‘লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে বাসাভাড়া দেওয়ার টাকাও ছিল না’, বিশ্বকাপের মঞ্চে ওঠার সংগ্রামের গল্প বললেন সঞ্জয় দেব
- প্রকাশঃ ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১১
- / 4
ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কানাডার মঞ্চে পারফর্ম করে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পী সঞ্জয় দেব। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের উদ্বোধনী আয়োজনে পারফর্ম করা প্রথম বাংলাদেশি শিল্পী হিসেবে তিনি আলোচনায় আসেন। সম্প্রতি ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে বিশ্বকাপের মঞ্চে ওঠার পথ, শৈশবের স্বপ্ন, অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান বলে উল্লেখ করেন সঞ্জয় দেব। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিন না একদিন সেই মঞ্চে পৌঁছাতই। সেখানে নিজে থাকতে পেরেছেন, এটিকে তিনি নিজের সৌভাগ্য বলে মনে করেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই নিজেকে বিশ্বের বড় মঞ্চে কল্পনা করতেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। নিজের স্বপ্নগুলো নিয়মিত ডায়েরিতে লিখে রাখতেন এবং কখনো হার মানেননি। তাঁর ভাষায়, তিনি কখনো হারেননি, হয় জিতেছেন, না হয় শিখেছেন।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর তাঁর স্বপ্ন আরও বড় হতে শুরু করে বলে জানান সঞ্জয়। তিনি বলেন, সিলিকন ভ্যালির পরিবেশ, অ্যাপল ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং শিক্ষকদের উৎসাহ তাঁকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। একই সময়ে অভিবাসী জীবনে তাঁর মা-বাবার কঠোর পরিশ্রমও তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
সঞ্জয় জানান, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর তাঁর বাবা-মা সংসার চালাতে দুটি করে কাজ করতেন। পরিবারের আর্থিক কষ্ট দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এমন কিছু করবেন যাতে তাঁদের সেই কষ্ট দূর হয়। সেই লক্ষ্য থেকেই নিজের পথ তৈরি করেছেন।
সংগীতচর্চার শুরুটা পরিবার থেকেই। তাঁর মা ও নানি গান গাইতেন এবং পারিবারিক গানের আসরে তিনি তবলা বাজাতেন। ১২তম জন্মদিনে এক আত্মীয়ের দেওয়া একটি ল্যাপটপ ও সংগীত তৈরির সফটওয়্যার তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখেন এবং নিজেকে ‘ওয়ান ম্যান ব্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ক্লাস এইটে পড়ার সময় থেকেই সংগীত প্রযোজনা শুরু করেন।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর পোশাকে বাঘের নকশা, জাতীয় ফুল শাপলা এবং বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার প্রতীক বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। গানটি ইংরেজিতে হলেও নিজের শিকড়কে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
অভিবাসী শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ পথচলায় নানা বাধার মুখোমুখি হওয়ার কথাও তুলে ধরেন সঞ্জয়। তিনি বলেন, শুরুতে সংগীত প্রযোজনার বিষয়ে তাঁর খুব বেশি ধারণা ছিল না। খারাপ গান বানাতেন, বন্ধুরা বিরক্ত হতো, এমনকি মা-বাবাও প্রশ্ন করতেন তিনি কী বানাচ্ছেন। তবে তাঁরা উৎসাহ দেওয়া বন্ধ করেননি।
তিনি বলেন, সংগীত ছাড়া অন্য কোনো কিছু তাঁকে তেমন আকর্ষণ করেনি। জীবনের কঠিন সময়েও সংগীতের পথ ছাড়ার কথা ভাবেননি। তাঁর বিশ্বাস, সংগীত এমন একটি ভাষা, যা মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে। সংগ্রামের সবচেয়ে কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সঞ্জয় বলেন, সিলিকন ভ্যালি থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে যাওয়ার পর একসময় বাসাভাড়া দেওয়ার মতো অর্থও তাঁর হাতে ছিল না। এমনকি তাঁর মা-বাবাও বিষয়টি জানতেন না।
তিনি বলেন, যে অ্যাপার্টমেন্টে শেষ পাঁচ বছর ছিলেন, সেখানে মেঝেতেই ঘুমাতেন। কয়েক শ ডলার বাঁচিয়ে সেই অর্থ সংগীত তৈরিতে ব্যয় করতেন। তখন নিজের তৈরি মিউজিক বিটস ১০০ থেকে ১৫০ ডলারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন সেই সময়ের দিকে ফিরে তাকালে পুরো যাত্রাটিকে অসাধারণ মনে হয়।
বিশ্বের বড় কোনো মঞ্চে আবার সুযোগ পেলে নিজের সর্বশেষ বাংলা গান ‘কার জন্য করিলা মায়া’ পরিবেশন করতে চান বলে জানান সঞ্জয়। তাঁর বিশ্বাস, এই গানের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের সংগীতকে নতুনভাবে চিনতে পারবে।
বাংলা গানের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও তুলে ধরেন তিনি। হাবিব ওয়াহিদের ‘রাত নির্ঘুম’ গান তাঁকে আবেগাপ্লুত করে বলে জানান। পাশাপাশি সাগর দেওয়ানের গান এবং নুসরাত ফতেহ আলী খানের কাওয়ালিও নিয়মিত শোনেন। রবিশঙ্করের দীর্ঘ বাদ্যযন্ত্রসংগীতও তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
নিজের নতুন স্বপ্নের কথা জানিয়ে সঞ্জয় বলেন, ঢাকায় একদিন এমন একটি অনুষ্ঠান করতে চান, যেখানে তাঁর মা-বাবা উপস্থিত থেকে দেশের মানুষের ভালোবাসা নিজের চোখে দেখতে পারবেন। সফলতা সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তাঁর কাছে সফলতা মানে মানুষের কাছে ভালো সংগীত পৌঁছে দেওয়া, আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া। তিনি এটিকে আল্লাহর দেওয়া একটি উপহার বলে মনে করেন।
আগামী ১০ বছরের লক্ষ্য সম্পর্কে সঞ্জয় দেব বলেন, তিনি এমন একটি সময় দেখতে চান, যখন বাংলাদেশ অস্কার ও গ্র্যামির মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করবে।












