ঢাকা ১২:২২ , Tue, ২৭ Oct ২০২৬
বিশ্বসমাচার
কানাডা

কানাডার বংশসূত্রে নাগরিকত্ব: আবেদন যাচাইয়ে যেসব বিষয় দেখেন কর্মকর্তারা

মুশফিকুর রহমান
  • প্রকাশঃ ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৮
  • / 4
কানাডার বংশসূত্রে নাগরিকত্বের আবেদন যাচাইয়ে পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। ছবি: সংগৃহীত

অটোয়া, ২৬ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – বংশসূত্রে কানাডার নাগরিকত্বের সনদ পেতে আবেদন করলে পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব, পারিবারিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা, জন্ম ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর নাগরিকত্ব আইন যাচাই করেন দেশটির অভিবাসন কর্মকর্তারা। ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া বিল সি-৩-এর মাধ্যমে বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম প্রজন্মের সীমা পরিবর্তিত হয়েছে। এতে আগে যোগ্যতা না পাওয়া কিছু ব্যক্তি ও তাঁদের বংশধরদের জন্য নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে কানাডীয় পূর্বপুরুষ থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব নিশ্চিত হয় না।

কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীর দাবি যাচাইয়ের জন্য প্রতিটি প্রজন্মের নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য নথি প্রয়োজন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া না গেলে কেন তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, তার লিখিত ব্যাখ্যা এবং নথি খোঁজার চেষ্টার প্রমাণও জমা দিতে হতে পারে।

পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব কীভাবে যাচাই হয়

আবেদনকারীর বংশপরম্পরায় সংশ্লিষ্ট অভিভাবক সন্তানের জন্মের সময় কানাডার নাগরিক ছিলেন কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। কোনো পূর্বপুরুষ নাগরিকত্ব হারিয়ে থাকলে সেটি কোন আইনে ঘটেছিল এবং পরে নাগরিকত্ব পুনর্বহাল হয়েছিল কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

কানাডায় বিভিন্ন সময়ে নাগরিকত্বের আইন পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে প্রতিটি প্রজন্মের জন্মের সময় কোন আইন কার্যকর ছিল, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হয়।

১৯৪৭ সালের কানাডীয় নাগরিকত্ব আইনে বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাগরিকত্ব নির্ধারণে সাধারণত ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক’-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব বাবার ওপর থাকত। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হতে পারতেন। বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানকে নিবন্ধন করা এবং পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্ব ধরে রাখার জন্য আবেদন করার শর্তও কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।

১৯৪৭ সালের আগে কানাডার নাগরিকত্বব্যবস্থা বর্তমানের মতো ছিল না। তখন ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে মর্যাদা, স্বাভাবিকীকরণ সনদ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি নথির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণ করতে হতো। তাই পুরোনো পারিবারিক নথি যাচাইয়ের সময় সেগুলো কোন আইন ও সময়ে ইস্যু করা হয়েছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কোনো পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব হারানোর তথ্য পাওয়া গেলে কর্মকর্তারা পরবর্তী আইনে সেই মর্যাদা পুনর্বহাল হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করেন। পুরোনো নাগরিকত্ব আইনের কিছু বিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী আইনগুলোতে এ ধরনের অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পুনর্বহালের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রতিটি প্রজন্মের সম্পর্কের প্রমাণ প্রয়োজন

আবেদনকারী থেকে কানাডীয় পূর্বপুরুষ পর্যন্ত প্রতিটি প্রজন্মের পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক নথির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বা মূল নথি সংরক্ষণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সনদ সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জন্মসনদ পাওয়া না গেলে হাসপাতালের জন্মসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসক বা ধাত্রীর রেকর্ড, ব্যাপটিস্মের সনদ, আদমশুমারির তথ্য কিংবা জাহাজযাত্রার তালিকার মতো বিকল্প নথি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে শুধু বংশতালিকা তৈরির ওয়েবসাইট বা অন্য তৃতীয় পক্ষের তথ্য দিয়ে আবেদন সমর্থন করা যায় না। নথি মূলত যে কর্তৃপক্ষ তৈরি বা সংরক্ষণ করেছে, সেখান থেকে প্রাপ্ত প্রমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

কানাডীয় অভিভাবকের নাম জন্মসনদে না থাকলে হাসপাতালের নথি, আদালতের আদেশ, সারোগেসি-সংক্রান্ত চুক্তি বা অন্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। প্রয়োজন হলে অভিভাবকত্বের সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার অনুরোধও করা সম্ভব।

