মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই ঠিকানাই: মঈনুল রোডের বাড়িই ছিল খালেদা জিয়ার শেষ স্থায়ী পরিচয়
- প্রকাশঃ ০৩:৪১:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
- / 45
ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের যে বাড়িটি থেকে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর নাটকীয়ভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেই ঠিকানাটিই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেছেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামাতেও তিনি ওই বাড়ির ঠিকানাই উল্লেখ করেছিলেন।
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১—এই তিনটি সংসদীয় আসনে প্রার্থী হতে জমা দেওয়া নথিতে খালেদা জিয়া নিজের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেন ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের ওই বাড়িটি। তবে সম্পত্তির বিবরণীতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বাড়িটি তাঁর মালিকানাধীন নয় এবং তাঁর দখলেও নেই।
এই বাড়িটি শুধু একটি বাসভবন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নীরব সাক্ষী। ১৯৭২ সালে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখানেই অবস্থান করেন।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের বন্দিত্ব এবং একই বছরের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব—এই দুই যুগান্তকারী ঘটনাও ঘটে এই বাড়ির প্রাঙ্গণেই। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণের পর জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বার্ষিক এক টাকা খাজনার শর্তে বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে এ বাড়িই ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখের নীরব সঙ্গী।
২০১০ সালের নভেম্বরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এক উচ্ছেদ অভিযানে ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত এই বাসভবন থেকে খালেদা জিয়াকে বের করে দেওয়া হয়। সেদিন প্রয়োজনীয় মালামাল নেওয়ারও সুযোগ পাননি তিনি। এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং তাঁর কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে সেখানে সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের জন্য ১৪ তলা একটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
শহীদ মঈনুল রোডের ওই বাড়িটি কেবল ইট-সুরকির একটি স্থাপনা ছিল না। এটি ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থান। এখানেই বেড়ে উঠেছেন তাঁর সন্তানরা, এখানেই জমা ছিল দাম্পত্য জীবনের অসংখ্য স্মৃতি।
পরবর্তী সময়ে গুলশানের ‘ফিরোজা’য় বসবাস করলেও খালেদা জিয়ার স্মৃতিতে মঈনুল রোডের সেই বাড়ির বারান্দা ও প্রাঙ্গণ কখনো মুছে যায়নি বলে মনে করেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। পুরোনো কর্মীদের ভাষ্য, বাড়িটি হারানোর শোক তিনি কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত গাড়িচালক নুরুল আমিন বলেন, বাড়িটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সেখানে ম্যাডাম থাকতেন, তারেক রহমান ও কোকো থাকতেন—এই কারণেই সেটাই হয়ে উঠেছিল রাজকীয়। বলতে গেলে, ওটাই ছিল এক ধরনের প্রাসাদ।
এদিকে, অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম মনে করেন, পারিবারিক স্মৃতির বাইরেও এই বাড়িটি ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক ইতিহাসের ‘আঁতুড়ঘর’। তাঁর ভাষায়, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে এই বাড়িটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
















