ঢাকা ০৩:০১ , Sat, ০৫ Sep ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র
নিউইয়র্ক

নিউইয়র্কে কিশোর গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোররা

নিজস্ব প্রতিবেদক । নিউইয়র্ক
  • প্রকাশঃ ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৮
  • / 2
নিউইয়র্কে কিশোর সহিংসতা ও গ্যাং কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান ফাইল ছবি

নিউইয়র্ক, ৫ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে কিশোর গ্যাং নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া ও সদ্য কৈশোর পেরোনো কিছু তরুণ সংঘবদ্ধ মারামারি, ছিনতাই, ডাকাতি, অস্ত্র বহন, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ওপর হামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্ক পুলিশের অভিযানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজন কিশোর ও তরুণ গ্রেপ্তারের তথ্যও সামনে এসেছে। তবে সমস্যাটি কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিউইয়র্ক পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির একাধিক মামলার নথি দেখাচ্ছে, শহরে সামগ্রিক বন্দুক সহিংসতা কমলেও গুলির ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততার অনুপাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

২০২৫ সালে নিউইয়র্কে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের ১৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে গুলি চালানোর ঘটনায় সন্দেহভাজন বা অভিযুক্তদের ১৮ শতাংশই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। ২০১৮ সালে এই তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর দুই ক্ষেত্রেই এটিই সর্বোচ্চ অনুপাত। নিউইয়র্ক পুলিশ বলছে, শহরে গুলির ঘটনা ও গুলিতে হতাহতের সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে কমলেও তরুণদের সম্পৃক্ততা আলাদা করে নজর দেওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে শহরে গুলির ঘটনা কমার পাশাপাশি কিশোরদের জন্য স্কুল নিরাপত্তা অঞ্চল চালুর মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়।

কিশোরদের কীভাবে অপরাধী চক্রের সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির ৩০ জুনের মামলায়। ওই দিন কুইন্সের প্রসিকিউটররা কথিত ব্লিটজ গ্যাং-৪-এর ২২ সদস্যের বিরুদ্ধে ৯৭ দফা অভিযোগপত্রের কথা জানান। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে এই গ্যাং ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সংঘর্ষে ১১টি গুলির ঘটনা এবং একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ ক্যামব্রিয়া হাইটসের একটি ম্যাকডোনাল্ডসের পার্কিং লটে বিরোধের সময় অভিযুক্ত এক সদস্য ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুলি করার নির্দেশ দেন। এরপর ওই কিশোর একাধিক গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ এবং আসামিরা দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

কিশোর সহিংসতার চিত্র অবশ্য কথিত গ্যাং সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের মে মাসে ফ্লাশিংয়ের কিসেনা পার্কে দুই কিশোরকে বনের ভেতর নিয়ে গিয়ে বেসবল ব্যাট দিয়ে মারধর, লাথি ও ঘুষি মারা এবং একজনকে অচেতন করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সাতজন ১৭ বছর বয়সী কিশোরকে হত্যাচেষ্টাসহ গুরুতর হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করে কুইন্সের প্রসিকিউটররা। একইভাবে, এস্টোরিয়ার একটি সাবওয়ে স্টেশনে ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে একটি দল টেজার দিয়ে আঘাত, লাথি, ঘুষি ও পদদলিত করার অভিযোগে দুই ১৬ বছর বয়সী কিশোরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীরা একই উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল কুইন্সের রয় উইলকিনস পার্কে ১৫ বছর বয়সী জাদেন পিয়েরের মৃত্যুর ঘটনাটিও কিশোর সহিংসতার ভয়াবহ দিক সামনে আনে। কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি জলকেলির অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক কিশোর জড়ো হয়েছিল। সেখানে জাদেনকে কয়েকজন কিশোর মারধর করার পর ১৮ বছর বয়সী জাহির ডেভিস তাকে গুলি করেন বলে অভিযোগ। পরে ডেভিসের বিরুদ্ধে হত্যা, গ্যাং অ্যাসল্ট ও অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোরের বিরুদ্ধেও হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি বিচারাধীন।

