যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের চার বছর মেয়াদি অবস্থানসীমা স্থগিত, পুরোনো নিয়ম বহাল
- প্রকাশঃ ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:২৫
- / 5
ওয়াশিংটন, ৩ নভেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থী ও বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের অবস্থানের মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছরে সীমিত করার নতুন বিধি আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিধিটি চালুর কথা থাকলেও তার আগের দিন, ১৪ সেপ্টেম্বর, ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালত এর কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ফলে বাংলাদেশিসহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আপাতত আগের নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে আদালতের আদেশটি চূড়ান্ত রায় নয়। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় বিধিটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই নতুন বিধিমালাটি প্রকাশ করে। এর নাম ছিল ‘নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবস্থানের অনুমতি এবং অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনপ্রক্রিয়া’। এতে বিদেশি শিক্ষার্থী, বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের অবস্থানের নিয়ম পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়। এফ-১ ও জে-১ শ্রেণির ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার বছরের নির্দিষ্ট অবস্থানকাল চালুর কথা ছিল। আই-শ্রেণির বিদেশি সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিদের জন্যও নির্দিষ্ট মেয়াদের বিধান রাখা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পড়াশোনা, গবেষণা বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শেষ না হলে তাঁদের অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আলাদা আবেদন করতে হতো।
বর্তমান ব্যবস্থায় এফ-১ শিক্ষার্থী এবং জে-১ বিনিময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত তাঁদের অনুমোদিত শিক্ষাক্রম বা কর্মসূচির মেয়াদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ শেষ হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারেন। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় অবস্থানের মেয়াদ অনুযায়ী অনুমতি। অর্থাৎ পাসপোর্টে থাকা ভিসার মেয়াদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানের অনুমতি এক বিষয় নয়। শিক্ষার্থী তাঁর কর্মসূচির শর্ত মেনে চলছেন কি না, স্বাভাবিক অগ্রগতি বজায় রাখছেন কি না এবং অভিবাসনবিধি অনুসরণ করছেন কি না, তার ওপর বৈধ অবস্থান নির্ভর করে।
নতুন বিধি কার্যকর হলে এই ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদের অনুমতি দেওয়া হতো। সাধারণভাবে এফ-১ ও জে-১ শ্রেণির ভিসাধারীদের সর্বোচ্চ চার বছর থাকার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কোনো শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর, পিএইচডি বা গবেষণার কাজ চার বছরের মধ্যে শেষ না হলে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবার কাছে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হতো। আবেদন অনুমোদিত না হলে শিক্ষাক্রম শেষ হওয়ার আগেই দেশ ছাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।
নতুন বিধিতে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত সময়ও কমানোর কথা ছিল। এফ-১ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত ৬০ দিনের সময় কমিয়ে ৩০ দিন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। জে-১ শ্রেণির অংশগ্রহণকারীদের জন্যও ৩০ দিনের সময়সীমা রাখার পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, শিক্ষার স্তর বা বিষয় পরিবর্তন এবং নতুন শিক্ষাক্রমে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব ছিল। ফলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পিএইচডি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো শিক্ষাক্রমে যুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারত।
নতুন বিধির বিরুদ্ধে মামলা করে উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক সংগঠন। মামলাকারীদের মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্টস অ্যালায়েন্স অন হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন, নাফসা এবং আমেরিকান ফেডারেশন অব টিচার্সসহ কয়েকটি সংগঠন। তাঁদের অভিযোগ, বিধি তৈরির সময় শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি সরকার। জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বিধি বাস্তবায়নের পক্ষে দেওয়া যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
আদালতের নথি অনুযায়ী, নতুন বিধি নিয়ে জনমত গ্রহণের সময় প্রায় ২২ হাজার মতামত জমা পড়েছিল। এর বড় অংশে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের বিরোধিতা করা হয়। আপত্তিকারীদের আশঙ্কা ছিল, অবস্থানের মেয়াদ চার বছরে সীমিত করলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।
ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল আদালতের বিচারক এফ ডেনিস সেইলর ১৪ সেপ্টেম্বর মামলাটির প্রাথমিক পর্যায়ে নতুন বিধির কার্যকারিতা স্থগিত করেন। আদালত মনে করেন, বিধি তৈরির প্রক্রিয়ায় সরকারের যুক্তি, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং কম কঠোর বিকল্প বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে। তবে আদালত বিধিটি চূড়ান্তভাবে বাতিল করেননি। মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যকারিতা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালতের আদেশের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল করে। মামলাটি এখন ফার্স্ট সার্কিট আপিল আদালতের বিবেচনাধীন। তবে আপিল করার কারণে স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা বন্ধ হয়নি। ফলে নতুন বিধি এখনো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না এবং আগের অবস্থানকালভিত্তিক নিয়ম বহাল রয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবর উভয় পক্ষই মূল মামলার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রায় চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছে। সরকারের জবাবের পরবর্তী সময়সীমা ২ নভেম্বর নির্ধারিত ছিল। আপিল আদালতে সরকারের প্রাথমিক বক্তব্য জমা দেওয়ার সময় ৯ নভেম্বর এবং মামলাকারীদের জবাব দেওয়ার সময় ৯ ডিসেম্বর ধার্য রয়েছে। ফলে আইনি প্রক্রিয়া আরও এগোবে। তবে পরবর্তী কোনো আদালতের আদেশ না আসা পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও গবেষণাভিত্তিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁদের কেউ দুই বছরের কোর্সে পড়ছেন, আবার কারও গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি শেষ করতে চার থেকে ছয় বছর বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। নতুন বিধি কার্যকর হলে নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে শিক্ষাক্রম শেষ করতে না পারা শিক্ষার্থীদের অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত আবেদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতো।
বিশেষ করে পিএইচডি ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষণার ফল, পরীক্ষাগারের কাজ, গবেষণাপত্র প্রস্তুত এবং তত্ত্বাবধায়কের অনুমোদনের কারণে সময় বাড়তে পারে। নতুন নিয়মে এসব শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আলাদা অনুমতি নিতে হতো। আদালতের স্থগিতাদেশে আপাতত সেই বাধ্যবাধকতা কার্যকর হয়নি।
তবে আদালতের আদেশের অর্থ এই নয় যে শিক্ষার্থীরা অভিবাসনসংক্রান্ত সব শর্ত থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। তাঁদের অনুমোদিত শিক্ষাক্রমে অগ্রগতি বজায় রাখা, পূর্ণকালীন পড়াশোনার শর্ত মানা এবং অনুমোদিত কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, শিক্ষার স্তর বদল বা অন্য কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে নিজ প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সহায়তা দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করাও জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সহায়তা দপ্তর আদালতের সিদ্ধান্তের পর শিক্ষার্থীদের জানিয়েছে, আপাতত আগের অবস্থানকালভিত্তিক নিয়ম বহাল রয়েছে। নতুন চার বছর মেয়াদি ব্যবস্থার অধীনে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করার প্রয়োজন নেই। তবে মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্তে নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীসহ সব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করা।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টার, ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল আদালতের নথি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সহায়তাসংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্দেশনা।

























