ব্রিটেনের প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ তরুণরা, কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তারা?
- প্রকাশঃ ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭
- / 8
লন্ডন, ৩ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করছেন। তবে ফারাজকে সমর্থন বা বিরোধিতা করা ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান একরৈখিক নয়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফারাজবিরোধী ভোটারদের একটি বড় অংশ তরুণ, শহুরে ও তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল হলেও আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে ডানঘেঁষা। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত কলামিস্ট আদিত্য চক্রবর্তীর মতামতধর্মী নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
চক্রবর্তীর নিবন্ধে হোপ নট হেটের গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফোকালডাটার মাধ্যমে সংগৃহীত ১১ হাজারের বেশি রিফর্ম ইউকে সমর্থকের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি ওই গবেষণায় দলটির ভোটারদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় রিফর্ম ইউকের সমর্থকদের পাঁচটি আলাদা গোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে থাকা ভোটার, কট্টর রক্ষণশীল, তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ভোটার এবং তরুণ ও প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সন্দিহান ভোটারও রয়েছে।
চক্রবর্তীর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফারাজবিরোধী ভোটারদের একটি বড় অংশ তরুণ, শহুরে, স্নাতক এবং অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল। তবে ফারাজের বিরোধিতা করা সবাই বামপন্থি নন। ডানঘেঁষা ভোটারদের একটি অংশ ফারাজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে একমত হলেও তার নেতৃত্বাধীন দলের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা ও পরিচালনাগত সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ, তাদের আপত্তির জায়গা ফারাজের রক্ষণশীল অবস্থানের চেয়ে তার দল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধরন নিয়ে বেশি।
নিবন্ধে নারীদের অবস্থানকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। চক্রবর্তীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নারীরা ধারাবাহিকভাবে ফারাজের রাজনৈতিক বার্তাকে পুরুষদের তুলনায় কম সমর্থন করেন। একই সঙ্গে অভিবাসন ইস্যুতে ফারাজের কঠোর অবস্থানই তার বিরোধীদের প্রধান আপত্তির কারণ, এমন সরল ব্যাখ্যাও গবেষণার তথ্য থেকে পাওয়া যায় না। ডানঘেঁষা কিছু ভোটারের কাছে রাজনৈতিক শিষ্টাচার, নেতৃত্বের ধরন ও বিশৃঙ্খলার প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফারাজের রাজনীতির প্রতি বিরোধিতাকারীদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও ওয়েস্টমিনস্টারের প্রতি অসন্তোষ। চক্রবর্তীর মতে, অনেক ভোটার মূলধারার রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকদের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। ফলে ফারাজের রাজনৈতিক উত্থানকে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘদিনের হতাশার ফল হিসেবেও দেখা যায়।
এই হতাশার বিষয়টি রিফর্ম ইউকের নিজস্ব ভোটারদের মধ্যেও দেখা যায়। হোপ নট হেটের গবেষণায় রিফর্ম সমর্থকদের বড় একটি অংশকে এমন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশা থেকে ফারাজের দিকে ঝুঁকেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, রিফর্ম ইউকের সমর্থকদের মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবা ও আবাসন নিয়ে উদ্বেগও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দলটির ভোটব্যাংককে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
চক্রবর্তীর বিশ্লেষণে ব্রিটিশ রাজনীতিতে অভিবাসন ও বর্ণবাদবিরোধী অবস্থানের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তার মতে, ফারাজবিরোধী কিছু ভোটার তার অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে নিজেদের প্রধান আপত্তির বিষয় হিসেবে দেখেন না। বিশেষ করে ডানঘেঁষা ভোটারদের কেউ কেউ অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান মেনে নিলেও ফারাজের রাজনৈতিক আচরণ বা দলীয় বিশৃঙ্খলাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন। এটি লেখকের বিশ্লেষণ, গবেষণার একটি সরাসরি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
রিফর্ম ইউকের নির্বাচনী সম্ভাবনাও নিবন্ধে গুরুত্ব পেয়েছে। চক্রবর্তীর উদ্ধৃত আসনভিত্তিক রাজনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হলে দলটি ১০০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রিফর্ম ইউকে পরবর্তী সরকার গঠনের প্রতিযোগিতায় যেতে পারে অথবা প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে। তবে এটি একটি নির্বাচনী পূর্বাভাস, নিশ্চিত ফল নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির জনসমর্থন নিয়ে বিভিন্ন জরিপে ওঠানামাও দেখা যাচ্ছে।
চক্রবর্তীর মতে, ফারাজের জনপ্রিয়তার পেছনে ভোটারদের স্থায়ী রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বড় ভূমিকা রাখছে। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, লেবার পার্টি যদি জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রিফর্ম ইউকের উত্থান ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
ব্রিটিশ রাজনীতির এই সমীকরণে তরুণ ভোটারদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনাস্থা, নতুন রাজনৈতিক বিকল্পের আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে তরুণ ভোটারদের একটি অংশ ডানদিকে ঝুঁকছে, আবার আরেকটি অংশ ফারাজের বিরোধিতায় অবস্থান নিচ্ছে। ফলে আগামী নির্বাচনে রিফর্ম ইউকের সঙ্গে প্রধান দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে এই অসন্তুষ্ট ভোটারদের কোন দল কতটা আকৃষ্ট করতে পারে তার ওপর।

























