ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ
- প্রকাশঃ ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:১৫
- / 2
ঢাকা, ৪ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা এখন খেলাপি। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ পাওয়া তথ্য তুলনা করে দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের পর রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা। তবে দেশগুলোর তথ্য একই সময়ের নয়। চাদের সর্বশেষ তথ্য ২০২৩ সালের, আর অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পরবর্তী সময়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ৩২.৭৮ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান খেলাপি ঋণের বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত অনেক ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। এর ফলে আগে আড়ালে থাকা অনেক ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক হয়ে পড়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে দেওয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং জ্বালানি সংকটও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যের তুলনায় বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চাদ। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে এই তথ্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের এবং এরপর চাদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংশ্লিষ্ট সূচকে নতুন তথ্য দেয়নি।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইকুয়েটোরিয়াল গিনি। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ।
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ০৫ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে রয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ২০ দশমিক ৬ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। ২০২৩ সালে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে এই হার প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল।
তবে ২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেনের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমতে শুরু করে। ঋণ আদায়, পুনর্গঠন এবং তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ায় মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার কমে আসে। ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১৩৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন হৃভনিয়া বা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ২৭ শতাংশে নেমে আসে।
বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের শেষ দিকে। ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ব্যাংক প্রিভাতব্যাংকসহ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ হিসাব থেকে অবলোপন করে। এর ফলে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি তা কমে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে।
তবে অবলোপন মানে এসব ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট ঋণগুলো আগেই শতভাগ সঞ্চিতির আওতায় ছিল। অবলোপনের পর সেগুলো ব্যাংকের মূল স্থিতিপত্র থেকে সরিয়ে আলাদা হিসাবে নেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায়ের অধিকার ব্যাংকের রয়েছে। প্রিভাতব্যাংক এসব অর্থ উদ্ধারে ইউক্রেনের পাশাপাশি লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলেও আইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেনে খেলাপি ঋণ কমার ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার আরও কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে এটি দেশটির অন্যতম সর্বনিম্ন হার।
ইউক্রেন ও বাংলাদেশের গতিপথ এখানে অনেকটাই বিপরীত। ইউক্রেন পুরোনো এবং সম্পূর্ণ সঞ্চিতি রাখা খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে, ঋণ আদায় ও পুনর্গঠন করেছে এবং তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়িয়েছে। এতে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের অনুপাত দ্রুত কমেছে।
বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। দুই বছরের মধ্যে তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে পুরো অর্থ এই সময়ে নতুন করে খেলাপি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা এবং হিসাবগত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত দেখানো সমস্যাগ্রস্ত ঋণের একটি বড় অংশ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিও জোরদার করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের ফলে আগে নিয়মিত হিসেবে দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে।
একই সময়ে ঋণখেলাপিদের জন্য পুনঃতফসিল ও অন্যান্য সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। তবে ঋণ অবলোপন বা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো গেলেও এতে পাওনা অর্থ আদায় নিশ্চিত হয় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও সতর্ক করেছে, কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণনীতি ও সম্পদের মান পর্যালোচনার ফলে আরও খেলাপি ঋণ সামনে আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত ও অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ঋণ অনুমোদন ও ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং নতুন করে অনিয়মিত ঋণ সৃষ্টি বন্ধ করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মধ্য মেয়াদে খেলাপি ঋণের হার কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে নির্বিচারে পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কাগজে খেলাপি ঋণের হার কমলেও ব্যাংক খাতের মূল ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
তথ্য সূত্র: প্রথম আলো























