ঢাকা ০৬:৪৭ , Thu, ২৭ Aug ২০২৬
খেলাধুলা
ফুটবল

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে, সুলিভান ভাইদের হাত ধরে বিশ্বকাপের স্বপ্ন

খেলা ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৪৪
  • / 2
রোনান ও ডেকলান সুলিভান এ বছর বাংলাদেশের হয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন ছবি: বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সৌজন্যে

২৭ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া থেকে বাংলাদেশে এসে অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা যমজ ভাই রোনান ও ডেকলান সুলিভান এখন বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা থাকা প্রবাসী ও বিদেশে বেড়ে ওঠা প্রতিভাবান ফুটবলারদের জাতীয় দলে যুক্ত করে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখছেন তারা এবং জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলি।

গল্পটির শুরু হয়েছিল একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা দিয়ে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি সমর্থক পেজের মাধ্যমে রোনান ও ডেকলানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশে এসে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান তারা। এর আগে দুজনের কেউই বাংলাদেশে আসেননি।

মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন দুই ভাই। এটি ছিল তাদের জীবনের দীর্ঘতম সফর। ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড় নিয়ে শুরু হওয়া অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেন তারা। প্রবাসী আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ও সেই ক্যাম্পে ছিলেন। মাঠে ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও কয়েক দিনের অনুশীলনের পর নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন সুলিভান ভাইয়েরা।

রোনান ও ডেকলান জানান, বিদেশ থেকে এসে প্রথম দিকে দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কিছুটা কঠিন ছিল। বল পাওয়ার পর নিজেদের দক্ষতা দেখাতে পারলে পরিস্থিতি সহজ হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সতীর্থদের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়।

এরপর আসে মালদ্বীপে দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। ভারতের বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচের টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে পঞ্চম ও জয়সূচক পেনাল্টি নেন রোনান। জীবনে এর আগে মাত্র দুবার পানেনকা শট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তার একটি শট ক্রসবারে লেগেছিল। ফাইনালের সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এবারও চিপ শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

বলটি জালে জড়াতেই মালদ্বীপের স্টেডিয়ামে বাংলাদেশি সমর্থকদের উল্লাস শুরু হয়। রোনানের নেওয়া সেই পেনাল্টিই বাংলাদেশকে শিরোপা এনে দেয়।

ডেকলান বলেন, রোনান যে জয়সূচক পেনাল্টিতে পানেনকা শট নেবেন, তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। রোনান নিজেও বলেন, এমনভাবে পরিস্থিতির সমাপ্তি হবে, তা কেউ আগে বললে তিনি বিশ্বাস করতেন না।

শিরোপা জয়ের পর ঢাকায় ফিরে ব্যাপক আগ্রহের মুখে পড়েন দুই ভাই। গণমাধ্যমের আগ্রহের পাশাপাশি তারা বাংলাদেশে ঘুরেছেন, স্থানীয় খাবার উপভোগ করেছেন এবং দাদির সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তাদের সাফল্য বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দেয়।

সুলিভান ভাইদের গল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন পরিকল্পনার যোগসূত্র তৈরি হয়েছে জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলির মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডুলি জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন এবং পরে পেশাদার ফুটবলের মাধ্যমে মার্কিন জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোচিংয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর তিনি বাংলাদেশের জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছেন।

ডুলি মনে করেন, বাংলাদেশকে কেবল ফুটবল সমর্থকদের দেশ হিসেবে থাকলে চলবে না, খেলোয়াড় তৈরির দেশ হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তার পরিকল্পনায় দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভাবান ফুটবলারদের খুঁজে বের করা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রোনান, ডেকলান এবং তাদের দুই ভাই কোয়েন ও ক্যাভান যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পাশাপাশি বাংলাদেশের হয়েও খেলার যোগ্য ছিলেন। কোয়েন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। ক্যাভানও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে উঠে আসছেন। ফলে রোনান ও ডেকলানের বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্তটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডেকলান বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা দেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা আরও অনেক তরুণ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার বাংলাদেশের হয়ে খেলার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন একাডেমিতে থাকা কয়েকজন তরুণ ফুটবলারের আগ্রহের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে বিদেশে থাকা সব খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন ডুলি। তার মতে, বিদেশে খেললেই কাউকে জাতীয় দলের জন্য উপযুক্ত ধরে নেওয়া যাবে না। নতুন কোনো খেলোয়াড় দলের মান বাড়াতে পারলে তবেই তাকে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অন্যথায় একই অর্থ স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিবিড় প্রশিক্ষণে ব্যয় করলে বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ডুলির পরিকল্পনায় বাংলাদেশের বর্তমান খেলোয়াড়দেরও উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তার ধারণা, একটি সম্ভাবনাময় দলকে নিয়মিত কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুত করা এবং খেলাটিকে দেখার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারলে দলের সামগ্রিক মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে ১৫০-এর ঘরে নিয়ে যাওয়া অর্জনযোগ্য বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ডুলি ইতিবাচক। তিনি লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থাকা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তরুণরা অনেক কিছু শিখতে পারে। তাদের মানসিকতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অভিজ্ঞতা দলের অন্য খেলোয়াড়দের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।