এই ঘটনাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। নিউইয়র্কের আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রাম পোস্ট, ভিডিও, গান, অনলাইন অপমান ও প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া বার্তা কখনো কখনো বাস্তব জীবনের সংঘর্ষকে আরও তীব্র করে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কাউকে নিয়ে ব্যঙ্গ, নিহত কাউকে নিয়ে অপমানজনক পোস্ট, গুলি চালানোর ইঙ্গিতপূর্ণ চিহ্ন কিংবা তথাকথিত ড্রিল-র‍্যাপ ভিডিওর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। কুইন্সে ব্লিটজ গ্যাং-৪ ও ফ্লস মানি বলারসের সংঘর্ষের তদন্তেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংগীতভিত্তিক ভিডিওর মাধ্যমে উসকানির বিষয়টি সামনে এসেছে।

ফলে কিশোরদের কাছে গ্যাংয়ের ‘এলাকা’ এখন অনেক সময় একটি রাস্তার মোড় বা নির্দিষ্ট ব্লকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনলাইন বন্ধুত্ব, একই স্কুল, একই আবাসিক এলাকা, একই বন্ধুমহল কিংবা একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিসর থেকেও ছোট ছোট দল তৈরি হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিরোধ কোনো এক পর্যায়ে পুরো বন্ধুমহলের বিরোধে পরিণত হতে পারে। একজনের ওপর হামলার পর বন্ধুরা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, এরপর প্রতিপক্ষের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সংঘর্ষ আরও বড় হতে পারে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও কুইন্সে ফ্লস মানি বলারসের ১২ কথিত সদস্যের বিরুদ্ধে ৩৩ দফা অভিযোগ আনা হয়েছিল। কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানিয়েছিল, ওই গোষ্ঠী ও ব্লিটজ গ্যাং-৪-এর দীর্ঘদিনের বিরোধের সঙ্গে একাধিক গুলির ঘটনা জড়িত। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্প্রিংফিল্ড গার্ডেনসের একটি ম্যাকডোনাল্ডসের বাইরে ১৮ বছর বয়সী আকিম সিসেকে গুলি করে হত্যার পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বাড়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি জনসংখ্যার বড় অংশ কুইন্স ও ব্রুকলিনে বসবাস করে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বহু বাংলাদেশি শিশু-কিশোর এখানকার পাবলিক স্কুলে বড় হচ্ছে। তাঁদের অধিকাংশই স্বাভাবিক শিক্ষা, পরিবার ও কমিউনিটি জীবনের সঙ্গে যুক্ত। কয়েকজন কিশোরের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে পুরো বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি সমস্যাটিকে উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হলো, গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার শুরুটা অনেক সময় প্রকাশ্য অপরাধ দিয়ে হয় না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়া, স্কুলে অনুপস্থিতি বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ নতুন ও গোপন বন্ধুমহল তৈরি হওয়া, বাড়ির বাইরে রাত কাটানো, অজানা উৎস থেকে টাকা বা দামি জিনিস পাওয়া, মারামারির ভিডিও ধারণ, অস্ত্রের ছবি বা গ্যাং-সম্পর্কিত প্রতীক পোস্ট করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি বা অপমানের মতো একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে একটি লক্ষণ দেখেই কোনো কিশোরকে গ্যাং সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।