দত্তক নেওয়া অভিভাবকের মাধ্যমে সাধারণত বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না। তবে বিদেশে দত্তক নেওয়া শিশুদের জন্য কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়ার পৃথক প্রক্রিয়া রয়েছে।

কোনো নথি পাওয়া না গেলে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ বা সরকারি দপ্তরে নথি চেয়ে পাঠানো চিঠি কিংবা নথি সংরক্ষিত নেই বলে পাওয়া উত্তরও সহায়ক প্রমাণ হতে পারে।

নাম, জন্মতারিখ ও পরিচয়পত্রের মিল

আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে নাম ও জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে, এমন বৈধ পরিচয়পত্র জমা দিতে হয়। সাধারণ নির্দেশনায় দুটি পরিচয়পত্র চাওয়া হয়, যার অন্তত একটিতে ছবি থাকতে হবে। শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র না থাকলে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে অতিরিক্ত তথ্য জমা দিতে হতে পারে।

জন্মসনদ, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য নথিতে নামের বানান বা জন্মতারিখের অমিল থাকলে কর্মকর্তারা তার ব্যাখ্যা ও সহায়ক প্রমাণ চাইতে পারেন। নাম আইনগতভাবে পরিবর্তন করা হলে আদালতের আদেশ বা নাম পরিবর্তনের সনদ জমা দিতে হতে পারে। বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে পারিবারিক নাম পরিবর্তিত হলে সংশ্লিষ্ট নথিও প্রয়োজন হতে পারে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর ইচ্ছামতো নাম বা জন্মতারিখ পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। তাই শুরুতেই সব নথিতে থাকা তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের পর জন্ম নেওয়া শিশুদের বিশেষ শর্ত

বিল সি-৩ অনুযায়ী, কানাডার বাইরে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বা তার পরে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর কানাডীয় অভিভাবক নিজেও বিদেশে জন্ম নেওয়া বা দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তি হলে অতিরিক্ত শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কানাডীয় অভিভাবককে সন্তানের জন্ম বা দত্তক নেওয়ার আগে কানাডায় অন্তত ১ হাজার ৯৫ দিন, অর্থাৎ তিন বছর শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকার প্রমাণ দিতে হয়।

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কানাডার সশস্ত্র বাহিনী বা সরকারি দায়িত্বে বিদেশে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ শর্তে ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তবে কোন ধরনের চাকরি বা দায়িত্বের ক্ষেত্রে ছাড় প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান ও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের আগে বিদেশে জন্ম নেওয়া কিছু ব্যক্তি নতুন আইনের অধীনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারেন। আগে কার্যকর প্রথম প্রজন্মের সীমা বা পুরোনো আইনের বিধানের কারণে যাঁরা নাগরিকত্ব থেকে বাদ পড়েছিলেন, তাঁদের একটি অংশের জন্য নতুন আইন সুযোগ তৈরি করেছে।

অতিরিক্ত নথি, সাক্ষাৎকার ও ডিএনএ পরীক্ষার সম্ভাবনা

আবেদনে তথ্যের ঘাটতি থাকলে অভিবাসন দপ্তর অতিরিক্ত নথি, লিখিত ব্যাখ্যা বা সাক্ষাৎকার চাইতে পারে। কিছু আবেদন গুণগত যাচাই কর্মসূচির আওতায় দৈবচয়নেও পর্যালোচনার জন্য নির্বাচিত হয়।

সাক্ষাৎকারে আবেদনকারীকে জমা দেওয়া নথির মূল কপি দেখাতে হতে পারে। আবেদনে দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়া সম্ভব। পিতা-মাতার সম্পর্ক নথি দিয়ে নিশ্চিত করা না গেলে ডিএনএ পরীক্ষার অনুরোধও আসতে পারে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য না দিলে আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হতে পারে। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া চাওয়া নথি বা তথ্য জমা না দেওয়ার পরিণতি আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধানের ওপর নির্ভর করবে।

অসম্পূর্ণ আবেদন ফেরত যেতে পারে

নাগরিকত্বের যোগ্যতা যাচাইয়ের আগে আবেদনটি সম্পূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় ফরম, স্বাক্ষর, ছবি, ফি পরিশোধের প্রমাণ বা অন্য বাধ্যতামূলক তথ্য অনুপস্থিত থাকলে আবেদন ফেরত দেওয়া হতে পারে।

পরিবারের একাধিক সদস্য একসঙ্গে আবেদন করলে প্রত্যেকের আবেদন ও নথি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। নামের বানান, তারিখ, স্বাক্ষর কিংবা প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণে ঘাটতি থাকলে অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে।