সুলিভান ভাইদের সাফল্যের পর সম্ভাব্য নতুন খেলোয়াড়দের তালিকাও সামনে এসেছে। ডেকলান তার বন্ধু ও ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমির সাবেক সতীর্থ নেহান হাসান এবং স্ট্যানফোর্ডের স্ট্রাইকার ট্রেভর ইসলামের কথা উল্লেখ করেছেন। ডুলির নজরে রয়েছেন ফারহান ওয়াহিদ ও লুই ওয়াটসনের মতো খেলোয়াড়ও। হামজা চৌধুরী এবং কানাডায় জন্ম নেওয়া শামিত শোমও দলের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গোলরক্ষক পজিশন শক্তিশালী করার বিষয়টিও ডুলির পরিকল্পনায় রয়েছে।

মালদ্বীপে সুলিভান ভাইদের শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আরও একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। মালদ্বীপের নীল পানির সৌন্দর্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সমর্থকদের ব্যাপক উচ্ছ্বাস, পুরো সফরই তাদের কাছে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। ঢাকায় ফেরার পর ট্রফি নিয়ে সংবর্ধনা এবং মানুষের আগ্রহ তাদের আরও বেশি নাড়া দেয়।

ডেকলান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যুব ফুটবলে এমন ধরনের গণআগ্রহ দেখা যায় না। বাংলাদেশে ট্রফি নিয়ে ফেরার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া তাকে বুঝিয়েছে, ফুটবল এ দেশের মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ডুলির স্বপ্ন অবশ্য অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপায় থেমে নেই। নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় সিনিয়র পর্যায়ের দক্ষিণ এশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হবে জাতীয় দলের পরবর্তী বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় একবার, ২০০৩ সালে স্বাগতিক হিসেবে শিরোপা জিতেছিল।

এর বাইরে দেশের ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে ডুলির। তার দৃষ্টিতে জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ বাড়বে। এর মাধ্যমে যুব একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে এসে পেশাদার পর্যায়ে খেলার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।

ঢাকায় থাকার সময় ডুলি শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে তাকিয়ে ফুটবলের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও দেখছেন। তার মতে, পরবর্তী প্রজন্মকে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করতে মাঠ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

সুলিভান ভাইদের হাত ধরে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডেকলানের কাছে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য একটাই, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে দেখা।

তিনি মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা যোগ্য খেলোয়াড়দের একত্র করা গেলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডুলির স্বপ্নও একই দিকে, বাংলাদেশের শিশুরা একদিন অন্য দেশের সমর্থক হয়ে থেমে না থেকে সেই দেশগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখবে।

❤️
👏
🙂
😞

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে, সুলিভান ভাইদের হাত ধরে বিশ্বকাপের স্বপ্ন

প্রকাশঃ ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৪৪

২৭ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া থেকে বাংলাদেশে এসে অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা যমজ ভাই রোনান ও ডেকলান সুলিভান এখন বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা থাকা প্রবাসী ও বিদেশে বেড়ে ওঠা প্রতিভাবান ফুটবলারদের জাতীয় দলে যুক্ত করে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখছেন তারা এবং জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলি।

গল্পটির শুরু হয়েছিল একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা দিয়ে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি সমর্থক পেজের মাধ্যমে রোনান ও ডেকলানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশে এসে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান তারা। এর আগে দুজনের কেউই বাংলাদেশে আসেননি।

মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন দুই ভাই। এটি ছিল তাদের জীবনের দীর্ঘতম সফর। ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড় নিয়ে শুরু হওয়া অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেন তারা। প্রবাসী আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ও সেই ক্যাম্পে ছিলেন। মাঠে ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও কয়েক দিনের অনুশীলনের পর নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন সুলিভান ভাইয়েরা।

রোনান ও ডেকলান জানান, বিদেশ থেকে এসে প্রথম দিকে দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কিছুটা কঠিন ছিল। বল পাওয়ার পর নিজেদের দক্ষতা দেখাতে পারলে পরিস্থিতি সহজ হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সতীর্থদের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়।

এরপর আসে মালদ্বীপে দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। ভারতের বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচের টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে পঞ্চম ও জয়সূচক পেনাল্টি নেন রোনান। জীবনে এর আগে মাত্র দুবার পানেনকা শট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তার একটি শট ক্রসবারে লেগেছিল। ফাইনালের সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এবারও চিপ শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

বলটি জালে জড়াতেই মালদ্বীপের স্টেডিয়ামে বাংলাদেশি সমর্থকদের উল্লাস শুরু হয়। রোনানের নেওয়া সেই পেনাল্টিই বাংলাদেশকে শিরোপা এনে দেয়।

ডেকলান বলেন, রোনান যে জয়সূচক পেনাল্টিতে পানেনকা শট নেবেন, তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। রোনান নিজেও বলেন, এমনভাবে পরিস্থিতির সমাপ্তি হবে, তা কেউ আগে বললে তিনি বিশ্বাস করতেন না।

