মুন্সিগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলি চালানো ৪ অস্ত্রধারী শনাক্ত, আটক নেই
- প্রকাশঃ ১০:৩৯:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 22
ফাহিম দেওয়ান, একরাম দেওয়ান, একরামুল সরকার ওরফে ছোট একরাম ও জিহাদ সরকার। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত
মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় অস্ত্র হাতে গুলি করা চারজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশি তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনাক্ত চারজন হলেন—মুন্সিকান্দি গ্রামের দিদার দেওয়ানের ছেলে ফাহিম দেওয়ান, তোতা দেওয়ানের ছেলে একরাম দেওয়ান, মোতা সরকারের ছেলে একরামুল সরকার (ছোট একরাম) এবং নাজির সরকারের ছেলে জিহাদ সরকার। তাঁরা সবাই সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আহমেদ ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আওলাদ হোসেন মোল্লার সমর্থক বলে জানা গেছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে মুন্সিকান্দি গ্রামে উজির আহমেদ–আওলাদ হোসেন মোল্লার সমর্থকদের সঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর রহমান (মল্লিক) ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদ রায়হানের সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ককটেলের স্প্লিন্টার ও গুলিতে উভয় পক্ষের পাঁচজন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আতাউর রহমান–ওয়াহিদ রায়হানের সমর্থকেরা ফুটবল প্রতীকের স্লোগান দিয়ে মুন্সিকান্দি গ্রামে প্রবেশ করেন। সে সময় উজির আহমেদের সমর্থকেরা ধানের শীষ প্রতীকের প্রচার ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে স্লোগান দেওয়া নিয়ে প্রথমে কথা-কাটাকাটি এবং পরে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এলাকাবাসী জানান, সংঘর্ষটি সরাসরি নির্বাচনী প্রচারকে কেন্দ্র করে নয়; বরং মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের স্থানীয় নেতাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকেই এ ঘটনার সূত্রপাত। তবে নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহার করে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্ব বদলালেও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব চলত। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সেই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. কামরুজ্জামানকে সমর্থন করছেন উজির–আওলাদ হোসেনরা। অন্যদিকে ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী মহিউদ্দিনের পক্ষে রয়েছেন আতাউর রহমান (মল্লিক) ও ওয়াহিদ রায়হানের সমর্থকেরা।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মো. কামরুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি এলাকাভিত্তিক পূর্ববিরোধের ফল। ঘটনার সময় ধানের শীষের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচার কর্মসূচি ছিল না এবং কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা উপস্থিত ছিলেন না। নির্বাচন ও বিএনপিকে বিতর্কিত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুল ইসলাম জানান, সংঘর্ষে অস্ত্র হাতে থাকা অন্তত তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। জড়িতদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
আট বছরে আট হত্যাকাণ্ড
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে মোল্লাকান্দিতে পূর্ববিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সময়ে চারজন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছরের নভেম্বরে তিনজন এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একজন নিহত হন।
মুন্সিকান্দি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মো. আউয়াল মাদবর (৯০) বলেন, কয়েক যুগ ধরেই এলাকায় আধিপত্যের লড়াই চলছে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, সংঘর্ষ থামছে না। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ইউনিয়নের আমঘাটা এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ—সব আমলেই দুটি পক্ষ হয় এবং সংঘর্ষ বাধে। এতে এলাকার শান্তি নষ্ট হচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফিরোজ কবির বলেন, এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিবদমান এক পক্ষের কয়েকজন নেতা আগেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্য পক্ষের যাঁরা অশান্তি তৈরি করছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। আইন লঙ্ঘন করে কেউ পার পাবে না।

















