আবেদন ছাড়াই কলেজে ভর্তির চিঠি, বদলে যাচ্ছে আমেরিকার উচ্চশিক্ষা
- প্রকাশঃ ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০১
- / 9
নিউইয়র্ক, ৪ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কলেজ এমন শিক্ষার্থীদের কাছে ভর্তির প্রস্তাব পাঠাচ্ছে, যারা সংশ্লিষ্ট কলেজে প্রচলিত নিয়মে আবেদন করেনি। শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়া, ভর্তি নিয়ে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা এবং নতুন শিক্ষার্থী আকর্ষণের প্রয়োজন থেকে কিছু কলেজ সরাসরি ভর্তি পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এতে শিক্ষার্থীর দীর্ঘ আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করার অপেক্ষায় না থেকে কলেজগুলো আগে থেকেই সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের কাছে ভর্তির সুযোগ পৌঁছে দিচ্ছে।
এই পদ্ধতিকে সরাসরি ভর্তি বলা হচ্ছে। এতে অংশগ্রহণকারী কলেজগুলো শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত ও ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের নির্ধারিত যোগ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করে ভর্তির প্রস্তাব দিতে পারে। কমন অ্যাপের বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর শিক্ষা, পারিবারিক তথ্য, জিপিএ, নাগরিকত্ব, ফি মওকুফের যোগ্যতা এবং বাবা-মায়ের শিক্ষাগত তথ্যের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। প্রস্তাব পাওয়ার পর শিক্ষার্থী আবেদন জমা দিলে কলেজ তথ্য যাচাই করে চূড়ান্ত ভর্তি নিশ্চিত করে।
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে কমন অ্যাপের সরাসরি ভর্তি কর্মসূচিতে ২৩৪টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নিচ্ছে। ২০২৩ সালে কর্মসূচিটি ৭০টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে শুরু হয়েছিল। এরপর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ২১৫টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় যুক্ত ছিল। কমন অ্যাপ জানিয়েছে, গত শিক্ষাবর্ষে ১৫ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অন্তত একটি সরাসরি ভর্তির প্রস্তাব পেয়েছিলেন।
প্রচলিত ভর্তি ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কলেজে আবেদন করেন, এরপর প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন যাচাই করে ভর্তি, অপেক্ষমাণ তালিকা বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত দেয়। সরাসরি ভর্তি ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াটি অনেকটা উল্টো। শিক্ষার্থী কমন অ্যাপে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য দেওয়ার পর অংশগ্রহণকারী কলেজগুলো তাদের নির্ধারিত যোগ্যতার সঙ্গে সেই তথ্য মিলিয়ে প্রস্তাব পাঠাতে পারে। ফলে কলেজের কাছে আবেদন করার আগেই কোনো শিক্ষার্থীর কাছে ভর্তির সুযোগ পৌঁছে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত আবেদনের রচনা, সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ বা মানসম্মত পরীক্ষার ফলের প্রয়োজনও থাকে না।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যবস্থার একটি সুবিধা হলো আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা কমে যাওয়া। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো কোনো নির্দিষ্ট কলেজের কথা আগে ভাবেননি, কিন্তু সরাসরি ভর্তির প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। কমন অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, গত শিক্ষাবর্ষে প্রস্তাব পাওয়ার পর ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এমন কোনো কলেজে আবেদন করেছিলেন, যেটি প্রস্তাব পাওয়ার আগে তাঁদের বিবেচনায় ছিল না। আগের গবেষণাতেও দেখা গেছে, সরাসরি ভর্তির প্রস্তাব পাওয়া শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কলেজে আবেদন করার ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহ দেখান।
তবে এই পদ্ধতির বিস্তারের পেছনে কলেজগুলোর শিক্ষার্থী সংগ্রামের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি কমে যাওয়ার চাপের মধ্যে রয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়ায় কলেজে ভর্তি হওয়ার বয়সী জনসংখ্যার আকার কমছে। এর সঙ্গে উচ্চশিক্ষার ব্যয়, শিক্ষার্থী ঋণ নিয়ে উদ্বেগ এবং চার বছর মেয়াদি কলেজ শিক্ষার পরিবর্তে পেশাগত প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য বিকল্পের প্রতি আগ্রহও কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন করে তুলছে। সরাসরি ভর্তি ব্যবস্থার বিস্তার মূলত কম প্রতিযোগিতামূলক কলেজগুলোকে সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের কাছে আরও সক্রিয়ভাবে পৌঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে কলেজ ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ধরনও কিছুটা বদলাচ্ছে। আগে শিক্ষার্থীকে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরে কলেজে আবেদন করতে হতো। এখন কিছু কলেজ নিজেদের আসন পূরণ এবং শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছেই পৌঁছে যাচ্ছে। নাজারেথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও সরাসরি ভর্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের সুযোগ তুলে ধরছে।
তবে সরাসরি ভর্তির প্রস্তাব পাওয়াকে চূড়ান্ত ভর্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কমন অ্যাপের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রস্তাবটি সাধারণত বাধ্যতামূলক নয় এবং শিক্ষার্থী অন্য কলেজেও আবেদন করতে পারেন। প্রস্তাব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট কলেজের শর্ত, আবেদন প্রক্রিয়া এবং আনুষ্ঠানিক ভর্তি নিশ্চিত করার ধাপগুলো দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
খরচের বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করতে হবে। কোনো কলেজ বিনা আবেদনে ভর্তির প্রস্তাব দিলেই সেটি আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। টিউশন ফি, আবাসন, খাবার, বই, পরিবহন ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক খরচের পাশাপাশি বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তার প্রকৃত পরিমাণ হিসাব করতে হবে। বিশেষ করে প্রস্তাবের সঙ্গে কোনো বৃত্তি দেওয়া হলে তা মোট খরচ কতটা কমাচ্ছে এবং স্নাতক শেষ করতে সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ কত হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কলেজগুলো সম্ভাব্য শিক্ষার্থী বাছাই করতে কোন তথ্য ব্যবহার করছে। প্রতিষ্ঠান ও সরাসরি ভর্তি প্ল্যাটফর্মভেদে যোগ্যতার শর্ত আলাদা হতে পারে। কমন অ্যাপের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর দেওয়া একাডেমিক ও পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতে কলেজগুলো নিজেদের নির্ধারিত মানদণ্ড প্রয়োগ করে। ফলে প্রস্তাব পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদেরও বুঝে নেওয়া দরকার, কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে এবং প্রস্তাবটির সঙ্গে কী কী শর্ত যুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবশ্য একই পরিস্থিতিতে নেই। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। সরাসরি ভর্তি ব্যবস্থার বিস্তার বেশি দেখা যাচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, যাদের পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী আকর্ষণ ও ভর্তি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষায় সরাসরি ভর্তি পদ্ধতি কেবল আবেদন সহজ করার একটি ব্যবস্থা হিসেবে থাকছে না। শিক্ষার্থী কমে যাওয়া এবং কলেজগুলোর মধ্যে ভর্তি প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের উদ্যোগে পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এর ফলে আগামী দিনে কলেজ বাছাইয়ের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।