ইংরেজি বা ফরাসি ছাড়া অন্য ভাষায় থাকা নথির সঙ্গে গ্রহণযোগ্য অনুবাদ জমা দিতে হয়। অনুবাদের ক্ষেত্রে কানাডার অভিবাসন দপ্তরের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন।

নাগরিকত্বের সনদ পেতে কানাডায় বসবাস বাধ্যতামূলক নয়

বংশসূত্রে নাগরিকত্বের যোগ্যতা থাকলে আবেদনকারী নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র বা সনদের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ প্রক্রিয়াটি সাধারণভাবে নাগরিকত্ব অর্জনের আবেদনের থেকে আলাদা। বংশসূত্রে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্রের জন্য সাধারণ নাগরিকত্ব আবেদনের মতো নির্দিষ্ট সময় কানাডায় বসবাস, ভাষা পরীক্ষা বা নাগরিকত্ব পরীক্ষা দেওয়ার শর্ত প্রযোজ্য হয় না।

আবেদন অনুমোদিত হলে নাগরিকত্বের সনদ দেওয়া হয়। এরপর কানাডীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা সম্ভব। তবে নাগরিকত্বের যোগ্যতা নির্ধারণ এবং পাসপোর্ট ইস্যু পৃথক প্রক্রিয়া।

আবেদন নিষ্পত্তির সময় নির্ভর করে নথি সম্পূর্ণ কি না, পারিবারিক ইতিহাস যাচাইয়ের জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজের চাপের ওপর। বিদেশ থেকে আবেদন করলে ডাকযোগে নথি আদান-প্রদানের কারণে অতিরিক্ত সময়ও লাগতে পারে। তাই আবেদন করার আগে কানাডা সরকারের হালনাগাদ নির্দেশনা ও বর্তমান নিষ্পত্তির সময় দেখে নেওয়া উচিত।

নতুন আইন নাগরিকত্বের সুযোগ বিস্তৃত করলেও প্রতিটি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তাঁর জন্মতারিখ, পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব, প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য আইনি শর্তের ওপর। তাই আবেদন করার আগে পারিবারিক নথি সংগ্রহ, তথ্যের সামঞ্জস্য যাচাই এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: সিআইসি নিউজ এবং কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক দপ্তরের নির্দেশিকা

 

❤️
👏
🙂
😞

কানাডার বংশসূত্রে নাগরিকত্ব: আবেদন যাচাইয়ে যেসব বিষয় দেখেন কর্মকর্তারা

প্রকাশঃ ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৮

অটোয়া, ২৬ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – বংশসূত্রে কানাডার নাগরিকত্বের সনদ পেতে আবেদন করলে পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব, পারিবারিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা, জন্ম ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর নাগরিকত্ব আইন যাচাই করেন দেশটির অভিবাসন কর্মকর্তারা। ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া বিল সি-৩-এর মাধ্যমে বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম প্রজন্মের সীমা পরিবর্তিত হয়েছে। এতে আগে যোগ্যতা না পাওয়া কিছু ব্যক্তি ও তাঁদের বংশধরদের জন্য নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে কানাডীয় পূর্বপুরুষ থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব নিশ্চিত হয় না।

কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীর দাবি যাচাইয়ের জন্য প্রতিটি প্রজন্মের নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য নথি প্রয়োজন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া না গেলে কেন তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, তার লিখিত ব্যাখ্যা এবং নথি খোঁজার চেষ্টার প্রমাণও জমা দিতে হতে পারে।

পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব কীভাবে যাচাই হয়

আবেদনকারীর বংশপরম্পরায় সংশ্লিষ্ট অভিভাবক সন্তানের জন্মের সময় কানাডার নাগরিক ছিলেন কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। কোনো পূর্বপুরুষ নাগরিকত্ব হারিয়ে থাকলে সেটি কোন আইনে ঘটেছিল এবং পরে নাগরিকত্ব পুনর্বহাল হয়েছিল কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

কানাডায় বিভিন্ন সময়ে নাগরিকত্বের আইন পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে প্রতিটি প্রজন্মের জন্মের সময় কোন আইন কার্যকর ছিল, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হয়।

১৯৪৭ সালের কানাডীয় নাগরিকত্ব আইনে বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানের নাগরিকত্ব নির্ধারণে সাধারণত ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক’-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব বাবার ওপর থাকত। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হতে পারতেন। বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানকে নিবন্ধন করা এবং পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্ব ধরে রাখার জন্য আবেদন করার শর্তও কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।

