ঢাকা ১০:১৪ , Tue, ১৫ Sep ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি গবেষকের নেতৃত্বে মহাবিশ্বে নতুন শ্রেণির মহাজাগতিক উৎসের সন্ধান, মিলেছে ৮৪টি ‘হাইপারসফট’ উৎস

আয়ান সরকার
  • প্রকাশঃ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৩৯
  • / 6
বাংলাদেশি গবেষক মুস্তাফা মুহিবুল্লাহর নেতৃত্বে নতুন শ্রেণির মহাজাগতিক উৎস ‘হাইপারসফট এক্স-রে সোর্সেস’ শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা ছবি: প্রজন্ম কথা

আলাবামা, ১৫ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – বাংলাদেশি জ্যোতির্পদার্থবিদ মুস্তাফা মুহিবুল্লাহর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান যৌথ গবেষণায় মহাবিশ্বে নতুন এক শ্রেণির মহাজাগতিক উৎসের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। নতুন এই শ্রেণির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাইপারসফট এক্স-রে সোর্সেস’ বা এইচএসএস।

রুয়েট থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করা মুস্তাফা মুহিবুল্লাহ বর্তমানে অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। গবেষণায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ড. জিমি আরউইন এবং সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ড. রোজান ডি স্টেফানো। তাঁরা গবেষণাটিতে পরামর্শক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

গবেষকেরা নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে ছয়টি গ্যালাক্সিতে মোট ৮৪টি এইচএসএস শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের বড় প্রতিবেশী গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডা বা মেসিয়ের ৩১-এ পাওয়া গেছে ২১টি উৎস। অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ।

আর পৃথিবী থেকে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের পিনহুইল গ্যালাক্সি বা মেসিয়ের ১০১-এ শনাক্ত হয়েছে সাতটি এইচএসএস। গ্যালাক্সিটির চাকতির মতো সর্পিল আকৃতির কারণে এর নাম পিনহুইল গ্যালাক্সি।

অস্বাভাবিকভাবে কম শক্তির এক্স-রে বিকিরণ করায় এই উৎসগুলো এতদিন শনাক্ত করা কঠিন ছিল। গবেষকদের ধারণা, এইচএসএস থেকে বিপুল পরিমাণ চরম অতিবেগুনি রশ্মি বা ইইউভি নির্গত হতে পারে। তবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস এই বিকিরণের বড় অংশ শোষণ করে নেয়। ফলে সরাসরি ইইউভি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এর পরিবর্তে এসব উৎস থেকে আসা ক্ষীণ কম-শক্তির এক্স-রে বিকিরণ বিশ্লেষণ করে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার এক্সএমএম-নিউটন পর্যবেক্ষণাগারের তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এইচএসএস সম্ভবত একটি নির্দিষ্ট ধরনের একক মহাজাগতিক বস্তু নয়। এগুলো সাদা বামন, নিউট্রন তারা কিংবা কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে গঠিত দ্বৈত নক্ষত্রব্যবস্থা হতে পারে। এসব ব্যবস্থায় দুটি মহাজাগতিক বস্তু পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে।

এইচএসএসের কিছু উৎস টাইপ-১এ সুপারনোভার সম্ভাব্য পূর্বসূরি ব্যবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। টাইপ-১এ সুপারনোভা বিস্ফোরণের আগে সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রব্যবস্থা কেমন ছিল, তা জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নতুন আবিষ্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইইউভি বিকিরণ। গবেষকদের ধারণা, এইচএসএস থেকে নির্গত শক্তিশালী ইইউভি গ্যালাক্সির আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসকে আয়নিত করার অন্যতম শক্তির উৎস হতে পারে। এই বিকিরণের শক্তিতে গ্যাসের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে গেলে গ্যাস আয়নিত অবস্থায় পরিণত হয়। আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের গ্যাস মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে গঠিত।

গবেষকেরা মনে করছেন, এতদিন সরাসরি দেখা না গেলেও শক্তিশালী ইইউভি নির্গমনকারী বিপুলসংখ্যক উৎস হয়তো গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যেই ছিল। এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ৮৪টি এইচএসএস প্রকৃত উৎসসমষ্টির খুব ছোট একটি অংশ হতে পারে।

নতুন এই শ্রেণির মহাজাগতিক উৎসের সন্ধান তাই মহাবিশ্বের আড়ালে থাকা ইইউভি বিকিরণজগত সম্পর্কে গবেষকদের নতুন ধারণা দিচ্ছে। একই সঙ্গে টাইপ-১এ সুপারনোভা, গ্যালাক্সির আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের আয়নীকরণ এবং অতিঘন মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

