বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে গেলেই ৫ হাজার ডলার, যুক্তরাষ্ট্রে বদলাচ্ছে বসবাসের হিসাব
- প্রকাশঃ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৮
- / 5
মুনসি, ইন্ডিয়ানা, ১৫ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষের জন্য ছোট শহরে চলে যাওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সহায়তার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইন্ডিয়ানার মুনসিতে এমন একটি কর্মসূচির আওতায় শহরের বাইরে থেকে যাওয়া নতুন বাসিন্দাদের স্থানান্তর ব্যয়ের জন্য দেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত। এ সুযোগ নিয়ে বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে গিয়ে বাড়ি কিনেছেন একাধিক পরিবার।
তাদের একজন ব্রিয়ানা বেরৌতি। দুই সন্তানকে নিয়ে ওরেগনের পোর্টল্যান্ড থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে মুনসিতে চলে যান তিনি। পোর্টল্যান্ডে আর্থিকভাবে সংকটে থাকা ব্রিয়ানা এখন একই ব্যাংকের দূরবর্তী কর্মী হিসেবে আগের মতোই বছরে ১ লাখ ৭ হাজার ডলার আয় করছেন। তবে নতুন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় কম হওয়ায় তার আর্থিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
পোর্টল্যান্ডে একটি অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ১ হাজার ২৯০ ডলার দিতে হতো তাকে। মুনসিতে একটি নিজস্ব বাড়ি কেনার পর বাড়ির ঋণের কিস্তি, বীমা ও সম্পত্তি কর মিলিয়ে মাসে তার খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১০০ ডলার।
ইন্ডিয়ানায় আয়কর তুলনামূলক কম হওয়া এবং গাড়ির বীমা ও বিদ্যুৎ খরচ কমে যাওয়ায় ব্রিয়ানা জানান, আগের তুলনায় প্রতি মাসে তার প্রায় ৬০০ ডলার সাশ্রয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখন নিজের জীবন উপভোগ করার সুযোগ অনেক বেশি। সন্তানদের প্রয়োজনীয় কিছু কিনে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আগের মতো আর্থিক চাপ অনুভব করেন না। তার ভাষায়, জীবনযাত্রার মানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
ব্রিয়ানার মতো বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে যাওয়ার প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে বাড়ির দাম ও ভাড়া, অনেক মানুষকে কম খরচের এলাকায় যেতে উৎসাহিত করছে।
২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটর্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে বসতি বদলের ক্ষেত্রে মানুষের অন্যতম প্রধান বিবেচনা হলো আবাসনের সামর্থ্য।
করোনা মহামারির পর দূরবর্তীভাবে কাজের সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়ায় বড় শহরের বাইরে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেওয়াও অনেকের জন্য সহজ হয়েছে। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস ও পোর্টল্যান্ডের মতো বড় শহরে জনসংখ্যা কমার বিপরীতে কিছু ছোট শহর ও জনপদ নতুন বাসিন্দা আকর্ষণ করছে।
ইন্ডিয়ানার মুনসির জনসংখ্যাও সাম্প্রতিক সময়ে সামান্য বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার ৪৬৬ জন, যা ২০২০ সালের ৬৫ হাজার ১৯৪ জনের তুলনায় বেশি। তবে ১৯৯০ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ৭১ হাজার ৮২৮ জন।
সিনেমার টিকিট থেকে মদের বোতল
নতুন বাসিন্দাদের আকৃষ্ট করতে মুনসি স্থানীয় পর্যায়ে ৫ হাজার ডলারের স্থানান্তর সহায়তা দিচ্ছে। মূলত ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের বাইরে বসবাসকারী দূরবর্তী কর্মীদের শহরটিতে আনাই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
