেলে সেখানে কোনো না কোনো টিপিএস কর্মীর কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। চার বছর আগে তিনি তাঁর এক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন সন্তানের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান। তবে টিপিএস সরাসরি গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ দেয় না।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্যাট্রিসিয়া ক্যাম্পোস-মেদিনা বলেন, টিপিএস সুবিধাভোগীদের অনেকেই তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তাঁদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে এবং অনেকের নিজস্ব বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে। অন্যদিকে রক্ষণশীল হেরিটেজ অ্যাকশনের সরকারি সম্পর্ক বিষয়ক পরিচালক ড্যানিয়েল ওয়েস্ট টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের সঠিক সিদ্ধান্ত।

সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া এল সালভাদরের টিপিএস নিয়ে প্রশাসন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ কয়েকটি দেশের টিপিএস বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রতি মাসে হাইতিতে একটি করে নির্বাসন ফ্লাইট পাঠাচ্ছে। গত ১৬ জুলাই হাইতির উত্তরাঞ্চলীয় শহর ক্যাপ হাইতিয়েনে সর্বশেষ ফ্লাইটে ১০০ জনের বেশি মানুষকে পাঠানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম রূপকার স্টিফেন মিলার বলেন, হাইতিয়ানদের জন্য হাইতিই তাদের দেশ এবং তারা সেখানে বসবাস করতে পারবেন।

তবে ২০২১ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হত্যার পর হাইতিতে সহিংসতা বেড়েছে। রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্সের বড় অংশ অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে অপহরণ, হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। দেশটির ১০ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য সংকটের কথা জানিয়েছে।

ফ্লোরিডায় কর্মরত এক হাইতিয়ান নার্স, যিনি ২০১০ সাল থেকে টিপিএস সুবিধা পাচ্ছেন, বলেন তিনি এমন একটি দেশে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন যেখানে এক দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করেননি এবং যেখানে তাঁর কোনো পরিবার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এক সন্তানের এই মা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, অভিবাসন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কায় তিনি গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

❤️
👏
🙂
😞

টিপিএস বাতিলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী সংকটের আশঙ্কা, লাখো অভিবাসীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

প্রকাশঃ ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস ও কাজের অনুমতি পাওয়া ১০ লাখের বেশি অভিবাসীর আইনি মর্যাদা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) কর্মসূচি বাতিলের উদ্যোগের পর দেশটির নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় কর্মী সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন নিয়োগকর্তারা।

ওয়াশিংটন ডিসি ও আশপাশের এলাকায় এল সালভাদরের বংশোদ্ভূত টিপিএস সুবিধাভোগী কর্মীরা মার্কিন ক্যাপিটল হিল, পেন্টাগন এবং আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্র সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন। একইভাবে ফ্লোরিডা, ম্যাসাচুসেটস ও নিউইয়র্কের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে হাইতিয়ান সেবাকর্মীরা প্রবীণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করে আসছেন।

এই কর্মীদের অনেকেই এখন নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে মানবিক সহায়তার এই কর্মসূচি বন্ধ করার অনুমতি দেয়। এর ফলে দেশটির বিভিন্ন খাত তাদের অভিজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় কর্মীদের হারানোর আশঙ্কায় পড়েছে।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টিপিএস সুবিধাভোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রথম ধাপে হাইতি এবং আরও কয়েকটি দেশের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টিপিএস সুবিধাভোগী তাদের কাজের অনুমতি হারাতে পারেন। এরপর আগামী সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হলে এল সালভাদরের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সুবিধাভোগীও তাদের আইনি মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা পেন ওয়ার্টন বাজেট মডেলের নীতি বিশ্লেষণ পরিচালক আলেকজান্ডার আরনন বলেন, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ও শিল্প খাতে আইনগতভাবে কাজের অনুমতি হারানো হাজারো কর্মীর অভাব বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টিপিএস সুবিধাভোগীদের চলে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটতে পারে। কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় বা অন্যান্য আইনি সুরক্ষার চেষ্টা করতে পারেন, আবার কেউ কেউ কাগজপত্র ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

টিপিএস কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এটি বহাল রাখার জন্য কংগ্রেসের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ইউএস চেম্বার অব কমার্সের নেতৃত্বে এই প্রচেষ্টায় বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও যুক্ত হয়েছেন।

সিনেটের নেতৃত্বের কাছে ১০ জুলাই পাঠানো এক চিঠিতে চেম্বার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীবাহিনীতে বড় ধরনের সমস্যা এড়াতে এবং একটি মানবিক সংকট মোকাবিলায় কংগ্রেসের অভিবাসন নীতিতে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। ওহাইওর রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন হাইতিয়ানদের জন্য টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে তাঁর রাজ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