❤️
👏
🙂
😞

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি গবেষকের নেতৃত্বে মহাবিশ্বে নতুন শ্রেণির মহাজাগতিক উৎসের সন্ধান, মিলেছে ৮৪টি ‘হাইপারসফট’ উৎস

প্রকাশঃ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৩৯

আলাবামা, ১৫ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – বাংলাদেশি জ্যোতির্পদার্থবিদ মুস্তাফা মুহিবুল্লাহর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান যৌথ গবেষণায় মহাবিশ্বে নতুন এক শ্রেণির মহাজাগতিক উৎসের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। নতুন এই শ্রেণির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাইপারসফট এক্স-রে সোর্সেস’ বা এইচএসএস।

রুয়েট থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করা মুস্তাফা মুহিবুল্লাহ বর্তমানে অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। গবেষণায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ড. জিমি আরউইন এবং সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ড. রোজান ডি স্টেফানো। তাঁরা গবেষণাটিতে পরামর্শক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

গবেষকেরা নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে ছয়টি গ্যালাক্সিতে মোট ৮৪টি এইচএসএস শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের বড় প্রতিবেশী গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডা বা মেসিয়ের ৩১-এ পাওয়া গেছে ২১টি উৎস। অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ।

আর পৃথিবী থেকে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের পিনহুইল গ্যালাক্সি বা মেসিয়ের ১০১-এ শনাক্ত হয়েছে সাতটি এইচএসএস। গ্যালাক্সিটির চাকতির মতো সর্পিল আকৃতির কারণে এর নাম পিনহুইল গ্যালাক্সি।

অস্বাভাবিকভাবে কম শক্তির এক্স-রে বিকিরণ করায় এই উৎসগুলো এতদিন শনাক্ত করা কঠিন ছিল। গবেষকদের ধারণা, এইচএসএস থেকে বিপুল পরিমাণ চরম অতিবেগুনি রশ্মি বা ইইউভি নির্গত হতে পারে। তবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস এই বিকিরণের বড় অংশ শোষণ করে নেয়। ফলে সরাসরি ইইউভি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এর পরিবর্তে এসব উৎস থেকে আসা ক্ষীণ কম-শক্তির এক্স-রে বিকিরণ বিশ্লেষণ করে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার এক্সএমএম-নিউটন পর্যবেক্ষণাগারের তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এইচএসএস সম্ভবত একটি নির্দিষ্ট ধরনের একক মহাজাগতিক বস্তু নয়। এগুলো সাদা বামন, নিউট্রন তারা কিংবা কৃষ্ণগহ্বরকে কেন্দ্র করে গঠিত দ্বৈত নক্ষত্রব্যবস্থা হতে পারে। এসব ব্যবস্থায় দুটি মহাজাগতিক বস্তু পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে।

এইচএসএসের কিছু উৎস টাইপ-১এ সুপারনোভার সম্ভাব্য পূর্বসূরি ব্যবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। টাইপ-১এ সুপারনোভা বিস্ফোরণের আগে সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রব্যবস্থা কেমন ছিল, তা জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নতুন আবিষ্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইইউভি বিকিরণ। গবেষকদের ধারণা, এইচএসএস থেকে নির্গত শক্তিশালী ইইউভি গ্যালাক্সির আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসকে আয়নিত করার অন্যতম শক্তির উৎস হতে পারে। এই বিকিরণের শক্তিতে গ্যাসের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে গেলে গ্যাস আয়নিত অবস্থায় পরিণত হয়। আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের গ্যাস মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে গঠিত।

গবেষকেরা মনে করছেন, এতদিন সরাসরি দেখা না গেলেও শক্তিশালী ইইউভি নির্গমনকারী বিপুলসংখ্যক উৎস হয়তো গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যেই ছিল। এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ৮৪টি এইচএসএস প্রকৃত উৎসসমষ্টির খুব ছোট একটি অংশ হতে পারে।

নতুন এই শ্রেণির মহাজাগতিক উৎসের সন্ধান তাই মহাবিশ্বের আড়ালে থাকা ইইউভি বিকিরণজগত সম্পর্কে গবেষকদের নতুন ধারণা দিচ্ছে। একই সঙ্গে টাইপ-১এ সুপারনোভা, গ্যালাক্সির আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাসের আয়নীকরণ এবং অতিঘন মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।