আপনি গরিব থাকতে চাইলে কেউ ধনী করতে পারবে না
- প্রকাশঃ ০৭:০৮:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
- / 2
আবু আহমেদ । গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, কোনো দেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের অর্থে ধনী হতে পারে না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিজেদের সক্ষমতা ও উদ্যোগের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনি গরিব থাকতে চাইলে কেউ ধনী করতে পারবে না। আমরা কেন গরিব আছি এবং কেন আরও গরিব থাকার ব্যবস্থা করছি, তা সিরিয়াসলি অনুধাবন করতে হবে।”
সোমবার রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সহযোগিতায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এই সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক এম এ বাকী খলিলী এবং সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে শেয়ারবাজার এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। তার মতে, শেয়ারবাজারের বিকাশে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা না থাকায় এ খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আগে যে কর-সুবিধা ছিল, তা এখন আর নেই। একসময় এক লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়ে করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্যও উল্লেখযোগ্য কোনো প্রণোদনা নেই।
তিনি আরও বলেন, “বেশি কর মানেই বেশি রাজস্ব আদায় নয়। পৃথিবীর কোনো দেশ এটি প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে অতিরিক্ত করের বোঝা দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না।”
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য গঠিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল নিয়েও সমালোচনা করেন আইসিবির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সরকার মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ কারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ তহবিল থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে।
আবু আহমেদের মতে, এতে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, “বন্ধ কারখানার উদ্যোক্তারা তহবিলের অর্থ নিয়ে সরকারি বন্ড কিনতে পারেন, যেখানে সুদের হার ১২ শতাংশ। সেক্ষেত্রে কারখানা চালানোর প্রয়োজনীয়তা কোথায়?”
পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইউনিলিভারের বিভিন্ন পণ্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। একইভাবে নেসলের পণ্য ব্যবহার করলেও প্রতিষ্ঠানটি কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, “এসব প্রশ্ন না করলে ভালো মানের শেয়ার পাওয়া যাবে না।”
সঞ্চয়পত্রকে বিনিয়োগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আবু আহমেদ। তিনি বলেন, বিনিয়োগের বিকল্প সুযোগ সীমিত থাকায় মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। তবে বিশ্বের কোনো দেশে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে মানুষ ধনী হওয়ার নজির নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারকে সতর্ক করে আবু আহমেদ বলেন, ভবিষ্যতে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে চাপ আরও বাড়তে পারে। তার মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে একটি ঋণ পরিশোধ করতে আরেকটি ঋণ নিতে হবে। তিনি আর্জেন্টিনা, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এসব দেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে।
সরকারের আকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বক্তব্যে তিনি বলেন, “এত বড় সরকারের কী প্রয়োজন? সচিবালয়ের সবাই কী কাজ করছে?”
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার মামুন রশীদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য মোহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়াসহ অন্যরা।














