বিশ্বকাপ শেষ, এখন কী? নিউইয়র্ক থেকে বিশ্বের কোটি ভক্তের জীবনে ফুটবল শূন্যতার গল্প
- প্রকাশঃ ২২ জুলাই ২০২৬, ০০:৪৪
- / 7
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপ ঘিরেই চলেছে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৈনন্দিন জীবন। ম্যাচের সময় অনুযায়ী বদলে গেছে ক্যালেন্ডার, পিছিয়েছে বৈঠক, দীর্ঘ হয়েছে বিরতির সময়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপগুলো ব্যস্ত থেকেছে মিম, কৌশল বিশ্লেষণ এবং ম্যাচের পূর্বাভাসে, যা অনেক সময় কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্বের লাখো-কোটি ভক্তের কাছে পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপ ছিল না কেবল একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা। এটি হয়ে উঠেছিল প্রতিদিনের একটি অভ্যাস এবং সামাজিক রুটিন।
নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে রোববার স্পেনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয় উদযাপনের সময় শ্রীশ বিরেড্ডি বলেন, “প্রতিদিন কাজ শেষে মনে হতো, ঠিক আছে, বিকেল ৪টা, এখন খেলার সময়।”
তবে ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই শেষ হয়েছে বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হওয়া সেই ব্যস্ততা।
সকালের কফির সঙ্গে আর ম্যাচের সূচি দেখার প্রয়োজন নেই। অফিসে প্রিয় দলের জার্সি পরে যাওয়ার কারণ নেই। কোনো বারে শেষ মুহূর্তের গোলে অপরিচিত কাউকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ নেই। কোনো রেফারির সিদ্ধান্তে পুরো বিকেল হতাশ হওয়ার ঘটনাও নেই।
স্পেন সমর্থক আমির বলেন, “দিনগুলো এখন একঘেয়ে লাগবে। আমরা এতগুলো ম্যাচ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।” আমিরের মতো একই অনুভূতির কথা জানাচ্ছেন অনেক ফুটবল ভক্ত।
বিশ্বকাপ শেষে কেন তৈরি হয় শূন্যতার অনুভূতি
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন শেষ হওয়ার পর অনেক সমর্থকের মধ্যে এক ধরনের মানসিক শূন্যতা দেখা দিতে পারে, যাকে অনেকে “স্পোর্টস ফ্যানস ব্লুজ” বলে থাকেন।
দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রতিযোগিতাকে ঘিরে আবেগ, প্রত্যাশা এবং সামাজিক যোগাযোগের পর হঠাৎ সেই অভ্যাস বন্ধ হয়ে গেলে এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বড় ক্রীড়া আয়োজন মানুষের মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক ও মানসিক ছন্দ তৈরি করে। ভক্তরা ম্যাচের সঙ্গে নিজেদের সময়, পরিচয় এবং প্রত্যাশাকে যুক্ত করে ফেলেন।
প্রিয় দল ট্রফি জিতুক বা হৃদয়ভাঙা হারে বিদায় নিক, প্রতিদিনের সেই অভ্যাস হঠাৎ শেষ হয়ে গেলে অনেকের মধ্যে শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
বিরেড্ডি বলেন, “এক ধরনের বিষণ্নতা অনুভূত হয়। পুরো মাস ধরে আপনি ম্যাচ দেখতে যাচ্ছেন, জার্সি কিনছেন, পরের ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করছেন, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাচ্ছেন। এরপর বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেলে বাইরে যাওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
অনেক ভক্ত স্বীকার করেন, এই অনুভূতি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কারণ জীবন স্বাভাবিকভাবেই চলছে, পরিবার ঠিক আছে, কাজও রয়েছে। তবুও মনে হয়, গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা অনুপস্থিত।
বিশ্বকাপ কীভাবে মানুষকে একত্রিত করে
বিশ্বকাপ এমন এক সময়ে ভক্তদের একত্রিত করেছে, যখন বিভক্ত মিডিয়া পরিবেশে সবাইকে একই অভিজ্ঞতার অংশ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
পুরো দেশ একসঙ্গে উদযাপন করেছে, হতাশ হয়েছে। পরিবার একত্র হয়েছে, এমনকি কর্মক্ষেত্রে কম কথা বলা সহকর্মীরাও ফরমেশন ও লাল কার্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সেন্ট্রাল পার্ক থেকে ফাইনালের পর ভক্তরা যখন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাশফিক তানিম বলেন, “বিশ্বকাপের মতো সবাইকে এক জায়গায় আনার মতো আর কিছু নেই। এটি শেষ হলে আপনি শুধু হাইলাইট দেখেন এবং স্মৃতিগুলো মনে করেন।”
এ কারণেই বিশ্বকাপ শেষে নেমে আসা নীরবতা অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।
গোল মিস, নাটকীয় জয়, হতাশা, রাগ, স্বস্তি এবং আবেগের নানা মুহূর্ত কয়েক সপ্তাহ ধরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যায়। এরপর হঠাৎ ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবন।
ফুটবল ভক্ত গ্লেন ভায়োলা বলেন, “আপনি পুরো আয়োজনের আবেগে এতটাই ডুবে যান যে মনে হয় এটি কখনো শেষ হবে না। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, আজ কোনো ম্যাচ নেই। এরপর বুঝতে পারেন, আবার অপেক্ষা করতে হবে চার বছর। বিষয়টি কঠিন।”
কীভাবে কাটানো যায় বিশ্বকাপ পরবর্তী শূন্যতা
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বকাপের আনন্দের অংশগুলো ধরে রাখাই এই শূন্যতা কাটানোর একটি উপায় হতে পারে।
বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, আলোচনার গ্রুপ সক্রিয় রাখা এবং সামনে নতুন কোনো প্রত্যাশার বিষয় তৈরি করা সহায়ক হতে পারে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জার্সি আবার আলমারিতে উঠে যাবে, আলোচনার বিষয় বদলে যাবে, আর অন্য কোনো বড় ক্রীড়া আয়োজন মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেবে।
তবে ফোন খুলে যখন দেখা যাবে, আজ কোনো ম্যাচ নেই, আর হঠাৎ মন খারাপ হয়ে যাবে, তখন মনে রাখতে হবে, এমন অনুভূতি একা কারও নয়।




























