ঢাকা ১২:০৯ , Wed, ১৯ Aug ২০২৬

কিম জং উনের সঙ্গে আবারও ঘনিষ্ঠ হতে চাইছেন ট্রাম্প, লক্ষ্য কি দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপ দেওয়া?

এ্যানী রহমান
  • প্রকাশঃ ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৪
  • / 4
গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রসিকতা করে বলেছিলেন যে, তিনি এবং উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উন একে অপরের "প্রেমে পড়ে গেছেন" ছবি: এএফপি

ওয়াশিংটন, ১৯ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সমালোচনা করে দেশটির সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, কিমের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক যেমন ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি জোরালো করতে পারে, তেমনি দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আরও সহযোগিতায় চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে।

সোমবার ট্রাম্প বলেন, কিম তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগের উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ‘খুব ইতিবাচক’ আলোচনা হয়েছে। এর এক দিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমাতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দেন তিনি। প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করা ট্রাম্প দাবি করেন, কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোরীয় উপদ্বীপকে অনেক বেশি নিরাপদ করেছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী শরতে কিমের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করতে সহযোগীদের চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন বৈঠক হলে তা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ এখনো অমীমাংসিত এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কিমের সঙ্গে একটি শীর্ষ বৈঠক হলে তার ফলাফল যা-ই হোক, ট্রাম্প সেটিকে নিজের কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।

তবে কিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার উদ্যোগের পেছনে দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপ দেওয়ার কৌশলও থাকতে পারে। ওয়াশিংটনের হেনরি জ্যাকসন স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কোরিয়া স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ইয়ং-চুল হা আল জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে দক্ষিণ কোরিয়ার অনাগ্রহ এবং যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে ট্রাম্প সিউলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইতে পারেন।

তাঁর মতে, দুই দেশের সামরিক জোট বহাল থাকলেও এই পদক্ষেপকে এক ধরনের পাল্টা-পদক্ষেপভিত্তিক কূটনীতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের সম্পর্কের শুরু যেভাবে

২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্রে স্থাপনযোগ্য ছোট আকারের পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করেছে এমন খবর প্রকাশের পর কিমের দেশকে ‘আগুন ও ক্রোধের’ হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এর এক বছর পর ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে কিমের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়ে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছিল। তবে ২০১৯ সালে হ্যানয় এবং পরে কোরীয় অসামরিকীকরণ অঞ্চলে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো সেই সমঝোতাকে এগিয়ে নিতে পারেনি।

হ্যানয় বৈঠকের পরও ট্রাম্প কিমের সঙ্গে যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি। এমনকি তিনি উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে পা রাখা প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন। এরপর উত্তর কোরিয়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। তবু ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হুমকিমুক্ত ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক।

ইয়ং-চুল হা মনে করেন, হ্যানয় বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পেছনে ট্রাম্পের নিজের প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার চাপ ভূমিকা রেখেছিল বলে তিনি মনে করতে পারেন। তাঁর সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন উত্তর কোরিয়ার পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে দেশটির সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বিবেচনার কথা বলেছিলেন।

হা বলেন, এবার এমন বাধা না থাকলে ট্রাম্প কিমের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন বলে মনে করতে পারেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর কারণ কী

রোববার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়াকে ‘অনুপযুক্ত ও বৈরী’ আখ্যা দিয়ে তা কমানোর নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান ট্রাম্প।

পরে ওভাল অফিসে তিনি এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতার বিষয়টি যুক্ত করেন। ট্রাম্প বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে না, তাদের সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ দিনের ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা জোরদার করতে দেশটিতে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই এই সামরিক উপস্থিতি বজায় রয়েছে। ওই যুদ্ধ একটি শান্তিচুক্তির পরিবর্তে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল।

যৌথ মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, উত্তর কোরিয়াকে প্রতিরোধে সিউল ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে পিয়ংইয়ং এসব মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে দেখে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিদ ইউজিন পার্কের মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত কৌশলগত অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে সেনাদের প্রস্তুতি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

পার্ক বলেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত কোরীয় উপদ্বীপের কূটনীতির বৃহত্তর পরিবেশও বদলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরেকটি বড় সংকট তৈরি হোক, এমন পরিস্থিতি এড়ানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের এখন বাড়তি আগ্রহ রয়েছে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্টিমসন সেন্টারের কোরিয়া কর্মসূচি এবং ৩৮ নর্থের জ্যেষ্ঠ ফেলো র‍্যাচেল মিনইয়ং লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ দ্রুত বাড়াতে এবং দুই দেশের সামরিক ব্যয় ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সিউলের অংশ বাড়ানোর ভিত্তি তৈরিতে ট্রাম্প যৌথ সামরিক মহড়াকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারেন।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক জোটকে এমন কাঠামোয় নিতে চাইছেন, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সিউলের দায়িত্ব আরও বাড়বে। প্রথম মেয়াদে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা রাখার খরচে দেশটির অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও একই ধরনের টানাপোড়েন রয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন দুই দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি পুনর্গঠন করে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাতের ওপর শুল্ক আরোপ করে। একপর্যায়ে ওয়াশিংটন ২৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেও পরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তা ১৫ শতাংশে নামানো হয়।

পরে চুক্তি বাস্তবায়নে সিউলের ধীরগতির অভিযোগ তুলে ট্রাম্প আবারও উচ্চ শুল্কের হুমকি দেন। মিনইয়ং লির মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের হতাশার কারণ হতে পারে।

কিম কি এবার ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেবেন?

তবে কিম জং উন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসতে কতটা আগ্রহী, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। মিনইয়ং লির মতে, উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো বিশ্বাস করে না। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পিয়ংইয়ং ওয়াশিংটনকে অবিশ্বস্ত এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

চলতি বছরের শুরুতে কিম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পূর্বশর্ত হলো ওয়াশিংটনকে উত্তর কোরিয়ার ‘সাংবিধানিক মর্যাদা’ স্বীকার করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে।

মিনইয়ং লির মতে, কিমের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে ট্রাম্প যতই আগ্রহী হন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক রাষ্ট্রের মর্যাদা স্বীকার করা তাঁর জন্য বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে।

তাঁর বিশ্লেষণে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছেন। একদিকে সিউলের ওপর চাপ তৈরি করা, অন্যদিকে কিমসহ আন্তর্জাতিক মহলকে জানানো যে তিনি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী।

❤️
👏
🙂
😞

কিম জং উনের সঙ্গে আবারও ঘনিষ্ঠ হতে চাইছেন ট্রাম্প, লক্ষ্য কি দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপ দেওয়া?

প্রকাশঃ ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৪

ওয়াশিংটন, ১৯ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সমালোচনা করে দেশটির সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, কিমের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক যেমন ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি জোরালো করতে পারে, তেমনি দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আরও সহযোগিতায় চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে।

সোমবার ট্রাম্প বলেন, কিম তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগের উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ‘খুব ইতিবাচক’ আলোচনা হয়েছে। এর এক দিন আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমাতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দেন তিনি। প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করা ট্রাম্প দাবি করেন, কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোরীয় উপদ্বীপকে অনেক বেশি নিরাপদ করেছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী শরতে কিমের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করতে সহযোগীদের চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন বৈঠক হলে তা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ এখনো অমীমাংসিত এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কিমের সঙ্গে একটি শীর্ষ বৈঠক হলে তার ফলাফল যা-ই হোক, ট্রাম্প সেটিকে নিজের কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।

তবে কিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার উদ্যোগের পেছনে দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপ দেওয়ার কৌশলও থাকতে পারে। ওয়াশিংটনের হেনরি জ্যাকসন স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কোরিয়া স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ইয়ং-চুল হা আল জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে দক্ষিণ কোরিয়ার অনাগ্রহ এবং যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে ট্রাম্প সিউলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইতে পারেন।

তাঁর মতে, দুই দেশের সামরিক জোট বহাল থাকলেও এই পদক্ষেপকে এক ধরনের পাল্টা-পদক্ষেপভিত্তিক কূটনীতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের সম্পর্কের শুরু যেভাবে

২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্রে স্থাপনযোগ্য ছোট আকারের পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করেছে এমন খবর প্রকাশের পর কিমের দেশকে ‘আগুন ও ক্রোধের’ হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এর এক বছর পর ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে কিমের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়ে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছিল। তবে ২০১৯ সালে হ্যানয় এবং পরে কোরীয় অসামরিকীকরণ অঞ্চলে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো সেই সমঝোতাকে এগিয়ে নিতে পারেনি।

হ্যানয় বৈঠকের পরও ট্রাম্প কিমের সঙ্গে যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি। এমনকি তিনি উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে পা রাখা প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন। এরপর উত্তর কোরিয়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। তবু ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, কিমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হুমকিমুক্ত ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক।

ইয়ং-চুল হা মনে করেন, হ্যানয় বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পেছনে ট্রাম্পের নিজের প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার চাপ ভূমিকা রেখেছিল বলে তিনি মনে করতে পারেন। তাঁর সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন উত্তর কোরিয়ার পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে দেশটির সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বিবেচনার কথা বলেছিলেন।

হা বলেন, এবার এমন বাধা না থাকলে ট্রাম্প কিমের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন বলে মনে করতে পারেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর কারণ কী

রোববার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়াকে ‘অনুপযুক্ত ও বৈরী’ আখ্যা দিয়ে তা কমানোর নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান ট্রাম্প।

পরে ওভাল অফিসে তিনি এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতার বিষয়টি যুক্ত করেন। ট্রাম্প বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে না, তাদের সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ দিনের ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা জোরদার করতে দেশটিতে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই এই সামরিক উপস্থিতি বজায় রয়েছে। ওই যুদ্ধ একটি শান্তিচুক্তির পরিবর্তে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল।

যৌথ মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, উত্তর কোরিয়াকে প্রতিরোধে সিউল ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে পিয়ংইয়ং এসব মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে দেখে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিদ ইউজিন পার্কের মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত কৌশলগত অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে সেনাদের প্রস্তুতি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

পার্ক বলেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত কোরীয় উপদ্বীপের কূটনীতির বৃহত্তর পরিবেশও বদলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরেকটি বড় সংকট তৈরি হোক, এমন পরিস্থিতি এড়ানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের এখন বাড়তি আগ্রহ রয়েছে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্টিমসন সেন্টারের কোরিয়া কর্মসূচি এবং ৩৮ নর্থের জ্যেষ্ঠ ফেলো র‍্যাচেল মিনইয়ং লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ দ্রুত বাড়াতে এবং দুই দেশের সামরিক ব্যয় ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সিউলের অংশ বাড়ানোর ভিত্তি তৈরিতে ট্রাম্প যৌথ সামরিক মহড়াকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারেন।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক জোটকে এমন কাঠামোয় নিতে চাইছেন, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সিউলের দায়িত্ব আরও বাড়বে। প্রথম মেয়াদে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা রাখার খরচে দেশটির অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও একই ধরনের টানাপোড়েন রয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন দুই দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি পুনর্গঠন করে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাতের ওপর শুল্ক আরোপ করে। একপর্যায়ে ওয়াশিংটন ২৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেও পরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তা ১৫ শতাংশে নামানো হয়।

পরে চুক্তি বাস্তবায়নে সিউলের ধীরগতির অভিযোগ তুলে ট্রাম্প আবারও উচ্চ শুল্কের হুমকি দেন। মিনইয়ং লির মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের হতাশার কারণ হতে পারে।

কিম কি এবার ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেবেন?

তবে কিম জং উন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসতে কতটা আগ্রহী, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। মিনইয়ং লির মতে, উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো বিশ্বাস করে না। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পিয়ংইয়ং ওয়াশিংটনকে অবিশ্বস্ত এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

চলতি বছরের শুরুতে কিম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পূর্বশর্ত হলো ওয়াশিংটনকে উত্তর কোরিয়ার ‘সাংবিধানিক মর্যাদা’ স্বীকার করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে।

মিনইয়ং লির মতে, কিমের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে ট্রাম্প যতই আগ্রহী হন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক রাষ্ট্রের মর্যাদা স্বীকার করা তাঁর জন্য বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে।

তাঁর বিশ্লেষণে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছেন। একদিকে সিউলের ওপর চাপ তৈরি করা, অন্যদিকে কিমসহ আন্তর্জাতিক মহলকে জানানো যে তিনি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী।