এক দশকে ৭ প্রধানমন্ত্রী: বিদায়ী ৬ জন কেন ক্ষমতা হারালেন, বার্নহামের সামনে কতটা কঠিন চ্যালেঞ্জ?
- প্রকাশঃ ২০ জুলাই ২০২৬, ১৭:৫৫
- / 16
গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি এমন নাটকীয় মোড় নিয়েছে, যা অনেক রাজনৈতিক থ্রিলারকেও হার মানায়। ব্রেক্সিট গণভোট, মাত্র ৪৯ দিনের প্রধানমন্ত্রীত্বের রেকর্ড গড়া লিজ ট্রাস, কনজারভেটিভদের দীর্ঘ ১৪ বছরের শাসনের অবসান এবং সর্বশেষ কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে নেতৃত্ব পরিবর্তন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ অ্যান্ডি বার্নহাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের পর যুক্তরাজ্য পেল সপ্তম প্রধানমন্ত্রী।
রাজা তৃতীয় চার্লসের আমন্ত্রণে সরকার গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করে অ্যান্ডি বার্নহাম যুক্তরাজ্যের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরই তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। তবে গত এক দশকের ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কিয়ার স্টারমার ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিপুল জয় এনে লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় ফেরান এবং কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটান। কিন্তু ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, দলীয় সংসদ সদস্যদের চাপ এবং স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধাক্কার মুখে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে লেবার পার্টির এমপিরা অ্যান্ডি বার্নহামকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেওয়া প্রথম বক্তব্যে বার্নহাম বলেন, দেশের জন্য আরও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে সচেতন
গত এক দশকের সাত প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতা হারানোর কারণ
ডেভিড ক্যামেরন (মে ২০১০ – জুলাই ২০১৬)
২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে রায় আসে। ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালানো ডেভিড ক্যামেরন গণভোটের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন।
থেরেসা মে (জুলাই ২০১৬ – জুলাই ২০১৯)
ব্রেক্সিট-পরবর্তী সংকট মোকাবিলার দায়িত্ব নেন থেরেসা মে। তবে আগাম নির্বাচন ডেকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান এবং ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে পাস করাতে ব্যর্থ হন। ২০১৯ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর তিনি পদত্যাগ করেন।
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমায় যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ২.৯ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতির আশঙ্কা
বরিস জনসন (জুলাই ২০১৯ – সেপ্টেম্বর ২০২২)
২০১৯ সালের নির্বাচনে বড় জয় পেলেও বরিস জনসনের সরকার একের পর এক রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, দলীয় বিদ্রোহ এবং মন্ত্রীদের গণপদত্যাগের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দলীয় সমর্থন হারিয়ে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়।
লিজ ট্রাস (সেপ্টেম্বর ২০২২ – অক্টোবর ২০২২)
মাত্র ৪৯ দিন দায়িত্ব পালন করে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। তার ঘোষিত ‘মিনি বাজেট’ আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করলে নিজ দলের আস্থা হারিয়ে পদত্যাগ করেন।
ঋষি সুনাক (অক্টোবর ২০২২ – জুলাই ২০২৪)
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং দলীয় বিভাজন কাটিয়ে উঠতে পারেননি ঋষি সুনাক। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কিয়ার স্টারমারের কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
কিয়ার স্টারমার (জুলাই ২০২৪ – জুলাই ২০২৬)
ক্ষমতায় এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনার জন্য প্রশংসিত হলেও দেশের অভ্যন্তরে কল্যাণমূলক ব্যয় কমানো, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ এবং কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে দলের উত্থান তার জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দেয়। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের বড় পরাজয়ের পর দলীয় চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন।
অ্যান্ডি বার্নহাম (জুলাই ২০২৬ – বর্তমান)
লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অ্যান্ডি বার্নহাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জনআস্থা পুনর্গঠন এবং গত এক দশকের ধারাবাহিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সংস্কৃতি থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করে আনা। এক দশকে সাত প্রধানমন্ত্রী বদলের এই নজির যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম অস্থির সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, অ্যান্ডি বার্নহাম সেই অস্থিরতার অবসান ঘটাতে পারেন কি না।


