শিরোপা জয়ের পর ঢাকায় ফিরে ব্যাপক আগ্রহের মুখে পড়েন দুই ভাই। গণমাধ্যমের আগ্রহের পাশাপাশি তারা বাংলাদেশে ঘুরেছেন, স্থানীয় খাবার উপভোগ করেছেন এবং দাদির সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তাদের সাফল্য বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দেয়।

সুলিভান ভাইদের গল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন পরিকল্পনার যোগসূত্র তৈরি হয়েছে জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলির মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডুলি জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন এবং পরে পেশাদার ফুটবলের মাধ্যমে মার্কিন জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোচিংয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর তিনি বাংলাদেশের জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছেন।

ডুলি মনে করেন, বাংলাদেশকে কেবল ফুটবল সমর্থকদের দেশ হিসেবে থাকলে চলবে না, খেলোয়াড় তৈরির দেশ হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তার পরিকল্পনায় দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভাবান ফুটবলারদের খুঁজে বের করা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রোনান, ডেকলান এবং তাদের দুই ভাই কোয়েন ও ক্যাভান যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পাশাপাশি বাংলাদেশের হয়েও খেলার যোগ্য ছিলেন। কোয়েন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। ক্যাভানও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে উঠে আসছেন। ফলে রোনান ও ডেকলানের বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্তটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডেকলান বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা দেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা আরও অনেক তরুণ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার বাংলাদেশের হয়ে খেলার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন একাডেমিতে থাকা কয়েকজন তরুণ ফুটবলারের আগ্রহের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে বিদেশে থাকা সব খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন ডুলি। তার মতে, বিদেশে খেললেই কাউকে জাতীয় দলের জন্য উপযুক্ত ধরে নেওয়া যাবে না। নতুন কোনো খেলোয়াড় দলের মান বাড়াতে পারলে তবেই তাকে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অন্যথায় একই অর্থ স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিবিড় প্রশিক্ষণে ব্যয় করলে বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ডুলির পরিকল্পনায় বাংলাদেশের বর্তমান খেলোয়াড়দেরও উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তার ধারণা, একটি সম্ভাবনাময় দলকে নিয়মিত কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুত করা এবং খেলাটিকে দেখার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারলে দলের সামগ্রিক মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে ১৫০-এর ঘরে নিয়ে যাওয়া অর্জনযোগ্য বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ডুলি ইতিবাচক। তিনি লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থাকা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তরুণরা অনেক কিছু শিখতে পারে। তাদের মানসিকতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অভিজ্ঞতা দলের অন্য খেলোয়াড়দের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।

সুলিভান ভাইদের সাফল্যের পর সম্ভাব্য নতুন খেলোয়াড়দের তালিকাও সামনে এসেছে। ডেকলান তার বন্ধু ও ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমির সাবেক সতীর্থ নেহান হাসান এবং স্ট্যানফোর্ডের স্ট্রাইকার ট্রেভর ইসলামের কথা উল্লেখ করেছেন। ডুলির নজরে রয়েছেন ফারহান ওয়াহিদ ও লুই ওয়াটসনের মতো খেলোয়াড়ও। হামজা চৌধুরী এবং কানাডায় জন্ম নেওয়া শামিত শোমও দলের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গোলরক্ষক পজিশন শক্তিশালী করার বিষয়টিও ডুলির পরিকল্পনায় রয়েছে।

মালদ্বীপে সুলিভান ভাইদের শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আরও একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। মালদ্বীপের নীল পানির সৌন্দর্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সমর্থকদের ব্যাপক উচ্ছ্বাস, পুরো সফরই তাদের কাছে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। ঢাকায় ফেরার পর ট্রফি নিয়ে সংবর্ধনা এবং মানুষের আগ্রহ তাদের আরও বেশি নাড়া দেয়।

ডেকলান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যুব ফুটবলে এমন ধরনের গণআগ্রহ দেখা যায় না। বাংলাদেশে ট্রফি নিয়ে ফেরার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া তাকে বুঝিয়েছে, ফুটবল এ দেশের মানুষের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ডুলির স্বপ্ন অবশ্য অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপায় থেমে নেই। নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় সিনিয়র পর্যায়ের দক্ষিণ এশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হবে জাতীয় দলের পরবর্তী বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় একবার, ২০০৩ সালে স্বাগতিক হিসেবে শিরোপা জিতেছিল।

এর বাইরে দেশের ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে ডুলির। তার দৃষ্টিতে জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ বাড়বে। এর মাধ্যমে যুব একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে এসে পেশাদার পর্যায়ে খেলার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।

ঢাকায় থাকার সময় ডুলি শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে তাকিয়ে ফুটবলের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও দেখছেন। তার মতে, পরবর্তী প্রজন্মকে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করতে মাঠ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

সুলিভান ভাইদের হাত ধরে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডেকলানের কাছে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য একটাই, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে দেখা।

তিনি মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা যোগ্য খেলোয়াড়দের একত্র করা গেলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডুলির স্বপ্নও একই দিকে, বাংলাদেশের শিশুরা একদিন অন্য দেশের সমর্থক হয়ে থেমে না থেকে সেই দেশগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখবে।