ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় খালেদা জিয়ার লিভারের অবনতি: এফ এম সিদ্দিকী
- প্রকাশঃ ০৯:০৫:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / 89
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসাগত অবহেলার কারণেই তাঁর লিভারের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী।
তিনি জানান, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯–জনিত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বর্তমান মেডিক্যাল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত তিনি ও তাঁর দল চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁরা বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। অথচ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে তাঁকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় নিয়মিত মেথোট্রেক্সেট (Methotrexate) সেবনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ভর্তি থাকা অবস্থাতেও ওষুধটি দেওয়া হয়। বিষয়টি জানার পরপরই তাঁরা মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করে দেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং রিউমাটোলজিস্টদের পরামর্শেই মেথোট্রেক্সেট সেবন করছিলেন। পাশাপাশি তাঁর এমএএফএলডি (মেটাবোলিক অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ) ছিল, যা এই ওষুধ ব্যবহারে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকীর ভাষায়, লিভারের অসুখ শনাক্ত করা খুবই সহজ একটি বিষয় ছিল এবং এর জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজনও ছিল না। মেথোট্রেক্সেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট করা এবং অস্বাভাবিক ফলাফল এলে ওষুধ বন্ধ করে অন্তত একটি আলট্রাসনোগ্রাম করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ হওয়ার পরও সরকার নিযুক্ত চিকিৎসকেরা কোনো আলট্রাসনোগ্রাম করেননি এবং ওষুধ বন্ধও করেননি।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে খালেদা জিয়া সেখানে আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে রাজি হননি। তবে অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর আস্থাভাজন চিকিৎসকের মাধ্যমে শয্যার পাশে পয়েন্ট অব কেয়ার আলট্রাসাউন্ড (POCUS) করা যেত। অন্ততপক্ষে মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করাই ছিল ন্যূনতম কর্তব্য।
খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, মেথোট্রেক্সেটই তাঁর ফ্যাটি লিভারের অবস্থা আরও খারাপ করে লিভার সিরোসিসে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ওষুধটি তাঁর লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জন’ হিসেবে কাজ করেছে।
বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের লাখো মানুষের হৃদয়ে আজ গভীর আফসোস—গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করা এই মানুষটি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন এবং মানুষের নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার প্রয়োগের দৃশ্যটি দেখতে পেতেন।
অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, চিকিৎসায় চরম অবহেলা এবং লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা স্পষ্টভাবে ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’। এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এর পেছনে সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসাতেও অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে রয়েছে।
এ বিষয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী তিনটি বিষয় খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান। সেগুলো হলো—সরকার গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যদের পরিচয় ও দক্ষতার মানদণ্ড, ভর্তিকালীন সময়ে চিকিৎসায় যুক্ত চিকিৎসকদের ভূমিকা ও দায় এবং মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাকালে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্তিতে বাধা দেওয়ার কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে।