১৯৪৭ সালের আগে কানাডার নাগরিকত্বব্যবস্থা বর্তমানের মতো ছিল না। তখন ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে মর্যাদা, স্বাভাবিকীকরণ সনদ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি নথির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণ করতে হতো। তাই পুরোনো পারিবারিক নথি যাচাইয়ের সময় সেগুলো কোন আইন ও সময়ে ইস্যু করা হয়েছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কোনো পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব হারানোর তথ্য পাওয়া গেলে কর্মকর্তারা পরবর্তী আইনে সেই মর্যাদা পুনর্বহাল হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করেন। পুরোনো নাগরিকত্ব আইনের কিছু বিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী আইনগুলোতে এ ধরনের অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পুনর্বহালের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রতিটি প্রজন্মের সম্পর্কের প্রমাণ প্রয়োজন

আবেদনকারী থেকে কানাডীয় পূর্বপুরুষ পর্যন্ত প্রতিটি প্রজন্মের পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক নথির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বা মূল নথি সংরক্ষণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সনদ সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জন্মসনদ পাওয়া না গেলে হাসপাতালের জন্মসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসক বা ধাত্রীর রেকর্ড, ব্যাপটিস্মের সনদ, আদমশুমারির তথ্য কিংবা জাহাজযাত্রার তালিকার মতো বিকল্প নথি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে শুধু বংশতালিকা তৈরির ওয়েবসাইট বা অন্য তৃতীয় পক্ষের তথ্য দিয়ে আবেদন সমর্থন করা যায় না। নথি মূলত যে কর্তৃপক্ষ তৈরি বা সংরক্ষণ করেছে, সেখান থেকে প্রাপ্ত প্রমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

কানাডীয় অভিভাবকের নাম জন্মসনদে না থাকলে হাসপাতালের নথি, আদালতের আদেশ, সারোগেসি-সংক্রান্ত চুক্তি বা অন্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। প্রয়োজন হলে অভিভাবকত্বের সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার অনুরোধও করা সম্ভব।

দত্তক নেওয়া অভিভাবকের মাধ্যমে সাধারণত বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় না। তবে বিদেশে দত্তক নেওয়া শিশুদের জন্য কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়ার পৃথক প্রক্রিয়া রয়েছে।

কোনো নথি পাওয়া না গেলে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ বা সরকারি দপ্তরে নথি চেয়ে পাঠানো চিঠি কিংবা নথি সংরক্ষিত নেই বলে পাওয়া উত্তরও সহায়ক প্রমাণ হতে পারে।

নাম, জন্মতারিখ ও পরিচয়পত্রের মিল

আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে নাম ও জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে, এমন বৈধ পরিচয়পত্র জমা দিতে হয়। সাধারণ নির্দেশনায় দুটি পরিচয়পত্র চাওয়া হয়, যার অন্তত একটিতে ছবি থাকতে হবে। শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র না থাকলে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে অতিরিক্ত তথ্য জমা দিতে হতে পারে।

জন্মসনদ, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য নথিতে নামের বানান বা জন্মতারিখের অমিল থাকলে কর্মকর্তারা তার ব্যাখ্যা ও সহায়ক প্রমাণ চাইতে পারেন। নাম আইনগতভাবে পরিবর্তন করা হলে আদালতের আদেশ বা নাম পরিবর্তনের সনদ জমা দিতে হতে পারে। বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে পারিবারিক নাম পরিবর্তিত হলে সংশ্লিষ্ট নথিও প্রয়োজন হতে পারে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর ইচ্ছামতো নাম বা জন্মতারিখ পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। তাই শুরুতেই সব নথিতে থাকা তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের পর জন্ম নেওয়া শিশুদের বিশেষ শর্ত

বিল সি-৩ অনুযায়ী, কানাডার বাইরে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বা তার পরে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর কানাডীয় অভিভাবক নিজেও বিদেশে জন্ম নেওয়া বা দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তি হলে অতিরিক্ত শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কানাডীয় অভিভাবককে সন্তানের জন্ম বা দত্তক নেওয়ার আগে কানাডায় অন্তত ১ হাজার ৯৫ দিন, অর্থাৎ তিন বছর শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকার প্রমাণ দিতে হয়।

