ঢাকা ০৯:২৬ , Sun, ১৮ Oct ২০২৬
বিশ্বসমাচার
কানাডা

কানাডায় অভিবাসন কমছে, আবাসনবাজারে স্বস্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক উদ্বেগ

আয়ান সরকার
  • প্রকাশঃ ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪১
  • / 7
কানাডায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপে বাড়িভাড়ার চাপ কিছুটা কমলেও শ্রমবাজার, উচ্চশিক্ষা ও আবাসন নির্মাণ খাতে মিশ্র প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

টরন্টো, ১৮ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – অভিবাসন কমানোর নীতিতে কানাডায় আবাসন, শ্রমবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সময় দ্রুত অভিবাসন বৃদ্ধির পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বাড়িভাড়ার ওপর চাপ কিছুটা কমলেও উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আতিথেয়তা খাতে কর্মীসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় দেশটির কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আর্থিক চাপে পড়েছে। কানাডার সংবাদমাধ্যম দ্য টরন্টো স্টার-এর এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডার বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার প্রবণতা বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকটের জন্য, বিদেশি কর্মীদের স্থানীয়দের মজুরি ও চাকরির সুযোগে প্রভাব ফেলার জন্য এবং আশ্রয়প্রার্থীদের সরকারি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য দায়ী করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সাল থেকে অভিবাসন বৃদ্ধির গতি কমাতে বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন আনে কানাডা সরকার। তবে এসব পদক্ষেপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফল নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কানাডার মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ ছিলেন অস্থায়ী বাসিন্দা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ হার কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের অনেকের অনুমতিপত্র কয়েক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকায় অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা কমার প্রক্রিয়া ধীর হচ্ছে।

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রভাব পড়েছে উচ্চশিক্ষা খাতেও। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সীমিত করায় অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমেছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রম বাতিল এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। কানাডার আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সংস্থার প্রধান লারিসা বেজো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ আন্তর্জাতিক কর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শ্রমবাজারেও অভিবাসন কমানোর প্রভাব একরকম নয়। উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের কিছু এলাকায় কর্মীসংকট দেখা দিয়েছে। কানাডার একটি বাণিজ্যিক সংগঠনের প্রতিনিধির মতে, অঞ্চলভেদে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি আলাদা। কোনো এলাকায় চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি থাকলেও অন্য এলাকায় নিয়োগদাতারা পর্যাপ্ত কর্মী পাচ্ছেন না। ফলে দেশজুড়ে অভিবাসন কমানোর একই নীতি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অভিবাসন কমলে শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধি, মোট দেশজ উৎপাদন এবং পণ্য ও সেবার চাহিদায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর কিছু ইতিবাচক দিকও দেখা যাচ্ছে। মাথাপিছু দেশজ উৎপাদনের উন্নতি, ভাড়ার স্থিতিশীলতা এবং আবাসনবাজারে চাপ কমার মতো পরিবর্তন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সুফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আবাসন খাতে পরিস্থিতি অবশ্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। অভিবাসন কমায় বাড়ির চাহিদা ও ভাড়ার ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। তবে নির্মাণ ব্যয়, দুর্বল চাহিদা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বাড়ি নির্মাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আবাসনের চাহিদা কেমন হবে, সে সম্পর্কে অভিবাসনের প্রবণতা নির্মাতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। চাহিদা কমার আশঙ্কা নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, অভিবাসননীতির পরিবর্তনে কিছু ব্যক্তি ও খাত সুবিধা পেলেও অন্যদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবাসনসংকট ও জনসেবার ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর সরবরাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাও কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা, আবাসন সরবরাহ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই দেশটির নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

❤️
👏
🙂
😞

কানাডায় অভিবাসন কমছে, আবাসনবাজারে স্বস্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক উদ্বেগ

প্রকাশঃ ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪১

টরন্টো, ১৮ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – অভিবাসন কমানোর নীতিতে কানাডায় আবাসন, শ্রমবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সময় দ্রুত অভিবাসন বৃদ্ধির পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বাড়িভাড়ার ওপর চাপ কিছুটা কমলেও উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আতিথেয়তা খাতে কর্মীসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় দেশটির কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আর্থিক চাপে পড়েছে। কানাডার সংবাদমাধ্যম দ্য টরন্টো স্টার-এর এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডার বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার প্রবণতা বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকটের জন্য, বিদেশি কর্মীদের স্থানীয়দের মজুরি ও চাকরির সুযোগে প্রভাব ফেলার জন্য এবং আশ্রয়প্রার্থীদের সরকারি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য দায়ী করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সাল থেকে অভিবাসন বৃদ্ধির গতি কমাতে বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন আনে কানাডা সরকার। তবে এসব পদক্ষেপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফল নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কানাডার মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ ছিলেন অস্থায়ী বাসিন্দা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ হার কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের অনেকের অনুমতিপত্র কয়েক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকায় অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা কমার প্রক্রিয়া ধীর হচ্ছে।

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রভাব পড়েছে উচ্চশিক্ষা খাতেও। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সীমিত করায় অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমেছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রম বাতিল এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। কানাডার আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সংস্থার প্রধান লারিসা বেজো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ আন্তর্জাতিক কর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শ্রমবাজারেও অভিবাসন কমানোর প্রভাব একরকম নয়। উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের কিছু এলাকায় কর্মীসংকট দেখা দিয়েছে। কানাডার একটি বাণিজ্যিক সংগঠনের প্রতিনিধির মতে, অঞ্চলভেদে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি আলাদা। কোনো এলাকায় চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি থাকলেও অন্য এলাকায় নিয়োগদাতারা পর্যাপ্ত কর্মী পাচ্ছেন না। ফলে দেশজুড়ে অভিবাসন কমানোর একই নীতি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অভিবাসন কমলে শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধি, মোট দেশজ উৎপাদন এবং পণ্য ও সেবার চাহিদায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর কিছু ইতিবাচক দিকও দেখা যাচ্ছে। মাথাপিছু দেশজ উৎপাদনের উন্নতি, ভাড়ার স্থিতিশীলতা এবং আবাসনবাজারে চাপ কমার মতো পরিবর্তন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সুফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আবাসন খাতে পরিস্থিতি অবশ্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। অভিবাসন কমায় বাড়ির চাহিদা ও ভাড়ার ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। তবে নির্মাণ ব্যয়, দুর্বল চাহিদা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বাড়ি নির্মাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আবাসনের চাহিদা কেমন হবে, সে সম্পর্কে অভিবাসনের প্রবণতা নির্মাতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। চাহিদা কমার আশঙ্কা নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, অভিবাসননীতির পরিবর্তনে কিছু ব্যক্তি ও খাত সুবিধা পেলেও অন্যদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবাসনসংকট ও জনসেবার ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর সরবরাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাও কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা, আবাসন সরবরাহ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই দেশটির নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।