গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদির জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের সাত দিন
- প্রকাশঃ ১১:২২:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 97
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির সংগঠক শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর টানা সাত দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর রাতে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রচারণায় থাকা ওসমান হাদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধারা একজন সাহসী ও আপসহীন যোদ্ধা হিসেবে দেখতেন। তাঁর ওপর হামলার পরবর্তী সাত দিনের ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
১২ ডিসেম্বর (শুক্রবার): গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিন
জুমার নামাজ শেষে বেলা ২টা ২৪ মিনিটে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা অবস্থায় ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে এসে হামলাকারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গুলি ডান কানের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তাঁর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। প্রাথমিক অস্ত্রোপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এই ঘটনার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন।
১৩ ডিসেম্বর (শনিবার): সন্দেহভাজন শনাক্ত
ঢাকা মহানগর পুলিশ জানায়, গুলি চালানো ব্যক্তি হিসেবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর ছবি ও তথ্য সীমান্ত ও বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা গুলি করা ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন।
এভারকেয়ার হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওসমান হাদির ‘ইন্টারনাল রেসপন্স’ থাকলেও তিনি আশঙ্কামুক্ত নন।
১৪ ডিসেম্বর (রোববার): তদন্তে অগ্রগতি
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, হামলায় জড়িত তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। গুলি চালান ফয়সাল, মোটরসাইকেল চালান আলমগীর শেখ এবং নজরদারিতে ছিলেন জাকির। কয়েক মাস পরিকল্পনা করে হামলাটি চালানো হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
হামলার ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই দিনে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আটক করে র্যাব।
১৫ ডিসেম্বর (সোমবার): সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর
উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও চিকিৎসক দল যান। এদিন পর্যন্ত হামলার ঘটনায় মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৬ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার): অবস্থা সংকটাপন্ন
ইনকিলাব মঞ্চ জানায়, ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হলেও পরে তা স্থিতিশীল হয়। তবে নতুন অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁর শারীরিক অবস্থা উপযোগী ছিল না। এদিন আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পাশাপাশি কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৭ ডিসেম্বর (বুধবার): আশঙ্কাজনক অবস্থা
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ওসমান হাদির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান তাঁকে দেখতে যান এবং চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন। প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে হাদির জন্য দোয়ার অনুরোধ জানান।
১৮ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার): শেষ বিদায়
দিনভর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পর বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদি মারা যান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র ও ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
ওসমান হাদির মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন, সহযোদ্ধা ও সমর্থকদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।