এ ধরনের বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য একত্র করে প্রচার করে ‘মেকমাইমুভ’ নামের একটি ওয়েবসাইট। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ছোট শহর ও জনপদ সেখানে নতুন বাসিন্দাদের দেওয়া আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধার তালিকা প্রকাশ করে। এসব শহর ওয়েবসাইটটিকে সাবস্ক্রিপশন ফি দেয়।
শহরভেদে সুবিধার ধরনও আলাদা। কোথাও নগদ অর্থের পাশাপাশি বিনামূল্যে সিনেমার টিকিট, রেস্তোরাঁর ভাউচার, জিমের সদস্যপদ, গলফ খেলার সুযোগ এমনকি বিনামূল্যে মদের বোতলও দেওয়া হয়।
মেকমাইমুভের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তাদের কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ হাজার মানুষ নতুন জায়গায় বসতি বদল করেছেন। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা ১ হাজার ৫০০-তে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে।
মুনসির কর্মসূচির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ পরিবার শহরটিতে বসতি গড়েছে। ব্রিয়ানাও জানান, সেখানে যাওয়ার আগে শহরটির নাম তিনি কখনো শোনেননি।
সান দিয়েগো ছেড়ে ইলিনয়ে বাড়ি
বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে যাওয়ার আরেক উদাহরণ এলেনা ক্রিসোস্তোমু। পেশায় বিজ্ঞানী এলেনা ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ছেড়ে ইলিনয়ের গ্রামীণ এলাকার জ্যাকসনভিলে চলে যান। শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৭০০।
তার স্থানান্তরে সহায়তা করেছে জ্যাকসনভিল রিজিওনাল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি তাকে ৫ হাজার ডলার নগদ সহায়তার পাশাপাশি প্রায় ৪ হাজার ডলারের একটি জীবনযাত্রা সহায়তা প্যাকেজ দেয়। এর মধ্যে জিমের সদস্যপদ ও গলফ খেলার সুবিধাও ছিল।
সান দিয়েগোতে এক বেডরুমের একটি অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বাবদ এলেনাকে মাসে প্রায় ৩ হাজার ডলার দিতে হতো। জ্যাকসনভিলে গিয়ে তিনি তিন বেডরুমের একটি বাড়ি কিনেছেন, যার মাসিক ঋণের কিস্তি ১ হাজার ৮৬৮ ডলার।
এর সঙ্গে চাকরি পরিবর্তনের পর তার বার্ষিক আয় ২২ শতাংশ বেড়েছে। কর্মস্থলে যাতায়াতের সময়ও ১৫ মিনিটের গাড়ি যাত্রা থেকে কমে প্রায় এক মিনিটে নেমে এসেছে।
এলেনা বলেন, একা নিজের বাড়ি কেনার সামর্থ্য হবে বলে তিনি আগে কখনো ভাবেননি। সান দিয়েগোর মতো ব্যয়বহুল শহরে বাড়ি কেনার জন্য সঙ্গীর প্রয়োজন হবে বলে মনে করতেন তিনি। নতুন শহরে নিজের বাড়ি থাকায় তার মধ্যে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অনুভূতি বেড়েছে।
তবে বড় শহর ছেড়ে ছোট শহরে যাওয়ার কিছু অসুবিধাও রয়েছে। ব্রিয়ানা ও এলেনা দুজনেই জানান, নতুন এলাকায় বিনোদনের সুযোগ, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বৈচিত্র্য তুলনামূলক কম। পরিবার ও বন্ধুদের ছেড়ে আসাও তাদের জন্য কঠিন হয়েছে।
ব্রিয়ানার ক্ষেত্রে সন্তানদের নতুন স্কুলে মানিয়ে নেওয়াও চ্যালেঞ্জ ছিল। পোর্টল্যান্ডে তিনি হেঁটে পার্ক ও দোকানে যেতে পারতেন, কিন্তু মুনসিতে চলাচলের জন্য এখন তাকে গাড়ির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
তারপরও নতুন জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ব্রিয়ানা। তিনি জানান, জীবনে এর আগে কখনো এত বেশি সঞ্চয় করতে পারেননি। নিজের বাড়ির মালিক হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের সঙ্গে এখন এমন কিছু করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না। এমনকি তার ছোট সন্তানের জীবনে প্রথমবারের মতো পুরো পরিবার ছুটিতেও যেতে পেরেছে।



