আইনের ক্ষেত্রেও বয়স নিয়ে অনেকের ধারণা সংশোধনের প্রয়োজন আছে। নিউইয়র্কের ‘রেইজ দ্য এজ’ আইনের আওতায় সাধারণভাবে ফৌজদারি বিচারে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনার বয়স ১৮ করা হয়েছে। ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অনেক অপরাধের বিচার কিশোর বিচারব্যবস্থার আওতায় হতে পারে। তবে গুরুতর সহিংস অপরাধ ও অস্ত্র-সম্পর্কিত নির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে মামলা ফৌজদারি আদালতেই পরিচালিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে একটি অস্ত্র বহন, গুলি চালানো বা গুরুতর দলবদ্ধ হামলা একজন কিশোরের ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী আইনি প্রভাব ফেলতে পারে। নিউইয়র্ক সিটির সাম্প্রতিক নীতিগত তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে শহরের মোট ফেলোনি ও সহিংস ফেলোনি গ্রেপ্তারে তরুণদের অংশ ২০১৮ সালের তুলনায় বাড়েনি। অর্থাৎ সব কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এমন তথ্য নেই। উদ্বেগের জায়গাটি হলো, অল্প একটি অংশের মধ্যে গুরুতর সহিংসতার সম্পৃক্ততা।

একই সঙ্গে কিশোরদের আরেকটি পরিচয়ও মনে রাখা জরুরি: তারা অনেক সময় অপরাধের শিকারও হচ্ছে। নিউইয়র্ক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গুলিতে আহতদের ১৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। ফলে কিশোর সহিংসতার আলোচনায় অপরাধী হিসেবে তরুণদের দেখার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্পর্ক, স্কুল, মানসিক সহায়তা, সামাজিক পরিবেশ এবং সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন।

নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক গ্যাং মামলাগুলোও দেখাচ্ছে, পুলিশি অভিযান একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। ২০২৫ সালের কুইন্সের একটি বড় গ্যাং তদন্তে প্রসিকিউটররা দেখিয়েছিলেন, একটি পুরোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেপ্তারের পর তৈরি হওয়া শূন্যস্থান নতুন দলগুলো পূরণ করেছিল। অর্থাৎ একটি গ্যাং ভেঙে দেওয়ার পর একই সামাজিক পরিবেশে নতুন দল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

তাই প্রশ্নটা কেবল একজন কিশোরের হাতে অস্ত্র পৌঁছানোর পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, তার অনেক আগে পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটি কীভাবে তার পরিবর্তন বুঝতে পারবে। একজন ১৪ বা ১৫ বছরের কিশোর কেন এমন একটি দলের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা খুঁজছে, যেখানে ‘সম্মান’ প্রমাণের অর্থ হয়ে উঠছে কাউকে মারধর করা বা অস্ত্র বহন করা? কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মন্তব্য বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও বাস্তব জীবনে প্রতিশোধের কারণ হয়ে উঠছে? আর কেন অনেক অভিভাবক সন্তানের গ্রেপ্তারের পর জানতে পারছেন, সে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের অগোচরে অন্য এক সামাজিক পরিসরে চলাফেরা করছিল?

এখানে পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তরুণদের নিয়ে কাজ করা সেবামূলক সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে ফেরানোর সবচেয়ে কার্যকর সময় অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে ওঠার আগেই। বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, পরামর্শ ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের মতো বিকল্প পথ তৈরি করা তাই প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলোও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করা এবং প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় জিজ্ঞেস করার পাশাপাশি সে কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কী দেখছে, কী পোস্ট করছে এবং আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি পরিবারের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, বহুজাতিক পরিবেশের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে অনেক পরিবার যথেষ্ট কার্যকর হতে পারছে না। বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতেও নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি কম বলে তিনি মনে করেন। অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজনের ধরন ও দীর্ঘ বক্তৃতাকেন্দ্রিক পরিবেশ অনেক তরুণকে আগ্রহ হারাতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এই দূরত্বের সুযোগে কিছু কিশোর অন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।

নিউইয়র্কের কিশোর গ্যাং সমস্যা তাই কোনো একটি কমিউনিটির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শহরের সামগ্রিক তথ্য একদিকে বলছে, কিশোর অপরাধীদের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত সাধারণীকরণের ভিত্তি নেই; অন্যদিকে বন্দুক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততার অনুপাত যে উদ্বেগের বিষয়, সেটিও স্পষ্ট। এই দুই দিক একসঙ্গে বিবেচনা করেই পরিবার ও কমিউনিটির জন্য প্রতিরোধ, সচেতনতা ও তরুণদের ইতিবাচক সামাজিক পরিসরে যুক্ত করার উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।