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কানাডার সশস্ত্র বাহিনী বা সরকারি দায়িত্বে বিদেশে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ শর্তে ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তবে কোন ধরনের চাকরি বা দায়িত্বের ক্ষেত্রে ছাড় প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান ও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের আগে বিদেশে জন্ম নেওয়া কিছু ব্যক্তি নতুন আইনের অধীনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারেন। আগে কার্যকর প্রথম প্রজন্মের সীমা বা পুরোনো আইনের বিধানের কারণে যাঁরা নাগরিকত্ব থেকে বাদ পড়েছিলেন, তাঁদের একটি অংশের জন্য নতুন আইন সুযোগ তৈরি করেছে।

অতিরিক্ত নথি, সাক্ষাৎকার ও ডিএনএ পরীক্ষার সম্ভাবনা

আবেদনে তথ্যের ঘাটতি থাকলে অভিবাসন দপ্তর অতিরিক্ত নথি, লিখিত ব্যাখ্যা বা সাক্ষাৎকার চাইতে পারে। কিছু আবেদন গুণগত যাচাই কর্মসূচির আওতায় দৈবচয়নেও পর্যালোচনার জন্য নির্বাচিত হয়।

সাক্ষাৎকারে আবেদনকারীকে জমা দেওয়া নথির মূল কপি দেখাতে হতে পারে। আবেদনে দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়া সম্ভব। পিতা-মাতার সম্পর্ক নথি দিয়ে নিশ্চিত করা না গেলে ডিএনএ পরীক্ষার অনুরোধও আসতে পারে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য না দিলে আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হতে পারে। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া চাওয়া নথি বা তথ্য জমা না দেওয়ার পরিণতি আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধানের ওপর নির্ভর করবে।

অসম্পূর্ণ আবেদন ফেরত যেতে পারে

নাগরিকত্বের যোগ্যতা যাচাইয়ের আগে আবেদনটি সম্পূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় ফরম, স্বাক্ষর, ছবি, ফি পরিশোধের প্রমাণ বা অন্য বাধ্যতামূলক তথ্য অনুপস্থিত থাকলে আবেদন ফেরত দেওয়া হতে পারে।

পরিবারের একাধিক সদস্য একসঙ্গে আবেদন করলে প্রত্যেকের আবেদন ও নথি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। নামের বানান, তারিখ, স্বাক্ষর কিংবা প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণে ঘাটতি থাকলে অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে।

ইংরেজি বা ফরাসি ছাড়া অন্য ভাষায় থাকা নথির সঙ্গে গ্রহণযোগ্য অনুবাদ জমা দিতে হয়। অনুবাদের ক্ষেত্রে কানাডার অভিবাসন দপ্তরের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন।

নাগরিকত্বের সনদ পেতে কানাডায় বসবাস বাধ্যতামূলক নয়

বংশসূত্রে নাগরিকত্বের যোগ্যতা থাকলে আবেদনকারী নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র বা সনদের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ প্রক্রিয়াটি সাধারণভাবে নাগরিকত্ব অর্জনের আবেদনের থেকে আলাদা। বংশসূত্রে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্রের জন্য সাধারণ নাগরিকত্ব আবেদনের মতো নির্দিষ্ট সময় কানাডায় বসবাস, ভাষা পরীক্ষা বা নাগরিকত্ব পরীক্ষা দেওয়ার শর্ত প্রযোজ্য হয় না।

আবেদন অনুমোদিত হলে নাগরিকত্বের সনদ দেওয়া হয়। এরপর কানাডীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা সম্ভব। তবে নাগরিকত্বের যোগ্যতা নির্ধারণ এবং পাসপোর্ট ইস্যু পৃথক প্রক্রিয়া।

আবেদন নিষ্পত্তির সময় নির্ভর করে নথি সম্পূর্ণ কি না, পারিবারিক ইতিহাস যাচাইয়ের জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজের চাপের ওপর। বিদেশ থেকে আবেদন করলে ডাকযোগে নথি আদান-প্রদানের কারণে অতিরিক্ত সময়ও লাগতে পারে। তাই আবেদন করার আগে কানাডা সরকারের হালনাগাদ নির্দেশনা ও বর্তমান নিষ্পত্তির সময় দেখে নেওয়া উচিত।

নতুন আইন নাগরিকত্বের সুযোগ বিস্তৃত করলেও প্রতিটি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তাঁর জন্মতারিখ, পূর্বপুরুষের নাগরিকত্ব, প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য আইনি শর্তের ওপর। তাই আবেদন করার আগে পারিবারিক নথি সংগ্রহ, তথ্যের সামঞ্জস্য যাচাই এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: সিআইসি নিউজ এবং কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক দপ্তরের নির্দেশিকা