দক্ষিণ ফ্লোরিডায়, যেখানে বিপুলসংখ্যক হাইতিয়ান বসবাস করেন, মিয়ামি-ডেড কাউন্টির মেয়র ড্যানিয়েলা লেভন কাভা ও কমিশনার মার্লিন বাস্তিন ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বাস্তিন বলেন, টিপিএস বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয় হবে না, বরং এর ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ক্ষতি হতে পারে।

তবে মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট হাইতিয়ানদের টিপিএস বাড়ানোর উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন। তিনি এই কর্মসূচিকে স্থায়ী অভিবাসনের পথ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এর সমালোচনা করেন।

১৯৯০ সালে কংগ্রেসের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের স্বাক্ষরের মাধ্যমে টিপিএস কর্মসূচি চালু হয়। সশস্ত্র সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরতে না পারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের সাময়িক সুরক্ষা দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।

তবে কয়েকটি দেশে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে অনেক টিপিএস সুবিধা বছরের পর বছর ধরে বহাল রয়েছে। এর ফলে সমালোচকদের অভিযোগ, এই কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের একটি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদ থেকেই টিপিএস বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রশাসন এই কর্মসূচি বন্ধের উদ্যোগ নেয়। এক বছরের বেশি সময় ধরে আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট কার্যনির্বাহী শাখাকে টিপিএস বাতিলের অনুমতি দেয়।

যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে টিপিএস সুবিধাভোগীদের নিয়োগ দিয়ে আসছিল, তারা এসব কর্মীর দক্ষতা ও অবদানের প্রশংসা করেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগের পর অনেক কোম্পানি সরাসরি মন্তব্য না করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।

নির্মাণ শিল্পের সংগঠন বিল্ডার্স অ্যান্ড কন্ট্রাক্টরস অ্যাসোসিয়েশন স্বরাষ্ট্র দপ্তরে চিঠি দিয়ে টিপিএস বাতিলের ফলে সম্ভাব্য সমস্যার কথা জানিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার বলেন, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি আইনের শাসন বজায় রেখে সাধারণ নিয়মে ফিরে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অনুমতি ছাড়া কর্মীদের নিয়োগ দিলে নিয়োগকর্তারা জরিমানা ও আইনি সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। টিপিএস সুবিধাভোগীদের এখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা, অন্য আইনি সুরক্ষা খোঁজা অথবা দেশ ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সেন্ট্রাল আমেরিকার নাগরিকদের নিয়ে কাজ করা ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠন ক্যারেসেনের নির্বাহী পরিচালক আবেল নুনিয়েজ বলেন, অনেক টিপিএস সুবিধাভোগীর যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাংক হিসাব রয়েছে। তিনি বলেন, “আপনি তো আর পকেটে করে আপনার বাড়ি বা গাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন না।”

এল সালভাদর থেকে ২৩ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কনসেপসিয়ন মোরালেস টিপিএসের আওতায় ২২ বছর ধরে নেভাল একাডেমি ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। ৫০ বছর বয়সী মোরালেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সরকারি ভবনে গেলে সেখানে কোনো না কোনো টিপিএস কর্মীর কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। চার বছর আগে তিনি তাঁর এক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন সন্তানের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান। তবে টিপিএস সরাসরি গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ দেয় না।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্যাট্রিসিয়া ক্যাম্পোস-মেদিনা বলেন, টিপিএস সুবিধাভোগীদের অনেকেই তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তাঁদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে এবং অনেকের নিজস্ব বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে। অন্যদিকে রক্ষণশীল হেরিটেজ অ্যাকশনের সরকারি সম্পর্ক বিষয়ক পরিচালক ড্যানিয়েল ওয়েস্ট টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের সঠিক সিদ্ধান্ত।

সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া এল সালভাদরের টিপিএস নিয়ে প্রশাসন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ কয়েকটি দেশের টিপিএস বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রতি মাসে হাইতিতে একটি করে নির্বাসন ফ্লাইট পাঠাচ্ছে। গত ১৬ জুলাই হাইতির উত্তরাঞ্চলীয় শহর ক্যাপ হাইতিয়েনে সর্বশেষ ফ্লাইটে ১০০ জনের বেশি মানুষকে পাঠানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম রূপকার স্টিফেন মিলার বলেন, হাইতিয়ানদের জন্য হাইতিই তাদের দেশ এবং তারা সেখানে বসবাস করতে পারবেন।

তবে ২০২১ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হত্যার পর হাইতিতে সহিংসতা বেড়েছে। রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্সের বড় অংশ অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে অপহরণ, হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। দেশটির ১০ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য সংকটের কথা জানিয়েছে।

ফ্লোরিডায় কর্মরত এক হাইতিয়ান নার্স, যিনি ২০১০ সাল থেকে টিপিএস সুবিধা পাচ্ছেন, বলেন তিনি এমন একটি দেশে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন যেখানে এক দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করেননি এবং যেখানে তাঁর কোনো পরিবার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এক সন্তানের এই মা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, অভিবাসন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কায় তিনি গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।