❤️
👏
🙂
😞

নিউইয়র্কে কিশোর গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোররা

প্রকাশঃ ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৮

নিউইয়র্ক, ৫ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে কিশোর গ্যাং নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া ও সদ্য কৈশোর পেরোনো কিছু তরুণ সংঘবদ্ধ মারামারি, ছিনতাই, ডাকাতি, অস্ত্র বহন, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ওপর হামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্ক পুলিশের অভিযানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজন কিশোর ও তরুণ গ্রেপ্তারের তথ্যও সামনে এসেছে। তবে সমস্যাটি কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিউইয়র্ক পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির একাধিক মামলার নথি দেখাচ্ছে, শহরে সামগ্রিক বন্দুক সহিংসতা কমলেও গুলির ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততার অনুপাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

২০২৫ সালে নিউইয়র্কে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের ১৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে গুলি চালানোর ঘটনায় সন্দেহভাজন বা অভিযুক্তদের ১৮ শতাংশই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। ২০১৮ সালে এই তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর দুই ক্ষেত্রেই এটিই সর্বোচ্চ অনুপাত। নিউইয়র্ক পুলিশ বলছে, শহরে গুলির ঘটনা ও গুলিতে হতাহতের সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে কমলেও তরুণদের সম্পৃক্ততা আলাদা করে নজর দেওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে শহরে গুলির ঘটনা কমার পাশাপাশি কিশোরদের জন্য স্কুল নিরাপত্তা অঞ্চল চালুর মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়।

কিশোরদের কীভাবে অপরাধী চক্রের সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির ৩০ জুনের মামলায়। ওই দিন কুইন্সের প্রসিকিউটররা কথিত ব্লিটজ গ্যাং-৪-এর ২২ সদস্যের বিরুদ্ধে ৯৭ দফা অভিযোগপত্রের কথা জানান। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে এই গ্যাং ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সংঘর্ষে ১১টি গুলির ঘটনা এবং একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ ক্যামব্রিয়া হাইটসের একটি ম্যাকডোনাল্ডসের পার্কিং লটে বিরোধের সময় অভিযুক্ত এক সদস্য ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুলি করার নির্দেশ দেন। এরপর ওই কিশোর একাধিক গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ এবং আসামিরা দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

কিশোর সহিংসতার চিত্র অবশ্য কথিত গ্যাং সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের মে মাসে ফ্লাশিংয়ের কিসেনা পার্কে দুই কিশোরকে বনের ভেতর নিয়ে গিয়ে বেসবল ব্যাট দিয়ে মারধর, লাথি ও ঘুষি মারা এবং একজনকে অচেতন করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সাতজন ১৭ বছর বয়সী কিশোরকে হত্যাচেষ্টাসহ গুরুতর হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করে কুইন্সের প্রসিকিউটররা। একইভাবে, এস্টোরিয়ার একটি সাবওয়ে স্টেশনে ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে একটি দল টেজার দিয়ে আঘাত, লাথি, ঘুষি ও পদদলিত করার অভিযোগে দুই ১৬ বছর বয়সী কিশোরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীরা একই উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল কুইন্সের রয় উইলকিনস পার্কে ১৫ বছর বয়সী জাদেন পিয়েরের মৃত্যুর ঘটনাটিও কিশোর সহিংসতার ভয়াবহ দিক সামনে আনে। কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি জলকেলির অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক কিশোর জড়ো হয়েছিল। সেখানে জাদেনকে কয়েকজন কিশোর মারধর করার পর ১৮ বছর বয়সী জাহির ডেভিস তাকে গুলি করেন বলে অভিযোগ। পরে ডেভিসের বিরুদ্ধে হত্যা, গ্যাং অ্যাসল্ট ও অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোরের বিরুদ্ধেও হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি বিচারাধীন।

