যুক্তরাষ্ট্রে ‘জন্ম পর্যটন’ ঠেকাতে প্রায় ৯০০ ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন
- প্রকাশঃ ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৫৪
- / 2
ওয়াশিংটন, ২৫ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০টি ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। আগস্টের শুরুতে এ ধরনের ভ্রমণ ঠেকাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পর ভিসাগুলো বাতিল করা হয়।
২০ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সন্তান জন্মের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সংগঠিত চক্র বিদেশিদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সাধারণভাবে ‘জন্ম পর্যটন’ বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে কোনো বিদেশি নাগরিক মূলত যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশটিতে প্রবেশ করেন। শিশুটি জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক হবে, এমন উদ্দেশ্যেই এ ধরনের ভ্রমণ করা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুকে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যটন ভিসা পাওয়ার বৈধ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কিছু চক্র নিজেদের চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ভিসা আবেদনের সময় প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখার জন্য আবেদনকারীদের প্রস্তুত করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে এসব চক্র আবেদনকারীদের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর কীভাবে প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখা যায়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত দেশটির করদাতাদের ওপর পড়তে পারে।
আগস্টের শুরুতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ‘জন্ম পর্যটন প্রতিরোধ টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এর লক্ষ্য নাগরিকত্বের আইনি কাঠামো সুরক্ষিত রাখা, অ-অভিবাসী ভিসা ঘোষিত ও বৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করা।
টাস্কফোর্স গঠনের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, এরই মধ্যে ৬০০টির বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯০০ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিগট।
পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা বাতিলের কয়েকটি ঘটনাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে এক দম্পতি ভিসা আবেদনে সম্মেলন ও অবকাশযাত্রাকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়া। পরবর্তী আবেদনের সময় আগে জন্ম নেওয়া একটি সন্তানের তথ্যও তারা গোপন করেছিলেন। পরে তাদের ভিসা বাতিল করা হয়।
আরেক ঘটনায়, একটি বিদেশি সরকারের এক কর্মকর্তা সরকারি কাজে এক সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা নিয়েছিলেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রায় তিন মাস দেশটিতে অবস্থান করেন এবং সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়েন।
অন্য একটি ঘটনায়, এক নারী ভিসা আবেদনে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে অবকাশযাপনের কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে যান এবং সেখানে সন্তান জন্ম দেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর। ওই ঘটনায়ও তাঁর ভিসা বাতিল করা হয়।
জন্ম পর্যটন ঠেকানোর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কিছু শিশুর স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়।
তবে সেই আদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন ট্রাম্প বনাম বারবারা মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের ওই উদ্যোগকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয় বলে রায় দেয়। ৬-৩ ভোটের ওই রায়ে আদালত জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির এখতিয়ারের আওতাধীন শিশুরা সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব বিধানের অধীনে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক।
অর্থাৎ, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নীতি বহাল থাকলেও ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করা বা ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার আলাদা আইনি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মার্কিন সরকারের এই পদক্ষেপের অর্থ কোনো গর্ভবতী বিদেশি নাগরিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ হারাবেন, এমন নয়। মূল বিষয় হলো ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ভিসা আবেদনে দেওয়া তথ্য।
পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, শিশুর জন্মের মাধ্যমে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করাই যদি যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য হয়, তাহলে পর্যটন ভিসার জন্য সেটি বৈধ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় না।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন মূলত এমন ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করছে, যাদের বিরুদ্ধে ভিসার উদ্দেশ্য গোপন করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা জন্ম পর্যটনকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের আবেদনকারীদের জন্য ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং ভিসা আবেদনে সঠিক তথ্য দেওয়ার বিষয়টি আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




























