যুক্তরাজ্যে বিদেশি কর্মী নিয়োগে কড়াকড়ি, ৩ হাজারের বেশি স্পনসর লাইসেন্স বাতিল
- প্রকাশঃ ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১৭:৩৯
- / 3
লন্ডন, ২৫ আগস্ট (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাজ্যে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হোম অফিসের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অভিবাসন আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফ্রি মুভমেন্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই ৩ হাজারের বেশি দক্ষ কর্মী ভিসার স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় নয় গুণ। ফলে স্পনসর লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ঘটনা এখন আর হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সরকারি তথ্যেও স্পনসর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমতি থাকা ১ হাজার ৯৪৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। এর আগের ১২ মাসে এই সংখ্যা ছিল ৯৩৭। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লাইসেন্স বাতিলের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
তবে লাইসেন্স স্থগিত এবং লাইসেন্স বাতিল একই ধরনের ব্যবস্থা নয়। স্থগিতাদেশ সাধারণত তদন্ত চলাকালীন একটি অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হোম অফিসের সন্দেহ হলে কোনো স্পনসর প্রতিষ্ঠান নিয়ম বা নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তদন্তের সময় প্রতিষ্ঠানটির নতুন কর্মীর জন্য স্পনসরশিপের সনদ দেওয়ার ক্ষমতা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে লাইসেন্স বাতিল আরও কঠোর ব্যবস্থা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হোম অফিস স্থগিতাদেশ না দিয়েও সরাসরি স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করতে পারে। ফ্রি মুভমেন্টের বিশ্লেষণে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের সরাসরি বাতিলের ঘটনাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সামনে হোম অফিসের অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ থাকে। সাধারণত স্থগিতাদেশের চিঠিতে অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য প্রায় ২০ কর্মদিবসের মতো সীমিত সময় দেওয়া হয়।
আইনজীবী ও অভিবাসন পরামর্শকদের মতে, এই সময়কে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি স্থগিতাদেশের চিঠিতে একাধিক অভিযোগ থাকতে পারে। প্রতিটি অভিযোগের জবাব দিতে বিপুলসংখ্যক নথি সংগ্রহ ও যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
চিঠি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা। প্রয়োজনে অভিবাসন আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া, সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করা এবং অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ সংগ্রহ শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্পনসর প্রতিষ্ঠানের জবাবের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। হোম অফিসের কর্মকর্তাদের প্রতি আক্রমণাত্মক বা আবেগপ্রবণ ভাষা ব্যবহার না করে সংযত ও পেশাদার ভাষায় অভিযোগের আইনি ও বাস্তব দিক তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জবাবে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে তার অবদান এবং কেন বিদেশি কর্মীদের স্পনসর করা প্রয়োজন, সেসব বিষয়ও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তার কাছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এবং স্পনসর করা কর্মীদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব।
তবে কেবল লিখিত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করলেই হবে না। ফ্রি মুভমেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রমাণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নথি, কাজের অধিকার যাচাইয়ের প্রমাণ, চাকরির চুক্তিপত্র, বেতন-সংক্রান্ত নথি, অনুপস্থিতির রেকর্ড, হোম অফিসকে দেওয়া প্রতিবেদন এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালা সংগ্রহ করে অভিযোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোর নথি, কর্মীদের বেতন প্রদানের প্রমাণ এবং কর্মীরা প্রকৃতপক্ষে সেই বেতন পেয়েছেন, এমন নথি স্থগিতাদেশের জবাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কোনো অভিযোগ ভুল হলে সেটি দৃঢ়ভাবে খণ্ডন করা যেতে পারে। তবে সেই দাবির পেছনে শক্ত নথিপত্র থাকা প্রয়োজন। কেবল প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে হোম অফিসকে সন্তুষ্ট করা কঠিন হতে পারে।
আবার প্রকৃত কোনো ভুল হয়ে থাকলে সেটি অস্বীকার করাও সব ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ভুল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসন নিয়ম ভঙ্গ করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভুল কীভাবে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা এড়াতে প্রতিষ্ঠান কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা ব্যাখ্যা করলে জবাবের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে নেওয়া সংশোধনমূলক পদক্ষেপের প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নথি যাচাই ব্যবস্থা চালু করা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পরিবর্তন করা অথবা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার প্রমাণ জবাবের সঙ্গে দেওয়া যেতে পারে।
শুধু ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন প্রমাণ বেশি কার্যকর হতে পারে।
পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানটি স্পনসর হিসেবে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছে কি না। কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে হোম অফিসের কর্মকর্তা নিয়ম ভুলভাবে প্রয়োগ বা ব্যাখ্যা করে থাকলে সেটিও যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
সরকারি ব্যবস্থায় স্পনসর প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল দক্ষ কর্মীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ কর্মী ভিসার জন্য সাধারণভাবে হোম অফিস অনুমোদিত স্পনসরের কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব প্রয়োজন হয়। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্পনসর লাইসেন্স নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মীদের চাকরি ও অভিবাসন পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাজ্যে বিদেশি কর্মী স্পনসর করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে। লাইসেন্স স্থগিতের চিঠি পাওয়া মানেই লাইসেন্স নিশ্চিতভাবে বাতিল হয়ে যাবে, এমন নয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য, নথি ও আইনি যুক্তির মাধ্যমে কার্যকর জবাব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
