এই ঘটনাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। নিউইয়র্কের আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রাম পোস্ট, ভিডিও, গান, অনলাইন অপমান ও প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া বার্তা কখনো কখনো বাস্তব জীবনের সংঘর্ষকে আরও তীব্র করে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কাউকে নিয়ে ব্যঙ্গ, নিহত কাউকে নিয়ে অপমানজনক পোস্ট, গুলি চালানোর ইঙ্গিতপূর্ণ চিহ্ন কিংবা তথাকথিত ড্রিল-র‍্যাপ ভিডিওর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। কুইন্সে ব্লিটজ গ্যাং-৪ ও ফ্লস মানি বলারসের সংঘর্ষের তদন্তেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংগীতভিত্তিক ভিডিওর মাধ্যমে উসকানির বিষয়টি সামনে এসেছে।

ফলে কিশোরদের কাছে গ্যাংয়ের ‘এলাকা’ এখন অনেক সময় একটি রাস্তার মোড় বা নির্দিষ্ট ব্লকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনলাইন বন্ধুত্ব, একই স্কুল, একই আবাসিক এলাকা, একই বন্ধুমহল কিংবা একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিসর থেকেও ছোট ছোট দল তৈরি হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিরোধ কোনো এক পর্যায়ে পুরো বন্ধুমহলের বিরোধে পরিণত হতে পারে। একজনের ওপর হামলার পর বন্ধুরা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে, এরপর প্রতিপক্ষের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সংঘর্ষ আরও বড় হতে পারে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও কুইন্সে ফ্লস মানি বলারসের ১২ কথিত সদস্যের বিরুদ্ধে ৩৩ দফা অভিযোগ আনা হয়েছিল। কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানিয়েছিল, ওই গোষ্ঠী ও ব্লিটজ গ্যাং-৪-এর দীর্ঘদিনের বিরোধের সঙ্গে একাধিক গুলির ঘটনা জড়িত। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্প্রিংফিল্ড গার্ডেনসের একটি ম্যাকডোনাল্ডসের বাইরে ১৮ বছর বয়সী আকিম সিসেকে গুলি করে হত্যার পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বাড়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি জনসংখ্যার বড় অংশ কুইন্স ও ব্রুকলিনে বসবাস করে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বহু বাংলাদেশি শিশু-কিশোর এখানকার পাবলিক স্কুলে বড় হচ্ছে। তাঁদের অধিকাংশই স্বাভাবিক শিক্ষা, পরিবার ও কমিউনিটি জীবনের সঙ্গে যুক্ত। কয়েকজন কিশোরের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে পুরো বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি সমস্যাটিকে উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হলো, গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার শুরুটা অনেক সময় প্রকাশ্য অপরাধ দিয়ে হয় না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়া, স্কুলে অনুপস্থিতি বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ নতুন ও গোপন বন্ধুমহল তৈরি হওয়া, বাড়ির বাইরে রাত কাটানো, অজানা উৎস থেকে টাকা বা দামি জিনিস পাওয়া, মারামারির ভিডিও ধারণ, অস্ত্রের ছবি বা গ্যাং-সম্পর্কিত প্রতীক পোস্ট করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি বা অপমানের মতো একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে একটি লক্ষণ দেখেই কোনো কিশোরকে গ্যাং সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।

আইনের ক্ষেত্রেও বয়স নিয়ে অনেকের ধারণা সংশোধনের প্রয়োজন আছে। নিউইয়র্কের ‘রেইজ দ্য এজ’ আইনের আওতায় সাধারণভাবে ফৌজদারি বিচারে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনার বয়স ১৮ করা হয়েছে। ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অনেক অপরাধের বিচার কিশোর বিচারব্যবস্থার আওতায় হতে পারে। তবে গুরুতর সহিংস অপরাধ ও অস্ত্র-সম্পর্কিত নির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে মামলা ফৌজদারি আদালতেই পরিচালিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে একটি অস্ত্র বহন, গুলি চালানো বা গুরুতর দলবদ্ধ হামলা একজন কিশোরের ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী আইনি প্রভাব ফেলতে পারে। নিউইয়র্ক সিটির সাম্প্রতিক নীতিগত তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে শহরের মোট ফেলোনি ও সহিংস ফেলোনি গ্রেপ্তারে তরুণদের অংশ ২০১৮ সালের তুলনায় বাড়েনি। অর্থাৎ সব কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এমন তথ্য নেই। উদ্বেগের জায়গাটি হলো, অল্প একটি অংশের মধ্যে গুরুতর সহিংসতার সম্পৃক্ততা।

