শিশুর প্রথম দুই বছরের খাদ্যেই লুকিয়ে ভবিষ্যতের মস্তিষ্কের সুস্থতার চাবিকাঠি?
- প্রকাশঃ ২৯ জুলাই ২০২৬, ২২:৩৪
- / 2
জীবনের প্রথম দুই বছরে খুব কম চিনি খাওয়া ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে নতুন এক গবেষণা। গবেষণায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাজ্যে চিনি রেশনিং শেষ হওয়ার পর মানুষের খাদ্যাভ্যাসে যে পরিবর্তন আসে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, যেসব শিশু চিনি রেশনিং চলাকালে দুই বছর বয়স পর্যন্ত বেড়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৩ শতাংশ কম ছিল। একই সঙ্গে এ রোগের নির্ণয় গড়ে আড়াই বছর পরে হয়েছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ করে না যে কম চিনি খাওয়াই ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকেরা মনে করেন, জন্মের পর প্রথম এক হাজার দিন মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যে ১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চিনি রেশনিং শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৈনিক চিনি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৪১ গ্রাম থেকে বেড়ে ৮০ গ্রামে পৌঁছে যায়।
আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। সর্বশেষ গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংক প্রকল্পে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
চীনের গুয়াংঝো-ভিত্তিক হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা চিনি রেশনিং শেষ হওয়ার আগে ও পরে জন্ম নেওয়া শিশুদের তুলনা করে এই ফলাফল তুলে ধরেছেন। গবেষণার প্রধান গবেষক জিয়াঝেন ঝেং বলেন, “আমাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, জীবনের একেবারে শুরুর পর্যায়ে চিনি সীমিত রাখলে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।”
গবেষণাটি Neurology সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে গবেষকরাই স্বীকার করেছেন, চিনি কীভাবে এই প্রভাব ফেলতে পারে, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। স্বাধীন গবেষণা সংস্থা কোক্রেন-এর গবেষণা পদ্ধতি বিশেষজ্ঞ র্যাচেল রিচার্ডসন বলেন, গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
তিনি বলেন, গবেষণার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবে কতটুকু চিনি খেয়েছিলেন, তা জানা যায়নি। শুধু তারা চিনি রেশনিংয়ের আগে নাকি পরে জন্মেছেন, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
রিচার্ডসন আরও বলেন, গবেষণাটি ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে জন্ম নেওয়া মানুষের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ফলে বর্তমান সময়ের শিশুদের ক্ষেত্রে এর ফলাফল সরাসরি প্রযোজ্য নাও হতে পারে, কারণ এখন শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও পরিচর্যার ধরন অনেকটাই ভিন্ন।
অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির অধ্যাপক ইয়ান মেইডমেন্টও বলেন, এটি একটি আকর্ষণীয় ধারণা হলেও আরও শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন। তার মতে, প্রায় ৮০ বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সম্পর্ক বিশ্লেষণে আরও অনেক প্রভাবক ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, আলঝেইমারস রিসার্চ ইউকে-এর ডা. সারা রদ্রিগেজ বলেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই এটি খাদ্যাভ্যাস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক দেখাতে পারে, কিন্তু কম চিনি খাওয়াই সরাসরি ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে—এটি প্রমাণ করতে পারে না।
তিনি বলেন, “মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য কখনোই দেরি হয় না।”
