একই সঙ্গে কিশোরদের আরেকটি পরিচয়ও মনে রাখা জরুরি: তারা অনেক সময় অপরাধের শিকারও হচ্ছে। নিউইয়র্ক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গুলিতে আহতদের ১৪ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। ফলে কিশোর সহিংসতার আলোচনায় অপরাধী হিসেবে তরুণদের দেখার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্পর্ক, স্কুল, মানসিক সহায়তা, সামাজিক পরিবেশ এবং সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন।

নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক গ্যাং মামলাগুলোও দেখাচ্ছে, পুলিশি অভিযান একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে পারে, কিন্তু সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। ২০২৫ সালের কুইন্সের একটি বড় গ্যাং তদন্তে প্রসিকিউটররা দেখিয়েছিলেন, একটি পুরোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেপ্তারের পর তৈরি হওয়া শূন্যস্থান নতুন দলগুলো পূরণ করেছিল। অর্থাৎ একটি গ্যাং ভেঙে দেওয়ার পর একই সামাজিক পরিবেশে নতুন দল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

তাই প্রশ্নটা কেবল একজন কিশোরের হাতে অস্ত্র পৌঁছানোর পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, তার অনেক আগে পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটি কীভাবে তার পরিবর্তন বুঝতে পারবে। একজন ১৪ বা ১৫ বছরের কিশোর কেন এমন একটি দলের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা খুঁজছে, যেখানে ‘সম্মান’ প্রমাণের অর্থ হয়ে উঠছে কাউকে মারধর করা বা অস্ত্র বহন করা? কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মন্তব্য বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও বাস্তব জীবনে প্রতিশোধের কারণ হয়ে উঠছে? আর কেন অনেক অভিভাবক সন্তানের গ্রেপ্তারের পর জানতে পারছেন, সে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের অগোচরে অন্য এক সামাজিক পরিসরে চলাফেরা করছিল?

এখানে পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তরুণদের নিয়ে কাজ করা সেবামূলক সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে ফেরানোর সবচেয়ে কার্যকর সময় অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে ওঠার আগেই। বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, পরামর্শ ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের মতো বিকল্প পথ তৈরি করা তাই প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলোও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করা এবং প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় জিজ্ঞেস করার পাশাপাশি সে কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কী দেখছে, কী পোস্ট করছে এবং আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি পরিবারের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, বহুজাতিক পরিবেশের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে অনেক পরিবার যথেষ্ট কার্যকর হতে পারছে না। বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতেও নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি কম বলে তিনি মনে করেন। অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজনের ধরন ও দীর্ঘ বক্তৃতাকেন্দ্রিক পরিবেশ অনেক তরুণকে আগ্রহ হারাতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এই দূরত্বের সুযোগে কিছু কিশোর অন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।

নিউইয়র্কের কিশোর গ্যাং সমস্যা তাই কোনো একটি কমিউনিটির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শহরের সামগ্রিক তথ্য একদিকে বলছে, কিশোর অপরাধীদের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত সাধারণীকরণের ভিত্তি নেই; অন্যদিকে বন্দুক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততার অনুপাত যে উদ্বেগের বিষয়, সেটিও স্পষ্ট। এই দুই দিক একসঙ্গে বিবেচনা করেই পরিবার ও কমিউনিটির জন্য প্রতিরোধ, সচেতনতা ও তরুণদের ইতিবাচক সামাজিক পরিসরে যুক্ত করার উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।